গাড়িতে এহসানুল, সংসদে মজিবুর—বাজিতপুর বিএনপির রাজনীতির নতুন মোড়

প্রধানমন্ত্রীর গাড়ি থেকে নামছেন সৈয়দ এহসানুল হুদা। ১৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কিশোরগঞ্জ সফরের দিনছবি: সংগৃহীত

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কিশোরগঞ্জ সফরের দিন এলাকায় ছিলেন না কিশোরগঞ্জ-৫ (বাজিতপুর-নিকলী) আসনের সংসদ সদস্য শেখ মজিবুর রহমান। অন্যদিকে সফরের পথে বিএনপিতে যোগ দেওয়া সৈয়দ এহসানুল হুদাকে নিজের গাড়িতে তুলে নেন প্রধানমন্ত্রী। এ ঘটনার ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বাজিতপুরে বিভক্ত বিএনপির রাজনীতি নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন আলোচনা।

প্রধানমন্ত্রীর সফরের পর থেকে বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির দুই পক্ষের নেতা-কর্মীদের আলোচনার বড় বিষয় হয়ে উঠেছে ঘটনাটি। এহসানুল হুদার অনুসারীরা এটিকে দলের কেন্দ্রীয় পর্যায়ে তাঁর অবস্থানের গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে শেখ মজিবুর রহমানের অনুসারীদের ভাষ্য, প্রধানমন্ত্রীর গাড়িতে ওঠার ঘটনাকে স্থানীয় রাজনীতির নেতৃত্বের মাপকাঠি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।

দুই পক্ষের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দলীয় মনোনয়নকে কেন্দ্র করে বাজিতপুরে বিএনপির রাজনীতি দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। এক পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন দল থেকে বহিষ্কৃত উপজেলা বিএনপির সভাপতি শেখ মজিবুর রহমান। অন্য পক্ষের নেতৃত্বে রয়েছেন একই আসনে বিএনপির প্রার্থী হয়ে নির্বাচনে পরাজিত সৈয়দ এহসানুল হুদা।

বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীকে ফুল দিয়ে শুভেচ্ছা জানান শেখ মজিবুর রহমান। এই ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে তাঁর সমর্থকেরা তাঁদের অবস্থান তুলে ধরছেন
ছবি: সংগৃহীত

মনোনয়ন ঘিরে বিভক্তি

শেখ মজিবুর রহমান কিশোরগঞ্জ-৫ আসনে বিএনপির মনোনয়ন চেয়েছিলেন। তাঁকে প্রাথমিক মনোনয়নও দেওয়া হয়েছিল। পরে ২০২৫ সালের ২১ ডিসেম্বর বাবার প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ জাতীয় দল বিলুপ্ত করে বিএনপিতে যোগ দেন সৈয়দ এহসানুল হুদা। এরপর তাঁকে ওই আসনে চূড়ান্ত মনোনয়ন দেওয়া হয়।

মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচন করেন শেখ মজিবুর রহমান। নির্বাচনে বিএনপির ধানের শীষের প্রার্থী এহসানুল হুদাকে ১৩ হাজার ১৫৪ ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন তিনি।

দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় চলতি বছরের ২৪ জানুয়ারি শেখ মজিবুর রহমানকে বিএনপি থেকে বহিষ্কার করা হয়। একই কারণে তাঁর পক্ষে অবস্থান নেওয়া বাজিতপুর ও নিকলী উপজেলার ৮৩ জন নেতাকেও বহিষ্কার করা হয়। তবে বহিষ্কৃত হলেও শেখ মজিবুর রহমান ও তাঁর অনুসারীরা স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন। উপজেলা বিএনপির ব্যানারে তাঁরা বিভিন্ন কর্মসূচিও পালন করে আসছিলেন।

একজনকে গাড়িতে ওঠানো, অন্যজনের দেশের বাইরে চলে যাওয়া—ঘটনা দুটি বাজিতপুরে বিএনপির রাজনীতির বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে।
রাষ্ট্রপতির শপথের দিন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর সঙ্গে সৈয়দ এহসানুল হুদা। এই ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে তাঁর সমর্থকেরা বেশ উল্লসিত
ছবি: সংগৃহীত

প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে দুই পক্ষের তৎপরতা

১৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কিশোরগঞ্জ সফরের ঘোষণা আসার পর বাজিতপুরের দুই পক্ষের তৎপরতা বেড়ে যায়। উভয় পক্ষই একাধিক প্রস্তুতি সভা করে নিজেদের শক্তি দেখানোর চেষ্টা করে।

শেখ মজিবুর রহমানের অনুসারীদের মধ্যে আলোচনা ছিল, সফরের দিন প্রধানমন্ত্রীর মঞ্চে থাকবেন মজিবুর রহমান। এহসানুল হুদা থাকবেন মঞ্চের নিচে। বহিষ্কৃত নেতাদের বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহারের বিষয়ে ইতিবাচক কোনো বার্তা আসতে পারে—এমন কথাও ছড়িয়ে পড়ে।

কিন্তু সফরের আগের রাতে পরিস্থিতি বদলে যায়। ১৫ আগস্ট রাতে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে, শেখ মজিবুর রহমান অসুস্থ হয়ে পড়েছেন। পরে জানা যায়, হৃদ্‌রোগজনিত সমস্যায় চিকিৎসার জন্য ওই রাতেই তিনি সিঙ্গাপুরে চলে গেছেন। ফলে ১৬ আগস্ট প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচিতে তাঁকে দেখা যায়নি।

প্রধানমন্ত্রী ডাক দিয়ে এহসানুল হুদাকে গাড়িতে তুলে নিয়েছেন। এটা শুধু গাড়িতে ওঠার ঘটনা নয়। বাজিতপুর-নিকলীর বিএনপির রাজনীতির জন্য এটি বড় বার্তা
বাজিতপুর পৌর বিএনপির সভাপতি এহসান কুফিয়া

অন্যদিকে প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচির পুরো সময় বাজিতপুরের রাজনীতিতে এহসানুল হুদার অনুসারীদের সক্রিয় উপস্থিতি দেখা যায়। একই রঙের গেঞ্জি ও টুপি পরে তাঁরা সকাল থেকেই কটিয়াদী এলাকায় অবস্থান নেন। আগের প্রস্তুতি সভাগুলোতে শেখ মজিবুর রহমান পক্ষের বড় ধরনের শোডাউনের কথা বলা হলেও সেদিন তাঁদের দলগতভাবে তেমন দেখা যায়নি।

গাড়িতে তুলে নেওয়ার পর নতুন আলোচনা

এরপরই ঘটে আলোচিত ঘটনাটি। পথে এহসানুল হুদাকে দেখতে পেয়ে প্রধানমন্ত্রী তাঁর গাড়ি থামান। পরে তাঁকে নিজের গাড়িতে তুলে নেন। সেই মুহূর্তের ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বাজিতপুরে বিএনপির বিভক্ত রাজনীতিতে বিষয়টি নতুন মাত্রা পায়।

এহসানুল হুদার পক্ষের নেতা বাজিতপুর পৌর বিএনপির সভাপতি এহসান কুফিয়া। তিনি বলেন, ‘ওরা বলেছিল, ওরা মঞ্চে থাকবে। কিন্তু জনগণ কী দেখল? জনগণ দেখল, ওরা নেই, আমরা আছি। শুধু তা-ই নয়, প্রধানমন্ত্রী ডাক দিয়ে এহসানুল হুদাকে গাড়িতে তুলে নিয়েছেন। এটা শুধু গাড়িতে ওঠার ঘটনা নয়; বাজিতপুর-নিকলীর বিএনপির রাজনীতির জন্য এটি বড় বার্তা।’

মজিবুর পক্ষের ব্যাখ্যা ভিন্ন

শেখ মজিবুর রহমানের অনুসারীরা অবশ্য ঘটনাটিকে এভাবে দেখছেন না। দলীয় সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনে তাঁর পক্ষে অবস্থান নেওয়ায় বহিষ্কৃত হন উপজেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. মনিরুজ্জামান। তিনি জানান, শেখ মজিবুর রহমানের হৃদ্‌রোগের সমস্যা রয়েছে। হঠাৎ ব্যথা অনুভব করায় চিকিৎসার জন্য তাঁকে সিঙ্গাপুর যেতে হয়েছে।

মনিরুজ্জামান বলেন, ‘রোগশোক তো বলেকয়ে আসে না। আর প্রধানমন্ত্রীর গাড়িতে কারও স্থান পাওয়া মানে রাজনীতি নিয়ন্ত্রণ তাঁর হাতে চলে যাওয়া নয়। যাঁরা বিষয়টিকে বড় করে দেখছেন, তাঁরা স্থানীয় রাজনীতির হিসাব ভুল করছেন।’ শেখ মজিবুর রহমানের অসুস্থতা নিয়ে রাজনৈতিক ফায়দা নেওয়া ও ট্রল করাকে রাজনৈতিক শিষ্টাচারবহির্ভূত বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

প্রধানমন্ত্রীর কর্মসূচিতে তাঁদের পক্ষের নেতা-কর্মীদের উপস্থিতি কম থাকার বিষয়ে মনিরুজ্জামান বলেন, প্রধানমন্ত্রী তাঁর কোনো কর্মসূচিতে বিশৃঙ্খলা চান না। জেলার নেতাদের মাধ্যমে নেতা–কর্মীদের সংযত থাকতে বলা হয়েছিল। বহিষ্কারাদেশ প্রত্যাহার সময়ের ব্যাপার বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

বাজিতপুরের কয়েকজন নেতা-কর্মীর ভাষ্য, স্থানীয় রাজনীতির দুই পক্ষের দুই নেতার কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে কার কতটা ঘনিষ্ঠতা, এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি দিয়েই তার হিসাব কষা হচ্ছে।

দুই নেতাকে ঘিরে ‘ছবির’ রাজনীতি

বাজিতপুর উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান অবশ্য কোনো পক্ষের সঙ্গে নেই। তিনি আলাদাভাবে রাজনৈতিক কর্মসূচি পালন করেন। তিনি বলেন, ‘একজনকে গাড়িতে ওঠানো, অন্যজন দেশের বাইরে চলে যাওয়া—ঘটনা দুটি বাজিতপুরে বিএনপির রাজনীতির বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। তবে আমার মতে, আমরা এখন বড় ধরনের দলীয় বিশৃঙ্খলার মধ্যে আছি।’

কিশোরগঞ্জ জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক ও কিশোরগঞ্জ সদর আসনের সংসদ সদস্য মাজহারুল ইসলাম বাজিতপুরের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

এদিকে চিকিৎসা শেষে গত বুধবার দেশে ফিরেছেন শেখ মজিবুর রহমান। বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোটও দেন তিনি। ভোট শেষে জাতীয় সংসদে প্রধানমন্ত্রীর সামনে বেশ কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে ছিলেন। নবনির্বাচিত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর পাশে ফুলের তোড়া নিয়েও তাঁকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়। পাশে ছিলেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মঈন খান। এসব ছবি মজিবুর রহমানের অনুসারীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেন।

অন্যদিকে সৈয়দ এহসানুল হুদাও রাষ্ট্রপতির শপথ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। ওই অনুষ্ঠানে রুহুল কবির রিজভী ও আন্দালিভ রহমান পার্থের পাশে দাঁড়ানো তাঁর ছবিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

বাজিতপুরের কয়েকজন নেতা-কর্মীর ভাষ্য, স্থানীয় রাজনীতির দুই পক্ষের দুই নেতার কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে কার কতটা ঘনিষ্ঠতা, এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি দিয়েই তার হিসাব কষা হচ্ছে। ফলে স্থানীয় বিএনপির রাজনীতি অনেকটাই কর্মসূচি ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের বাইরে গিয়ে ‘কার সঙ্গে কার ছবি’—এই আলোচনায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছে।