অনন্য উদ্যোগ
চিকিৎসক জাকিরের মহৎ উদ্যোগ
রংপুর মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ জাকির হোসেন। তিনি নামমাত্র ফির বিনিময়ে রোগীদের সেবা দেন।
■ ২০০৮ সালের ১৪ নভেম্বর রংপুর শহরের ধাপ এলাকায় চিকিৎসাকেন্দ্র গড়ে তোলেন জাকির হোসেন।
■ উচ্চ রক্তচাপসহ বিভিন্ন রোগেরও চিকিৎসা দেওয়া হয়।
■ এখানে এ পর্যন্ত ২৯ হাজার ১২৬ জন চিকিৎসা নিয়েছেন।
উচ্চ রক্তচাপ বা হাইপারটেনশনের রোগ এক ‘নীরব ঘাতক’। এ রোগের ব্যাপারে মানুষ সচেতন নয়। নিজের মা এ রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান। মায়ের মৃত্যুযন্ত্রণা খুব কাছ থেকে দেখেছেন। সঠিক সময়ে প্রয়োজনীয় চিকিৎসা না পেয়ে তাঁর মায়ের মতো অনেকেই মারা যান। অনেকে আবার টাকার অভাবে চিকিৎসাও নেন না। এসব চিন্তা থেকে উচ্চ রক্তচাপের রোগীদের জন্য কিছু করার চিন্তা ছিল তাঁর। সেই চিন্তা থেকেই চিকিৎসাকেন্দ্র গড়ে তোলেন তিনি। ওই কেন্দ্রে ৪০ টাকার নামমাত্র ফি নিয়ে ১৪ বছর ধরে চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন তিনি।
এ সেন্টারে উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত, নিম্নবিত্তসহ সব শ্রেণি ও পেশার মানুষ চিকিৎসা নিতে পারেন। তবে বীর মুক্তিযোদ্ধা, প্রতিবন্ধী ও অসহায় দুস্থ ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে নিবন্ধন ফিসহ কোনো টাকা নেওয়া হয় না। এখানে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার পাশাপাশি উচ্চ রক্তচাপ থেকে রক্ষা পেতে নানা ধরনের পরামর্শও দেওয়া হয়।
মানবিক এই চিকিৎসকের নাম জাকির হোসেন। তিনি রংপুর মেডিকেল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ। ২০০৮ সালের ১৪ নভেম্বর রংপুর শহরের ধাপ এলাকায় তিনি হাইপারটেনশন অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার গড়ে তোলেন। এখানে চিকিৎসা পেতে তিন মাসের জন্য ৫০ টাকা দিয়ে নিবন্ধন করতে হয়। এরপর প্রতিবার মাত্র ৪০ টাকার বিনিময়ে চিকিৎসাসেবা নেওয়া যায়। উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ছাড়াও অন্যান্য রোগেরও চিকিৎসা দেওয়া হয়।
রংপুর শহরে অবস্থিত হাইপারটেনশন সেন্টারে ৪ নভেম্বর সরেজমিনে দেখা যায়, ২০-২২ জন রোগী চিকিৎসা নিচ্ছেন। দলবদ্ধভাবে উচ্চ রক্তচাপের বিষয়ে তাঁদের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। প্রতিষ্ঠাতা চিকিৎসক জাকির হোসেন ছাড়া আরও কয়েকজন চিকিৎসক তাঁদের পরামর্শ দিচ্ছেন।
কুড়িগ্রাম জেলার উলিপুর এলাকার আনোয়ার হোসেন (৮০) দীর্ঘদিন থেকে উচ্চ রক্তচাপ রোগে ভুগছেন। তিনি এক বছর ধরে এখানে চিকিৎসেবা নিচ্ছেন। ৫০ টাকা দিয়ে নিবন্ধন করে তালিকাভুক্ত হয়েছেন। এরপর ৪০ টাকা ফি দিয়ে সেবা নিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘যখনই সমস্যা হয়, তখনই এখানে ছুটে আসি। শুধু উচ্চ রক্তচাপ নয়, অন্য রোগেরও চিকিৎসাসেবা পাওয়া যায়।’
এই চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে সেবা নিয়ে অনেকেই ভালো আছেন। তাঁদের মধ্যে ঠাকুরগাঁও থেকে আসা মনসুর আলী (৫৫) বলেন, ‘দুই বছর থেকে এখানে চিকিৎসা নিয়ে অনেকটা ভালো আছি। নিবন্ধনের পর চিকিৎসা ফি মাত্র ৪০ টাকা। সেই সঙ্গে ওষুধ সেবনের পাশাপাশি নানা পরামর্শ দিয়ে থাকেন। যা জানতে চাই, সবকিছুই বুঝিয়ে দেওয়া হয়।’
চিকিৎসক জাকির হোসেন দীর্ঘ ৩২ বছরের চাকরির অভিজ্ঞতা এবং মায়ের মৃত্যুর দুঃসহ স্মৃতি তাঁকে উচ্চরক্ত চাপে আক্রান্ত রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেওয়ার এ মহৎ কাজে যুক্ত হতে অনুপ্ররণা জুগিয়েছে। জাকির হোসেন বলেন, তাঁর মা ওয়ালেদা খাতুন ছিলেন গৃহিণী। বাবা ওয়াসিম উদ্দীন আহমেদ ছিলেন চিকিৎসক। ১৯৮৪ সালে মায়ের মৃত্যুর ১০ বছর পর ১৯৯৪ সালে মারা যান তাঁর বাবা। মায়ের মৃত্যুর সময় তিনি বিসিএস দিয়ে চিকিৎসাসেবা পেশায় যোগ দেন।
জাকির হোসেন চাকরির শুরুতেই ঢাকায় অবস্থিত এস জি এম চৌধুরী মেমোরিয়াল হাইপারটেনশন সেন্টারে যুক্ত হন। সেখানে তিনি দীর্ঘ ১০ বছর কাজ করেছেন। চিকিৎসা দিতে গিয়ে দেখেছেন উচ্চ রক্তচাপ রোগটি মানুষের অপূরণীয় ক্ষতিসাধন করে চলেছে। এ রোগ সম্পর্কে রোগীদের অনেকটা অবহেলা ও সচেতনতার অভাব রয়েছে। তাঁর মা মারা যাওয়ার পর থেকেই উচ্চ রক্তচাপে আক্রান্ত রোগীদের হাইপারটেনশন সেন্টার গড়ে তোলার পরিকল্পনা করতে থাকেন। একপর্যায়ে সুযোগও পেয়ে যান। সরকারি চাকরির সুবাদে ২০০২ সালে রংপুর মেডিকেল কলেজে বদলি হয়ে আসেন। এরপর এখানে চিকিৎসাকেন্দ্র কেন্দ্র চালু করার সিদ্ধান্ত নেন। ওই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০০৮ সালের নভেম্বরে হাইপারটেনশন অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার গড়ে তোলেন। তাঁর মা-বাবার স্মরণে ‘ওয়াসিম-ওয়ালেদা বহুমুখী কল্যাণ ফাউন্ডেশন’–এর নামকরণ করেন। এরই অধীনে এই রিসার্চ সেন্টারের কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
এই সেন্টারে চিকিৎসাসেবা দেওয়ার পাশাপাশি রোগীদের করণীয় বিষয়ে বিনা মূল্যে একটি ছোট বইও দেওয়া হয়। এতে রোগীর জীবনযাপনসহ প্রতিদিন কী কী নিয়ম কীভাবে মেনে চলতে হবে, সেসব বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়। জাকির হোসেনসহ ১৯ জন চিকিৎসক রোগীকে চিকিৎসা দেন। এ ছাড়া মুঠোফোনের মাধ্যমেও রোগীদের চিকিৎসা দেওয়া হয়।
হাইপারটেনশন অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার সূত্রে জানা গেছে, ২০০৮ সালের নভেম্বর মাসের শুরুর দিন মাত্র ৯ জন রোগী নিয়ে এ সেন্টারের যাত্রা শুরু হয়। এখন পর্যন্ত এ কেন্দ্রে ২৯ হাজার ১২৬ জন রোগী চিকিৎসা নিয়েছেন। এসব রোগী রংপুর ছাড়াও কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, নীলফামারী, গাইবান্ধা, বগুড়া, দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও এলাকার। এখানে প্রতিদিন ৬০-৬৫ জন রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হয়।
অনেকটা বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা দেওয়া ছাড়াও রংপুরের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে এ সেন্টারের উদ্যোগে উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধ বিষয়ে সেমিনারের আয়োজন করা হয়। এ পর্যন্ত ৩২টি সেমিনার হয়েছে। এ পর্যন্ত এ সেন্টারের উদ্যোগে প্রায় ২০ হাজার রোগী বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা পেয়েছেন।
উচ্চ রক্তচাপ প্রতিরোধে হাইপারটেনশন সেন্টারের পক্ষ থেকে নানা বিষয়ে পরামর্শ দেওয়া হয়ে থাকে।পরামর্শগুলো হচ্ছে শর্করা ও চর্বিজাতীয় খাবার কম খেতে হবে, খাবারে বাড়তি লবণ রাখা যাবে না, ওজন কমাতে হবে, প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে অন্তত আধ ঘণ্টা হাঁটতে, যেকোনো প্রক্রিয়াজাত খাদ্য পরিহার করতে হবে, দুশ্চিন্তামুক্ত জীবনযাপন করতে হবে এবং ধূমপান ও অ্যালকোহল পরিহার করতে হবে।
উচ্চ রক্তচাপের কারণে রোগীর অবস্থা ভয়াবহ হতে পারে উল্লেখ করে চিকিৎসক জাকির হোসেন বলেন, ‘অনিয়ন্ত্রিত উচ্চ রক্তচাপের ফলে ব্রেনস্ট্রোক হতে পারে। উচ্চ রক্তচাপে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে। কিডনি ফেইলিওরের অন্যতম কারণ হলো উচ্চ রক্তচাপ।’
সিটি মেয়র মোস্তাফিজার রহমান বলেন, ‘আমি নিজেও সেখানে গিয়েছিলাম। এটি একটি মহৎ উদ্যোগ। এ প্রতিষ্ঠানের অগ্রযাত্রা অব্যাহত থাকুক।’