বগুড়ায় জব্দ তালিকা না করেই বিপুল পরিমাণ সার নিলামে বিক্রি
কালোবাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে ব্যবসায়ীর গুদামে অবৈধভাবে মজুত করা বিপুল পরিমাণ সার অভিযান চালিয়ে জব্দ করেছিল বগুড়া সদর উপজেলা প্রশাসন। সেই সারের জব্দ তালিকা না করেই ‘লোকদেখানো’ নিলামের মাধ্যমে আওয়ামী লীগ নেতার কাছে বিক্রি করে দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন।
আজ মঙ্গলবার দুপুরে উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে এসব সার প্রকাশ্য নিলাম করা হয়। তবে নিলাম শেষেও কী পরিমাণ সার অভিযানে জব্দ করা হয়েছে, নিলাম কমিটির সভাপতি ও সদর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহফুজ আলম ১০ দিন পেরিয়েও তা খোলাসা করেননি।
নিলামে ১০৭ জন জামানতের অর্থ জমা দিলেও ডাকে অংশ নিয়েছেন মাত্র ৫ জন। এর মধ্যে সর্বোচ্চ দরদাতা বগুড়া সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক মাফুজুল ইসলাম জব্দ করা সব সার কিনেছেন।
নিলামের পরপরই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহফুজ আলম প্রথম আলোকে বলেন, কী পরিমাণ সার জব্দ করা হয়েছে, তা এখনো পরিমাপ করা হয়নি। জব্দ তালিকাও করা হয়নি। নিলামে প্রতি বস্তা ইউরিয়া সারের নিলাম মূল্য ১ হাজার টাকা, মিউরেট অব পটাশ ৬৫০ টাকা, ট্রিপল সুপার ফসফেট ১ হাজার টাকা এবং ডিএপি (ডাই অ্যামোনিয়াম ফসফেট) ৭০০ টাকা দর দিয়ে মাফুজুল ইসলাম সর্বোচ্চ দরদাতা হয়েছেন। কার্যাদেশ দেওয়ার তিন দিনের মধ্যে গুদাম থেকে সমুদয় সার নিয়ে তিনি জেলার যেকোনো স্থানে বিক্রি করতে পারবেন।
৬ আগস্ট রাতে বগুড়া শহরতলিতে একজন ব্যবসায়ীর গুদামে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ রাসায়নিক সার জব্দ করেন সদর ইউএনও সমর কুমার পাল। অন্যত্র সার সরিয়ে নেওয়ার অভিযোগে আটক করা হয় দুটি ট্রাক। পরে ইউএনও গুদাম সিলগালা করেন।
হয়তো সমঝোতা হয়েছে। আবার মিলগেট রেট সর্বনিম্ন দর বেঁধে দেওয়ায় অনেকেই ডাকে অংশ নিতে আগ্রহ দেখাননি।
সার জব্দের পর ইউএনও গণমাধ্যমে বলেন, কৃষকদের কাছে বিক্রির জন্য ডিলারের নামে বরাদ্দ দেওয়া বিপুল রাসায়নিক সার কিনে কালোবাজারে বিক্রির উদ্দেশ্যে গুদামে মজুত করেছিলেন নাজমুল পারভেজ নামের একজন ব্যবসায়ী। ১২ হাজার থেকে ১৫ হাজার বস্তা সার জব্দ করা হয়েছে। বস্তা গণনা শেষে কোন ধরনের সার কত বস্তা রয়েছে, তার সঠিক পরিমাণ জানানো হবে।
সার জব্দ করার এক দিন পর নিয়মিত মামলা না করে ইউএনও ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে সার মজুত করার অপরাধে গুদামমালিকের ব্যবস্থাপক আজিজুল ইসলামের কাছ থেকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করে সারের মালিক নাজমুল পারভেজকে দায় থেকে অব্যাহতি দেন। ভ্রাম্যমাণ আদালত আটক সার কৃষকের কাছে বিক্রির জন্য উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে প্রধান করে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করে দেন।
জানা গেছে, আটক সার কৃষকের কাছে সরাসরি বিক্রির কথা বলা হলেও উপজেলা প্রশাসনের গঠিত কমিটি এই সার নিলামে বিক্রির জন্য ১১ আগস্ট একটি বিজ্ঞপ্তি জারি করে। এতে উল্লেখ করা হয়, বগুড়া জেলার সার ডিলার ও সাধারণ ব্যক্তিরা ৫০ হাজার টাকা জামানতের অর্থ জমা দিয়ে প্রকাশ্য নিলামে জব্দ সার কিনে নিতে পারবেন। তবে বিজ্ঞপ্তিতে সারের পরিমাণ উল্লেখ করা হয়নি। সেই মোতাবেক আজ দুপুরে সদর উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে প্রকাশ্য নিলামের আয়োজন করা হয়।
বিপুল পরিমাণ সার গণনা করার মতো সক্ষমতা উপজেলা প্রশাসনের নেই। তবে আটক সার ১২ থেকে ১৫ হাজার বস্তা হবে। আটক সার গুদাম থেকেই কৃষকের কাছে বিক্রির জন্য কৃষি বিভাগকে বলা হয়েছিল। এখন কৃষি বিভাগ এই সার বিক্রি না করে কেন নিলামে ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করছে, সেটা আমার জানা নেই।
আজ সরেজমিনে দেখা গেছে, নিলামে অংশগ্রহণের জন্য স্থানীয় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা ছাড়াও কয়েকজন ব্যবসায়ী জামানতের ৫০ হাজার টাকা অর্থ জমাদানের জন্য সদর উপজেলা পরিষদে ভিড় করেছেন। দুপুর পর্যন্ত নিলাম ডাকে অংশগ্রহণের জন্য ১০৭ জন জামানতের অর্থ জমা দেন। এরপর শুরু হয় ক্ষমতাসীন দলের নেতাদের দেনদরবার।
শেষে উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে কৃষি কর্মকর্তা মাহফুজ আলমের নেতৃত্বে নিলাম ডাক শুরু হয়। ১০৭ জন জামানতের অর্থ জমা দিলেও মিলনায়তনে উপস্থিত হন ২৫ থেকে ৩০ জন। শেষ পর্যন্ত নিলাম ডাকে অংশ নেন তিন থেকে চারজন। অনেকটা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বগুড়া সদর উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং জেলা শিল্প ও বণিক সমিতির সহসভাপতি মাফুজুল ইসলাম সব সার কিনে নেন। সারের সর্বনিম্ন দাম ধরা হয় মিলগেট দর। আওয়ামী লীগ নেতা মাফুজুল সেই দরেই নিলাম ডেকে নেন। বাকিরা সম্মতিসূচক সমর্থন দেন।
১০৭ জন জামানতের অর্থ জমা দিলেও নিলাম ডাকে অংশ না নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে সেখানে উপস্থিত দুজন বলেন, ক্ষমতাসীন দলের নেতারা ডাকে অংশ নিতে আসা ব্যক্তিদের নিয়ে নিলামের আগেই গোপন বৈঠক করেন। সেখানেই সিদ্ধান্ত হয়, আওয়ামী লীগ নেতা মাফুজুল ইসলাম জব্দ সার নিলামে কিনবেন। ডাকে অংশ নিতে আসা ব্যক্তিরা সিংহভাগই ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মী হওয়ায় সমঝোতা প্রস্তাব মেনে নেন।
১০৭ জন জামানত জমা দিলেও মাত্র ৪ জনের ডাকে অংশ নেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহফুজ আলমও। তিনি বলেন, হয়তো সমঝোতা হয়েছে। আবার মিলগেট রেট সর্বনিম্ন দর বেঁধে দেওয়ায় অনেকেই ডাকে অংশ নিতে আগ্রহ দেখাননি।
ডিলার না হয়েও বিপুল পরিমাণ সার নিলাম ডেকে নেওয়ার বিষয়ে মাফুজুল ইসলাম বলেন, ‘সরকারকে বিব্রত করতে কোনো ডিলার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দরে সার বিক্রি করছেন। জব্দ সার ডিলাররা কিনলে অন্য জেলায় পাচারের শঙ্কা রয়েছে। এ কারণে মিলগেট রেটে জব্দ সার কিনে নিয়েছি। এই সার কৃষকের কাছেই বিক্রি করব।’
অভিযানের এক সপ্তাহ পরও সারের পরিমাণ নির্ণয় না করার কারণ জানতে চাইলে ইউএনও সমর কুমার পাল বলেন, ‘বিপুল পরিমাণ সার গণনা করার মতো সক্ষমতা উপজেলা প্রশাসনের নেই। তবে আটক সার ১২ থেকে ১৫ হাজার বস্তা হবে। আটক সার গুদাম থেকেই কৃষকের কাছে বিক্রির জন্য কৃষি বিভাগকে বলা হয়েছিল। এখন কৃষি বিভাগ এই সার বিক্রি না করে কেন নিলামে ব্যবসায়ীর কাছে বিক্রি করছে, সেটা আমার জানা নেই।’
অবৈধভাবে বিপুল পরিমাণ সার মজুতকারী ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে নিয়মিত মামলা না করা প্রসঙ্গে ইউএনও বলেন, ‘যে গুদামে সার মিলেছে, এটি নাজমুল পারভেজ নামের একজন ভাড়া নিয়েছেন বলে তথ্য পেয়েছি। তবে অভিযানকালে তিনি পলাতক ছিলেন। এ কারণে তাঁর ব্যবস্থাপককে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে। নিয়মিত মামলা করলে জব্দ সার আদালত আলামত হিসেবে জব্দ করতেন। এতে বিপুল পরিমাণ সার গুদামে দীর্ঘ সময় পড়ে থাকত, গুণাগুণ নষ্ট হতো।’