রাজশাহী মেডিকেল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে এক পুলিশ সদস্যের মায়ের মৃত্যুর পর চিকিৎসায় অবহেলার অভিযোগ তুলে সিনিয়র স্টাফ নার্সের সঙ্গে তাঁর হাতাহাতি হয়েছে। গতকাল সোমবার রাত সাড়ে ৯টার দিকে হাসপাতালের ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের অর্থোসার্জারি ইউনিট-২–এর ডেন্টাল বিভাগে এ ঘটনা ঘটে।
পুলিশ কনস্টেবল আমিনুল ইসলাম তাঁর বৃদ্ধা মা নূরেসা বেগমকে ভর্তি করেছিলেন। তিনি দাঁতের সমস্যায় ভুগছিলেন। হাসপাতালে ভর্তি করার পর চিকিৎসা শুরু হওয়ার আগেই তিনি মারা যান। কনস্টেবল আমিনুল ইসলামের অভিযোগ, তাঁর মায়ের চিকিৎসায় অবহেলা হয়েছে। তবে অভিযুক্ত নার্স রাকিব আহম্মেদ অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। কনস্টেবল আমিনুল নগরের শাহমখদুম থানায় কর্মরত। তাঁর বাড়ি নাটোর সদরের দিঘাপতিয়ায়।
ওই ঘটনার পর কনস্টেবল আমিনুলকে আটকে রেখে হাসপাতাল পুলিশ বক্সে খবর দেওয়া হয়। পরে পুলিশ ও আনসার সদস্যরা তাঁকে নিয়ে যান। এরপর পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা আসেন। হাসপাতাল পরিচালকের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে তাঁরা বিষয়টির মীমাংসা করেন। পরে মধ্যরাতে মায়ের লাশ নিয়ে বাড়ি যান আমিনুল।
যোগাযোগ করা হলে কনস্টেবল আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘আমার মায়ের দাঁতের সমস্যা। চোয়াল বসে গিয়ে মুখ বাঁকা হয়ে গিয়েছিল। আমি রাত সাড়ে আটটার দিকে মাকে জরুরি বিভাগে নিয়ে যাই। সেখান থেকে সরাসরি অপারেশন থিয়েটারে দিল। সেখানে নেওয়ার পর ডাক্তার বললেন, এটা তাঁর কাজ না। তিনি পাঠিয়ে দিলেন ৩১ নম্বর ওয়ার্ডে। সেখানে গিয়ে নার্সদের বললাম, শুধু মুখটা সোজা করে দেন। চিকিৎসা পরে হবে। কিন্তু তাঁরাও বলেন যে এটা তাঁদের কাজ না। অনেকক্ষণ পর সিনিয়র স্টাফ নার্স রাকিব আসেন। তিনিও বলেন যে এটা তিনি পারবেন না। তখন আমি বলি, পারবেন না তো দায়িত্ব ছেড়ে দেন। এ নিয়ে কথা–কাটাকাটি শুরু হয়। পরে হাতাহাতি। এরপর ৩০-৪০ জন এসে আমাকে আটকে রেখে পুলিশ ডাকে।’
তবে পুলিশ সদস্য প্রথমেই ঘুষি মেরেছেন বলে অভিযোগ করেছেন সিনিয়র স্টাফ নার্স রাকিব আহম্মেদ। তিনি বলেন, ‘আমি গিয়ে দেখি, রোগীর পালস নেই। আমি বুঝেছি, তিনি মারা গেছেন, কিন্তু ঘোষণা দেওয়া আমার কাজ না। তাই রোগী রিসিভ না করে বলি অপারেশন থিয়েটারের যে ডাক্তার পাঠিয়েছেন, সেখানেই নিয়ে যান। এই কথা বলতেই তিনি আমাকে প্রথমে দুটি ঘুষি এবং পরে আমার কানের ওপর আরও দুইবার থাপ্পড় দেন। তখন আমি তাঁকে আটকে রেখে বলি, আমার কী দোষ, সেটা আমাকে বলে যান। পরে পুলিশ-আনসার আসে।’
এ ঘটনায় আজ মঙ্গলবার সিনিয়র স্টাফ নার্স রাকিব আহম্মেদ নগর পুলিশের কমিশনারের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে হাসপাতালের মুখপাত্র শংকর কুমার বিশ্বাস বলেন, তিনি ছুটিতে আছেন, কিছু জানেন না। হাসপাতাল পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল পি কে এম মাসুদ-উল ইসলামকে ফোন করা হলে তিনি ধরেননি। রাজশাহী নগর পুলিশের মুখপাত্র গাজিউর রহমান এ বিষয়ে কিছু জানেন না বলে জানিয়েছেন।
শাহমখদুম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কবির হোসেন বলেন, মায়ের চিকিৎসার জন্য আমিনুল কয়েক জায়গায় ঘুরেছেন। মায়ের মৃত্যুর পর হাতাহাতি করেছেন। এটা করা তাঁর ঠিক হয়নি। এখানে দুই পক্ষেরই দোষ আছে। আমিনুল যেহেতু পুলিশ সদস্য, তাঁর বিরুদ্ধে পুলিশ বিভাগীয় ব্যবস্থা নেবে।
এর আগে ২০ এপ্রিল রাতে হাসপাতালের ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডে চিকিৎসাধীন অবস্থায় জুলিয়ারা বেগম (৫০) নামের রোগী মারা যান। এরপর তাঁর দুই ছেলে সেনাসদস্য সোহেল আলী (২৯) ও বিদ্যালয়ের নৈশপ্রহরী জয় আলী (২৪) অভিযোগ তোলেন, অবহেলার কারণে তাঁদের মায়ের মৃত্যু হয়েছে। তাঁরা মারমুখী আচরণ করেছেন বলে ইন্টার্ন চিকিৎসকদের অভিযোগ। সে সময় ওই সেনাসদস্যকেও মারধর করা হয়। পরবর্তী সময়ে দুই ভাইকে পুলিশে তুলে দেওয়া হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাঁদের বিরুদ্ধে একটি মামলাও করে। এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখিয়ে জয়কে আদালতে পাঠায় পুলিশ। আর সেনা আইনে বিচারের জন্য সোহেলকে সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়।