আশ্রয়ণ প্রকল্পের ১৫১টি ঘরের ৯৬টিই ফাঁকা

২০২০-২১ অর্থবছরে আশ্রয়ণ প্রকল্প-২–এর আওতায় প্রকল্পটিতে ১৫১টি ঘর নির্মাণ করা হয়।

ঘরে তালা দেওয়া। আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরে থাকেন না বাসিন্দারা। সম্প্রতি ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার আকচা ইউনিয়নের কান্দরপাড়ায়ছবি: প্রথম আলো

টাঙ্গন নদের পারে সারি সারি আধা পাকা ঘর। প্রতিটি ঘরে রয়েছে দুটি কক্ষ, একটি রান্নাঘর ও একটি শৌচাগার। রয়েছে বিদ্যুৎ আর সুপেয় পানির ব্যবস্থাও। কিন্তু সেখানের অধিকাংশ ঘরই ফাঁকা পড়ে আছে। এটি ঠাকুরগাঁও সদর উপজেলার আকচা ইউনিয়নের কান্দরপাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের চিত্র। সেখানের ১৫১টি ঘরের মধ্যে ৯৬টিই ফাঁকা পড়ে আছে। আর যাঁরা থাকছেন, তাঁদের অধিকাংশেরই নিজের নামে ঘরগুলো বরাদ্দ নেই।

টাঙ্গন নদের পাশে কান্দরপাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের অবস্থান। ২০২০-২১ অর্থবছরে আশ্রয়ণ প্রকল্প-২–এর আওতায় প্রকল্পটিতে ১৫১টি ঘর নির্মাণ করা হয়। প্রতিটি ঘরে ব্যয় হয় প্রায় ২ লাখ টাকা। নির্মাণের কয়েক মাসের মধ্যে দুই শতক জমিসহ ঘরগুলো বাসিন্দাদের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

২০ মার্চ সকালে ওই আশ্রয়ণ প্রকল্পে গিয়ে দেখা যায়, অধিকাংশ ঘরেই তালা ঝুলছে। ঝোপঝাড়ে ঘিরে ধরেছে ফাঁকা ঘরগুলো। বারান্দা ও আশেপাশে জমে রয়েছে ময়লা-আবর্জনা। কয়েকটি ঘরের জানালা–দরজা চুরি হয়ে গেছে। কোনো কোনো ঘরের উঠানে চলছে সবজি চাষ।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রীর উপহারের ঘর প্রকৃত ভূমিহীন-ঘরহীন ব্যক্তিরা বরাদ্দ পাননি। সঠিকভাবে যাচাই-বাছাই না করেই যাঁদের নিজস্ব বাড়ি ও জমিজমা রয়েছে, তাঁদের বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। বরাদ্দ পেয়ে তাঁরা ঘরে থাকছেন না।

এখানে যাঁদের নামে ঘর দিয়েছে, তাঁরা তো বড়লোক। আমরা এখানে আছি কিন্তু আমাদের নামে কোনো কাগজ হচ্ছে না।
আবদুল রহিম, আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা

কান্দরপাড়া আশ্রয়ণ প্রকল্পের প্রবেশপথে কয়েক ব্যক্তির জটলা। পরিচয় পেয়ে ওই আশ্রয়ণের বাসিন্দা মো. বাদশা জানালেন, ‘এখানের বেশিরভাগ ঘরেই লোকজন থাকেন না। ফাঁকা পড়ে আছে। আমাদের জমি নাই, ঘর নাই; তাই এখানে থাকি। কিন্তু আমাদের নামে কোনো কাগজ নাই।’

পরে এই প্রতিবেদক যাচাই করলে বাদশার কথার সত্যাতা পাওয়া যায়। ওই আশ্রয়ণে ১৫১টি ঘর রয়েছে। তার মধ্যে ৯৬টি ফাঁকা। বরাদ্দ দেওয়া হলেও সেখানে কেউ থাকেন না। ২৮টি পরিবার অন্যের নামে বরাদ্দ পাওয়া ঘরে বসবাস করছে। আর ২৭টি পরিবার নিজের নামের বরাদ্দের ঘরে থাকে।

ঠাকুরগাঁও রেলস্টেশনের জায়গায় স্বামীকে নিয়ে থাকতেন হালিমা বেগম। সম্প্রতি উচ্ছেদ করা হলে নেই আশ্রয়টি হারান তিনি। শেষমেষ কান্দরপাড়া আশ্রয়ণের ঘর ফাঁকা পেয়ে সেখানে ওঠেন তিনি। হালিমা বেগম বললেন, ‘যাঁদের নামে এই ঘর তাঁরা তো থাকেন না। আমি থাকি। ঘরের মালিক মাঝেমধ্যে এসে খোঁজখবর নিয়ে যান। তাঁরা আমাকে বাইর করে দিলে আমি কোথায় থাকব।’

১০৩ নম্বর ঘরটি বরাদ্দ পেয়েছেন আবদুল হামিদ নামের এক ব্যক্তি। তিনি সেখানে থাকেন না। তাঁর ঘরের পাশের নলকূপটিও তিনি খুলে ঘরে রেখে চলে গেছেন। আবদুল হামিদ বললেন, ‘টিউবওয়েল চুরি হয়ে যাচ্ছে। তাই খুলে রাখছি।’

আশ্রয়ণের ২২ নম্বর ঘরটি বরাদ্দ পেয়েছেন ঠাকুরগাঁও পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা আবদুস সালাম। তিনি মুদি ব্যবসায়ী। বরাদ্দ পেলেও তিনি সেখানে থাকেন না। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কান্দরপাড়া থেকে প্রতিদিন দোকানে আসা কষ্টকর। যাতায়াতে অনেক টাকা খরচ হয়ে যায়। তাই বরাদ্দ পাওয়া ঘরে উঠিনি। ভাবছি সেটা ছেড়ে দেব।’

সপ্তাহের প্রতি বুধবার ঠাকুরগাঁওয়ের জেলা প্রশাসক গণশুনানির মাধ্যমে জনগণের অভাব, অভিযোগ, আবেদন, নিবেদন শোনেন। ২০২১ সালের ২৩ ডিসেম্বর গণশুনানিতে শতাধিক মানুষ তাঁদের কথা জেলা প্রশাসককে শোনান। সে সময় আম্বিয়া খাতুন নামের এক বৃদ্ধা বসবাস করার কষ্টের কথা জানান। জেলা প্রশাসক পরের দিন আম্বিয়া খাতুন, শ্যামলী রানীসহ পাঁচ পরিবারকে কান্দরপাড়া আশ্রয়ণের নিয়ে গিয়ে ঘর উপহার দেন। ঘর পেলেও তাঁরাও সেটা ফেলে এসেছেন। আম্বিয়া খাতুন বলেন, সেখানে থাকার মতো অবস্থা নেই। ঘরের জিনিসপত্র চুরি হয়ে যায়। বাইরের ছেলেরা এখানে এসে আড্ডা জমায়।

১২৭ নম্বর ঘরে থাকতেন আবদুল রহিম। তিনি বলেন, ‘এখানে যাঁদের নামে ঘর দিয়েছে, তাঁরা তো বড়লোক। এখানে থাকেন না। আমরা এখানে আছি কিন্তু আমাদের নামে কোনো কাগজ হচ্ছে না।’ আর ৭১ নম্বর ঘরে বসবাস করা রুবি আক্তার বললেন, ‘দুই বছর ধরে এখানে আছি। কিন্তু আমরা এখনো ঘরের কাগজ পাই নাই। কবে পামু জানি না।’

সদর উপজেলার আকচা ইউপির চেয়ারম্যান সুব্রত কুমার বর্মন বলেন, কান্দরপাড়া আশ্রয়ণটি প্রত্যন্ত এলাকায়। সেখানের যোগাযোগব্যবস্থাও ভালো নয়। তা ছাড়া সেখানে দূরের বাসিন্দাদের ঘর দেওয়া হয়েছে। সেসব ঘরে বাসিন্দারা থাকছেন না।

জেলা প্রশাসক মাহবুবুর রহমান বলেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরে কিছু লোক থাকেন না বলে শুনেছি। তাঁদের ঘরগুলো চিহ্নিত করে ভূমিহীন ও গৃহহীন পরিবারের লোকজনকে তুলে দেওয়া হচ্ছে। পরে তাঁদের ভূমির দলিলসহ ঘর হস্তান্তর করা হবে।