‘৬০ লাখ দিছি, আরও ২৮ লাখ দিতে না পারায় পোলারে মাইরা ফালাইছে’

নিহত সোহাগ মুনশির পরিবারের সদস্যদের আহাজারি। মাদারীপুরের রাজৈর পৌরসভার মজুমদারকান্দি এলাকায়ছবি : প্রথম আলো

লিবিয়া হয়ে অবৈধ পথে ইতালি যাওয়ার পথে মাদারীপুরের তরুণ সোহাগ মুনশি (২৪) মারা গেছেন বলে জানিয়েছে তাঁর পরিবার। পরিবারের অভিযোগ, দালালের নির্যাতনে তাঁর মৃত্যু হয়েছে। ছেলেকে হারিয়ে বুকফাটা কান্না আর বিলাপ করছেন মা শাহিনুর বেগম।

আহাজারি করতে করতে শাহিনুর বেগম বলেন, ‘১০ মাসে ধাপে ধাপে ৬০ লাখ টাকা দিছি, আরও ২৮ লাখ দাবি করছে। কিন্তু বাকি টাকা দিতে না পারায় ওরা আমার পোলারে মাইরা ফালাইছে। আমার ছেলে তো গেছেই, আমার ছেলের লাশটা ফিরাইয়া দাও। আমার বাবারে শেষবারের মতো দেইখ্যা কি মরতে পারুম।’

সোহাগ মুনশি মাদারীপুরের রাজৈর পৌরসভার মজুমদারকান্দি এলাকার আশরাফ আলী মুনশির ছেলে। পরিবারের সদস্যরা জানান, সোহাগ লিবিয়ায় মারা গেছেন ২৪ জুলাই। স্থানীয় দালালেরা বিষয়টি গোপন রেখেছিলেন। গতকাল বুধবার রাতে লিবিয়ায় বসবাসরত মাদারীপুরের এক প্রবাসীর মাধ্যমে তাঁরা সোহাগের মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত হয়েছেন। এ ঘটনায় তাঁরা স্থানীয় দালালের বিরুদ্ধে থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।

সোহাগ মুনশি
ছবি : সংগৃহীত

পুলিশ, নিহত সোহাগের পরিবার ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, এলাকার মজুমদারকান্দির পার্শ্ববর্তী শেখ বাড়ির মকিম শেখের স্ত্রী ময়না আক্তারের প্রলোভনে পড়ে লিবিয়া হয়ে ইতালি যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেন সোহাগ। স্থানীয় দালালের সঙ্গে ২২ লাখ টাকায় ইতালি পাঠানোর চুক্তি হয় তাঁদের। চুক্তি মোতাবেক গত বছরের ২৩ সেপ্টেম্বর বাড়ি ছাড়েন সোহাগ। প্রথমে তাঁকে ঢাকা থেকে আকাশপথে সৌদি আরবে নেওয়া হয়। পরে সেখানে কয়েক দিন রেখে তাঁকে পাঠানো হয় লিবিয়ার দ্বিতীয় বৃহত্তম শহর বেনগাজিতে। বেনগাজি পৌঁছানোর পর লিবিয়ায় বসবাসরত বাংলাদেশি দালালেরা তাঁর পাসপোর্ট কেড়ে নিয়ে লিবিয়ার রাজধানী ত্রিপোলির একটি বন্দিশালায় নেন।

এক মাস পর সোহাগের ওপর নির্যাতন শুরু হয়। দফায় দফায় মুক্তিপণের ৩৮ লাখ টাকা দালালের কাছে দিতে হয়েছে বলে দাবি করেছেন তাঁর পরিবারের সদস্যরা। একপর্যায়ে সোহাগকে দালালের মাধ্যমে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু সর্বশেষ দালাল তাঁকে দেশে পাঠাতে আরও ২৮ লাখ টাকা দাবি করেন। তিন দিনের মধ্যে টাকা দিতে না পারায় সোহাগের ওপর অমানবিক নির্যাতন চালানো হয়। একপর্যায়ে দালালের বন্দিশালায় ২৪ জুলাই মারা যান সোহাগ।

রাজৈর উপজেলা শহর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে নিহত সোহাগ মুনশির বাড়ি। আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে ওই বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, টিনশেডের একটি ভাঙাচোরা ঘরে থাকেন সোহাগের মা–বাবা। বাড়ির উঠানে প্রতিবেশী মানুষের ভিড়। মা শাহিনুর বেগম ও বাবা আশরাফ আলী মুনশি উঠানে বসেই বিলাপ করছেন। ছেলে সোহাগের ছবি বুকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করে কান্না করছেন। প্রতিবেশীরা তাঁদের সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করছেন।

ছেলে সোহাগের সঙ্গে শেষ কথা স্মরণ করে মা শাহিনুর বেগম বলেন, ‘সোহাগ ফোনে বলেছিল, “মা, মাফিয়ারা আমাগো ধরছে, জুলহাস দালাল আমাগো বেইচা হালাইছে। মা, তুমি ওগের টাকা দাও, নাইলে আমারে ছাড়বে না, মাইরা ফালাইবে।” ছেলেডা এ কথা কয়, আর পাশ থেকে কে যেন ওরে মারতে থাকে। আমি ফোনে চিৎকার দিয়া খালি কইতাছি, বাজান তোমাগো হাতে–পায় ধরি, তোমরা আমার পোলারে মাইরো না, কিছু কইরো না। আমারে একটু সময় দাও। আমি তোমাগো টাকা দিয়া দিমু। কিন্তু ওরা আমার ছেলেরে মাইরা ফালাইল।’

আরও পড়ুন

নিহত সোহাগের ভাই সুজন মুনশি প্রথম আলোকে বলেন, ‘দালালের সঙ্গে ২২ লাখ টাকায় আমাগো চুক্তি হয়। এই টাকার মধ্যেই সমুদ্র পার করে দেবে বলেছিল। লিবিয়া থেকে এক সপ্তাহের মধ্যে গেম দেওয়ার (পাঠানো) কথা থাকলেও ওরে সাত থেকে আট মাস আটকে রাখে। পরে দফায় দফায় মুক্তিপণের ৩৮ লাখ টাকা দিলেও ওরে ইতালিও পাঠাইল না, দেশেও ফেরত পাঠাইল না। দালালের নির্যাতনে আমার ভাই মইরা গেছে। যারা আমার ভাইয়ের মৃত্যুর জন্য দায়ী, তাদের বিচার চাই।’

সোহাগের বাবা আশরাফ আলী মুনশি ছেলের লাশ বাংলাদেশে ফেরত আনার দাবি জানিয়ে বলেন, ‘আমার টাকাও গেল, পোলাও গেল। জমিজমা যা ছিল, সবকিছু শেষ। আমার ছেলেরে তো আর ফেরত পাব না। কিন্তু পোলার মরা লাশ দেখতে চাই। ওর লাশটা যেন সরকার দেশে আইনা দেয়, এইডাই চাই।’

লিবিয়ার বন্দিশালায় এক তরুণের মারা যাওয়ার ঘটনায় তাঁর মা থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। প্রধান অভিযুক্ত জুলহাস কয়েক দিন আগে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন।
শেখ আমিনুল ইসলাম, রাজৈর থানার ওসি

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, মানব পাচার চক্রের সদস্য ময়না আক্তার রাজৈর উপজেলার স্থানীয় দালাল হলেও তিনি মূলত কাজ করেন জুলহাস সরদারের হয়ে। জুলহাস রাজৈর উপজেলায় তালিকাভুক্ত শীর্ষ মানব পাচারকারী। তাঁর বিরুদ্ধে অন্তত ১০টি মামলা রয়েছে। পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার জুলহাস সরদার কারাগারে। তাঁর বাড়ি রাজৈর উপজেলার হোসেনপুর ইউনিয়নের সত্যাবতী এলাকায়। তাঁর বাবার নাম আবদুল মজিদ সরদার।

এ সম্পর্কে রাজৈর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ আমিনুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, লিবিয়ার বন্দিশালায় এক তরুণের মারা যাওয়ার ঘটনায় তাঁর মা থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। প্রধান অভিযুক্ত জুলহাস কয়েক দিন আগে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তার হয়েছেন। পুলিশ এ ঘটনায় তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।