দক্ষিণভাগ গণগ্রন্থাগার
পড়ে শিখো, দেখে শিখো
গ্রন্থাগার ঘিরে হবে সাংস্কৃতিক আয়োজন, গবেষণা। বইয়ের পাশে থাকবে গার্হস্থ্যজীবনে ব্যবহার করা পুরোনো বিভিন্ন সামগ্রীর সংগ্রহ। নতুন প্রজন্ম সেই সামগ্রী চোখে দেখে গার্হস্থ্য ও সামাজিক ইতিহাসকে জানবে, বুঝবে।
নানা রকম বইয়ে সমৃদ্ধ একটি গ্রন্থাগার গড়ে তোলা হবে। ঘরজুড়ে থাকবে বইয়ের ঘ্রাণ। সেখানে বসে বই পড়বেন নানা বয়সী গ্রন্থপিপাসুরা। সেই গ্রন্থাগার ঘিরে হবে সাংস্কৃতিক আয়োজন, গবেষণা। বইয়ের পাশে থাকবে গার্হস্থ্যজীবনে ব্যবহার করা পুরোনো বিভিন্ন সামগ্রীর সংগ্রহ। নতুন প্রজন্ম সেই সামগ্রী চোখে দেখে গার্হস্থ্য ও সামাজিক ইতিহাসকে জানবে, বুঝবে।
তবে সময় ও সুযোগের সম্মিলন ঘটছিল না যুক্তরাজ্যপ্রবাসী সাইদুল ইসলামের। এবার সেই ইচ্ছাটা মুক্তি পেয়েছে। স্বপ্নের পুরোটা ছুঁতে না পারলেও যাত্রা শুরু হয়েছে। গড়ে তোলা হয়েছে ‘দক্ষিণভাগ গণগ্রন্থাগার ও সংগ্রহশালা’। গত ৫ মে থেকে মৌলভীবাজারের বড়লেখা উপজেলার দক্ষিণভাগ বাজারে শুরু হয়েছে এ গ্রন্থাগারের চলা। তাদের স্লোগান হচ্ছে, ‘পড়ে শিখো, দেখে শিখো / জানার মাঝে নিজেকে রাখো’।
এলাকার কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, এই গ্রন্থাগারের ভাবনাটা সাইদুল ইসলামের। তাঁর বাড়ি বড়লেখার এই দক্ষিণভাগেই। প্রায় ১২ বছর ধরে তিনি যুক্তরাজ্যে আছেন। কিন্তু দক্ষিণভাগের মাটির টান, মাটির ঘ্রাণ তাঁকে ঘরমুখী করে রেখেছে। সব সময়েই এলাকার জন্য কিছু না কিছু করেন তিনি। তবে গতানুগতিক ও প্রচলিত কিছু করার চেয়ে স্থায়ী কিছু করার দিকেই তাঁর ঝোঁক। যা কিছু করলে ওখান থেকে আলোর স্ফুরণ হবে। মানুষ আলোকিত হবে। এ ক্ষেত্রে বই ও গ্রন্থাগারকে ঘিরেই তাঁর স্বপ্নজগত। সম্প্রতি সাইদুল এলাকার (দক্ষিণভাগের) আরেক সংগঠক স্থানীয় একটি কিন্ডারগার্টেনের শিক্ষক কামরিল ইসলামের সঙ্গে গ্রন্থাগার গড়ার ইচ্ছা নিয়ে কথা বলেন। কামরুল প্রস্তাবটিকে লুফে নেন। কামরুলও এ রকম একটি ইচ্ছা পুষছিলেন মনে। দুজনের ভাবনা এক হতেই তাঁরা কাজে লেগে যান। তাঁদের সঙ্গে যুক্ত হলেন কলেজশিক্ষার্থী মারজানুল ইসলাম ও দেওয়ান উসামা। এরপরই চারজন মিলে গণগ্রন্থাগার গড়ে তোলার পরিকল্পনা, নকশা তৈরিতে নামলেন। সে এক উদ্দীপনাময় মুহূর্ত তাঁদের। সময়টা বই পড়ার অনুকূলে নয়। বইয়ের চেয়ে প্রযুক্তির নানা অনুষঙ্গেই বেশি সময় কাটছে মানুষের। অনেকটা উল্টো স্রোতে উজিয়ে চলার মতো একটু ঝুঁকিরই উদ্যোগ। এরপরও পরিকল্পনাতো হলো। সেই অনুয়ায়ী দক্ষিণভাগ বাজারের মুদছির ম্যানসনের দ্বিতীয় তলায় একটি কক্ষ ভাড়া নিলেন তাঁরা। বইয়ের তাক, চেয়ার-টেবিল, আসবাবে সাজানো হলো গ্রন্থাগারটিকে। নাম ঠিক করা হয়েছে ‘দক্ষিণভাগ গণগ্রন্থাগার ও সংগ্রহশালা’।
কিছুটা নিজেদের, কিছু স্থানীয় মানুষের অর্থে প্রাথমিক পর্যায়ে প্রায় ৪০০ বই কেনা হয়েছে। যুক্ত হয় স্থানীয় লেখকদের আরও ৫০টি বই। তবে বইয়ের সংখ্যা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। বইয়ের পাশাপাশি সংগ্রহ করা হয়েছে পুরোনো টাকা, গার্হস্থজীবনে ব্যবহৃত পুরোনো বিভিন্ন সামগ্রীও। যাতে বই পড়তে এসে পাঠক একদম চোখের সামনে অতীতটাকে দেখতে পারেন। গ্রন্থাগারটির সাজসজ্জা ও বই কেনায় প্রায় দুই লাখ টাকা খরচ হয়েছে। ৫ মে থেকে গণগ্রন্থাগারটি উন্মুক্ত হয়েছে পাঠকের জন্য। এখন প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ জন পাঠক গ্রন্থাগারে ভিড় করছেন।
সম্প্রতি দক্ষিণভাগ গণগ্রন্থাগার ও সংগ্রহশালায় দেখা গেছে, তাকে তাকে সাজানো আছে দেশি-বিদেশি বিভিন্ন লেখকের বিভিন্ন ধরনের বই। বিভিন্ন ধর্মীয়, রাজনৈতিক, মুক্তিযুদ্ধ, আইন ও বিচার, ইতিহাস, দর্শন, বিজ্ঞান, কবিতা, উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ, সংস্কৃতি, অর্থনীতি, কল্পবিজ্ঞান, সমাজতত্ত্ব, স্বাস্থ্য, ম্যাগাজিন, শিশুতোষ নানা বিষয়ের বই। একপাশে রাখা আছে পুরোনো টাকার নোট ও কয়েন, হারিকেন, কুপিবাতি, প্রথম দিকের মোবাইল ফোন, কাঠের খড়ম (কাঠের জুতা) ইত্যাদি। টেবিলে বসে কয়েকজন পাঠক বই পড়ছেন।
একটি উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক তারেক আহমদ বলেন, ‘একসময় বিভিন্ন লেখকের বই পড়েছি। কিন্তু এখন ব্যস্ততায় আগের মতো পড়তে পারি না। গ্রন্থাগারটি হওয়ায় ভালো হয়েছে। আমার পছন্দের অনেক লেখকের বই আছে। এখানে পছন্দের বইগুলো বিনা মূল্যে পড়তে পারব।’
স্থানীয় লেখক জাকির মাছুম বলেন, ‘গ্রন্থাগারটি হওয়ায় আমাদের বসার, বই পড়ার একটি স্থান হয়েছে। মানুষ এখন বই পড়তে চায় না। ছোট–বড় সবাই এখন মোবাইলফোনে আসক্ত। ভালো মানুষ, আলোকিত মানুষ হতে হলে বেশি বেশি বই পড়তে হবে। এ জন্য মুঠোফোনের নেশা থেকে সবাইকে বেরিয়ে আসতে হবে। গ্রন্থাগারটি চালু নিঃসন্দেহে একটি মহৎ কাজ।’
গ্রন্থাগারটির অন্যতম উদ্যোক্তা কামরুল বলেন, ‘যুক্তরাজ্যপ্রবাসী সাইদুল প্রথমে আমাকে তাঁর দীর্ঘদিনের একটি স্বপ্ন গ্রন্থাগার চালুর কথা জানান। পরে কয়েকজন পরিকল্পনা করে এটা চালু করেছি। আপাতত প্রতিদিন বেলা দুইটা থেকে রাত আটটা পর্যন্ত গ্রন্থাগারটি খোলা থাকবে। গ্রন্থাগারটি নিয়মিত দেখাশোনার জন্য মাসিক বেতনে একজন দায়িত্বে আছেন। পাঠক ধীরে ধীরে বাড়ছে। প্রতিদিন ১৫ থেকে ২০ জন পাঠক আসছেন। শিগগরিই আরও ৫০০ নতুন বই আনা হবে। বইয়ের সংখ্যা বাড়ানো হবে। পাঠক বাড়িতে নিয়েও বই পড়তে পারছেন।’
গ্রন্থাগারটির মূল উদ্যোক্তা সাইদুল সম্প্রতি প্রথম আলোকে বলেন, ‘সব সময় চাইছি এলাকার জন্য কিছু করতে। কিছু ছোট ছোট কাজ করেছি। এলাকার অনেক প্রবাসী আছেন। তারা দেশে এসে খেলাধুলার টুর্নামেন্ট করেন। ভালো উদ্যোগ। কিন্তু এতে এক দুই মাস উৎসব থাকে। আমার মনে হয়েছে স্থায়ী কিছু করার। কামরুলের সঙ্গে কথা বললাম। সে সাড়া দিতেই আমরা কাজ শুরু করি। গ্রন্থাগার করার পর দেখছি এলাকায় অনেক পাঠক আছে। তারা নীরবে পাঠ করেন। আমাদের পরিকল্পনা আছে স্থায়ী ভবন করার। এখন ছোট পর্যায়ে আছে। সবকিছু গোছাতে পারিনি। শুরু করেছি মাত্র। এখানে দেশি-বিদেশি বই, জার্নাল, মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস থাকবে। লাইব্রেরিতে শুধু পড়া না, এখানে সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, গবেষণারও সুযোগ থাকবে। বইয়ের পাশে থাকবে বিলুপ্ত নানা সামগ্রীও।’