ময়নামতিদের জমি আছে ১৫ শতক। বিয়ের পর থেকে স্বামী তিলক রবিদাস এখানেই থাকতেন। গ্রামে গ্রামে ঘুরে জুতা সেলাইয়ের কাজ করে সংসার চালাতেন। তাঁদের চার সন্তান হলো মেয়ে রাজমতি রবিদাস (১০), ছেলে রাজমন রবিদাস (৯), রাজন রবিদাস (৭) ও নিরঞ্জন রবিদাস (৬)। ময়নামতি জানালেন, বিয়ের পর মা–বাবা মারা যান। এর বছর দুই পর মারা যান বড় দুই ভাই। পাঁচ বছর আগে হঠাৎ একদিন হৃদ্‌রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান স্বামী তিলক রবিদাস। তখন ছোট ছোট ছেলেমেয়ে নিয়ে তিনি ভাসেন অকূল সাগরে। একপর্যায়ে সন্তানদের মুখ খাবার তুলে দিতে ভিক্ষাবৃত্তি শুরু করেন। কিন্তু গ্রামে গেলে মানুষ ভিক্ষা দিতে চাইত না, কাজ করার কথা বলত। একদিন রাতে তিলক রবিদাসের জুতা সেলাইয়ে বাক্স নিয়ে বসেন তিনি। সুই, সুতা দিয়ে একটি ছেঁড়া জুতা সেলাইয়ের চেষ্টা করেন। দেখেন কাজ হচ্ছে। তিনি পারছেন।

এরপর নিজে বাক্স নিয়ে বের হন আশাপাশের গ্রামে। পেটের দায়ে ‘মেয়েমানুষ’ জুতা সেলাইয়ের কাজে নেমেছে, এটি গ্রামের অনেকের মনে ধরে। অনেকেই তাঁকে কাজ দেন। একপর্যায়ে তাঁরও শ্বাসকষ্টের রোগ ধরা পরে। বেশি হাঁটতে পারেন না। এর পর থেকে জুতা সেলাইয়ের বাক্স নিয়ে বসেন এলাকার লালপুর বাজারের একটি দোকানের সামনে। তিন বছর ধরে সেখানেই কাজ করছেন। সারাদিন যা আয় হয়, তা দিয়েই চাল, আটা নিয়ে বাড়ি ফেরেন। রাতে চুলায় আগুন দিলেই ছেলেমেয়েরা খায়। যেদিন কাজ হয় না, সেদিন চুলা জ্বলে না। না খেয়েই ঘুমাতে হয় তাঁদের। এখন বন্যার কারণে কোনো কাজ নেই। তবু বাজারে যান। যখন নিজের শরীর ভালো যায় না, তখন দুই ছেলেকে বাক্স দিয়ে পাঠান কাজে। অভাবের কারণে তাদের স্কুলে দিতে পারেননি।

ময়নামতি বলেন, ‘যখন ভাতের লাগি বাইচ্চাইনতে কান্দে, তখন হাওর থাকি শাক, কোনো সময় লাউ আইন্না সেদ্ধ দিয়া খাওয়াই। একবেলা মরিচপোড়া দিয়া ভাত খাইলে, দুই বেলা উপাস থাকি। ছয় মাসে একবারও মাছ খাইতাম পারি না।’

তবে প্রতিবেশীরা তাঁদের সহায়তা করেন বলে জানান তিনি। ১৬ জুন যখন বন্যার পানি আসে, তখনো ঘরেই ছিলেন তাঁরা। সন্ধ্যায় প্রবলবেগে ঢলের পানি ঘরে ঢোকে। ঘরের সবকিছু ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এরপর কোনোরকমে ছেলেমেয়েদের নিয়ে গ্রামের আরেকটি ঘরে আশ্রয় নেন। এখনো সেখানেই আছেন। কিন্তু ছেলেমেয়েকে নিয়ে এখন কোথায় যাবেন, এই চিন্তায় এখন রাতে ঘুমাতে পারেন না।

ময়নামতি জানান, বন্যার সময় ভাঙা ঘরের তালিকায় তাঁর নাম দেওয়া হয়েছে বলে শুনেছেন। আশায় আছেন সরকারি সহায়তা পেলে ঘরটা আবার বানাবেন। কিন্তু এখনো কোনো সহায়তা পাননি।

ময়নামতির প্রতিবেশী গোলাম মিয়া (৬০) বলেন, ‘তাঁর মতো অসহায় এই গ্রামে আর কেউ নেই। সে নিজে রোগী, তার ওপর চারটা অনাত বাইচ্চা। এখন ঘরও নেই। এই অসহায় নারী সরকারি টাকা পাইল না, তাইলে পাইলটা কারা।’ গ্রামের আরেক বাসিন্দা মিজানুর রহমান (৪০) জানান, তাঁদের গ্রামে ছয়টি ঘর সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে বিধ্বস্ত ঘরের জন্য ১০ হাজার টাকা করে যে সহায়তা দেওয়া হয়েছে, সেটি এই গ্রামের কেউ পাননি।

রাজারগাঁও গ্রামের বাসিন্দা গৌরারং ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ২ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মো. সালেহ আহমদও স্বীকার করেন, তাঁর গ্রামের কেউ সরকারের এই সহায়তা পাননি। এর কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, বন্যার সময় একদিন সেনাসদস্যরা গ্রামে এসেছিলেন। তাঁরা ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের নাম–ঠিকানা নিয়েছেন। পরে এক সরকারি কর্মকর্তা ফোনে তাঁর কাছে বিধ্বস্ত ঘরের তালিকা চান। তখন তিনি সেনাসদস্যদের আসার কথা জানান। এরপর ওই কর্মকর্তা বলেন, আর তালিকা লাগবে না। কিন্তু পরে দেখা গেছে তাঁর ওয়ার্ডের কেউই এই সহায়তা পাননি। অথচ পাশের ৬ নম্বর ওয়ার্ডে ৫০টি পরিবার এই সহায়তা পেয়েছে বলে জানান তিনি।

ওই গ্রাম থেকে ফেরার সময় ময়নামতি রবিদাস তাঁর ভাঙা ঘর দেখিয়ে বলেন, ‘আমি অসুস্থ মানুষ। এখন ঘরও নাই। আমি মরলে বাইচ্চাইন কোথাই থাকব, কোয়ায় যাইব।’

সুনামগঞ্জে এবারের ভয়াবহ বন্যায় হাজারো মানুষ গৃহহীন হয়ে পড়েছেন। সরকারি হিসাবে, ৪৫ হাজার ২৮৮টি ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে বিধ্বস্ত হয়েছে ৪ হাজার ৭৪৭টি। প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ ও কল্যাণ তহবিল থেকে পাওয়া বরাদ্দে জেলার ৫ হাজার পরিবারকে ঘরবাড়ি সংস্কারের জন্য ১০ হাজার করে টাকা দেওয়া হয় চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে। ময়নামতির রবিদাসের ঘরটি সম্পূর্ণ বিধ্বস্ত হলেও সে টাকা তিনি পাননি।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন