জুতা সেলাইয়ের ফাঁকে ছেলেকে পড়ান বাবা, ফুটপাতই প্রিয়জিতের ‘দ্বিতীয় পাঠশালা’
আদালত প্রাঙ্গণের ব্যস্ত সড়ক। আইনজীবী, বিচারপ্রার্থী ও পথচারীদের পদচারণে মুখর চারপাশ। কোলাহলের মধ্যেই ফুটপাতে বসে জুতা সেলাই করছেন সাগর রবিদাস। সামনে ছড়িয়ে আছে সুই-সুতা, হাতুড়ি, কালির পাত্র আর পুরোনো জুতা। তাঁর পাশে বসে থাকা শিশুসন্তান প্রিয়জিৎ রবিদাসের হাতে বই-খাতা আর পেনসিল। জুতা সেলাইয়ের ফাঁকেই শিশুসন্তানকে পড়া বুঝিয়ে দিচ্ছেন বাবা।
মানিকগঞ্জ আদালত প্রাঙ্গণের রোজকার এই দৃশ্য অনেকের নজর কাড়ে। সাগর রবিদাস (৫৫) প্রায় সাত বছর ধরে আদালত প্রাঙ্গণের ফুটপাতে বসে জুতা সেলাই করে জীবিকা নির্বাহ করছেন। প্রতিদিন সকালে কাজ শুরু করে বিকেল পর্যন্ত বসে থাকতে হয় তাঁকে। দিন শেষে যা আয় হয়, তা দিয়েই চলে সংসার। অভাব-অনটন তাঁর নিত্যসঙ্গী। তবু ছেলের শিক্ষার বিষয়ে তিনি কোনো ছাড় দিতে চান না। জীবনের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে লড়াই করেও সন্তানকে নিয়ে অন্য রকম এক স্বপ্ন লালন করেন তিনি।
প্রিয়জিৎ রবিদাস মানিকগঞ্জ শহর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশু শ্রেণির শিক্ষার্থী। বয়স ছয় বছর। বাবার কর্মস্থলই যেন তার দ্বিতীয় পাঠশালা। স্কুলের সময় বাদে বাবার পাশে বসেই সে পড়াশোনা করে।
গত বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) আদালত প্রাঙ্গণে কথা বলতে বলতে সাগর রবিদাস ছেলের খাতা খুলে দেখান। সেখানে বাংলা বর্ণমালা, সংখ্যা লেখা আর ছোট ছোট আঁকিবুঁকি। ছেলের দিকে তাকিয়ে তাঁর চোখে-মুখে গর্বের ছাপ স্পষ্ট।
সাগরের নিজের পড়াশোনার সুযোগ হয়নি। বছর দুয়েক আগে ছেলেকে নিয়ে স্থানীয় মন্দিরভিত্তিক শিশু ও গণশিক্ষা কার্যক্রমে যাতায়াত করেছেন। সেখানে কিছুটা অক্ষরজ্ঞান অর্জন করেন। তবে জীবনের অভিজ্ঞতা তাঁকে বুঝিয়েছে শিক্ষার মূল্য কত। তাই সীমিত অক্ষরজ্ঞান দিয়েই তিনি ছেলেকে পড়াতে চেষ্টা করেন। কোনো কিছু না বুঝলে স্কুলের শিক্ষকদের কাছে জানতে বলেন, কখনো আশপাশের পরিচিতদের সাহায্য নেন।
সাগর রবিদাস প্রথম আলোকে বলেন, ‘অভাবে আমি পড়াশোনা করতে পারি নাই। ছোটবেলা থেকেই কাজ করছি। লেখাপড়া না জানার কষ্ট আমি বুঝি। তাই চাই আমার ছেলে যেন আমার মতো না হয়। ওকে মানুষ করতে চাই, পড়ালেখা শিখিয়ে বড় করতে চাই।’
কথাগুলো বলতে বলতে রবিদাস আবার একটি জুতা সেলাইয়ে মন দেন। কিছুক্ষণ পর আবার ছেলের দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘এই অক্ষরটা পড়ো তো।’ প্রিয়জিৎ মৃদু স্বরে বইয়ের লাইন পড়ে শোনায়। বাবা মনোযোগ দিয়ে শোনেন। ভুল হলে সংশোধন করে দেন।
জেলা শহরের পশ্চিম দাশড়া লঞ্চঘাট এলাকায় কলোনিতে বসবাস করেন সাগর রবিদাস ও তাঁর পরিবার। শনিবার (১ আগস্ট) দুপুরে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, ঘিঞ্জি পরিবেশে পুরোনো আধা পাকা ঘরের দুটি স্যাঁতসেঁতে কক্ষে স্ত্রী ও দুই শিশুসন্তান নিয়ে থাকেন তিনি। ঘরটি তাঁর একার নয়, ভাইদেরও।
দুই সন্তানের মধ্যে বড় প্রিয়জিৎ, ছোট মেয়ে রাখি রবিদাসের বয়স পাঁচ বছর। স্ত্রী শিল্পী রবিদাস গৃহস্থের কাজ করেন। তিনি বলেন, ‘জুতা সেলাইয়ের আয়ে আমাদের সংসার চলে। কষ্ট হলেও ছেলেমেয়েকে পড়ালেখা করাতে চাই।’
জুতা সেলাই করে এখন আর আগের মতো আয় হয় না বলে জানালেন কলোনির মাতবর বিরেন রবিদাস। তিনি বলেন, প্রাইভেট পড়াতে গেলে এক থেকে দেড় হাজার টাকা লাগে। সাগরের অভাব-অনটনের সংসারে বিভিন্ন সমস্যার মধ্য দিয়ে চলতে হয়।
প্রিয়জিৎ শিশু হলেও সে স্বপ্নের কথা জানায়। সে বলে, ‘আমি বড় হয়ে অনেক পড়াশোনা করব। ভালো চাকরি করব।’ কথা বলার সময় বাবার দিকে তাকিয়ে সে মুচকি হাসে। সে বলে, ‘স্কুলে যাইতে ও বাড়িতে আসতে সমস্যা হয়। একটা সাইকেল হলে ভালো হতো।’
আদালত প্রাঙ্গণে নিয়মিত আসা আইনজীবী ও তাঁদের সহকারীদের অনেকে সাগর রবিদাসের কাছেই জুতা কালি কিংবা সেলাই করেন। এতে তাঁরা সাগর ও প্রিয়জিৎকে চেনেন। তাঁরা প্রায়ই এই বাবা-ছেলেকে একসঙ্গে বসে থাকতে দেখেন। তবে জুতা সেলাইয়ের পাশাপাশি ছেলেকে পড়ানোর দৃশ্য তাঁদের বিশেষভাবে স্পর্শ করে।
জেলা ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-৪–এর সহকারী পাবলিক প্রসিকিউটর (এপিপি) আইনজীবী এ এইচ এম মাহফুজ বলেন, ‘খোলা আকাশের নিচে ফুটপাতে বসে সাগর রবিদাস জুতা সেলাইয়ের ফাঁকে ফাঁকে শিশুছেলেকে পড়াশোনা করান। নিজে পড়াশোনা করতে পারেননি; কিন্তু পড়াশোনার প্রতি তাঁর প্রবল আগ্রহ। অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হলেও তিনি ছেলেকে পড়াশোনা করাচ্ছেন। দীর্ঘদিন ধরে আমরা তা দেখছি। আমরা জেনেছি, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর ফুটপাতের আলোতে পড়াশোনা করে তিনি জ্ঞানী ব্যক্তি হয়েছেন। সাগর রবিদাসের সন্তানও পড়াশোনা করে ভালো কিছু করবে।’
মানিকগঞ্জ শহর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বজলুর রহমান বলেন, ‘সাগর রবিদাস আমার পরিচিত। তাঁর ছেলে প্রিয়জিৎ নিয়মিত স্কুলে আসে। সাগর শিক্ষিত না হলেও সন্তানের পড়াশোনার বিষয়ে খুবই সচেতন। সন্তানের পড়াশোনার বিষয়ে প্রায়ই খোঁজখবর নেন।’ ৃ