মনোজিৎ কুমার বলেন, ‘আগের তিন মেয়েকে খুব অল্প বয়সে বিয়ে দিছি। ইতি যদি ফুটবল না খেলত, তালি ওর এত দিন বিয়ে হয়ে যেত। এখনকার মতো সাহস পালি অন্য মেয়েদের অত অল্প বয়সে বিয়ে দিতাম না।’ তিনি জানান, গ্রামের দরিদ্র পরিবারের মেয়েদের নিয়ে নানা রকম দুশ্চিন্তায় ভুগতে হয় বাবা–মায়ের। বিয়ে দিতে না চাইলেও মানুষজন নানাভাবে চাপ দেয়। তবে ইতির মতো হতে পারলে তাঁকে নিয়ে মা–বাবার আর চিন্তা নেই।

মঙ্গলবার দুপুরে গোয়ালদহ গ্রামে ইতিদের বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, গৃহস্থালির কাজ করছেন তাঁর মা উন্নতি রানী মণ্ডল। বাংলাদেশ জেতায় তিনি ভীষণ খুশি। ফাইনাল খেলার দিনে সারা দিন না খেয়ে ছিলেন। তবে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার এক দিন পরেও মেয়ের সঙ্গে কথা হয়নি একটি স্মার্টফোন নেই বলে। উন্নতি রানী মণ্ডল বলেন, ‘আমাদের চার মেয়ে। কোনো ছেলে নেই। তাতে এখন আর কোনো দুঃখ নেই। অনেক সময় টাকা হাওলাত (ধার) করে টাকা দিছি। এখন এতটাই আনন্দ হচ্ছে যে কান্না চলে আসতেছে বারবার।’

default-image

গোয়ালদহে শিক্ষকদের উদ্যোগে প্রথম যে মেয়েদের নিয়ে ফুটবল অনুশীলন শুরু হয়, তাঁদের একজন সাথি বিশ্বাস। ওই সময়ে সাথির পরিবার মেয়েকে ফুটবল খেলতে দিতে আগ্রহী ছিলেন না। মূলত শিক্ষকদের অনুরোধেই সায় দিয়েছিল তাঁর পরিবার।

মঙ্গলবার গোয়ালদহে সাথিদের বাড়িতে কথা হয় তাঁর বাবা বিদ্যুৎ কুমার বিশ্বাস ও মা সুদেবী বিশ্বাসসহ পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে। সাথির দাদা বৈকণ্ঠ কুমার বিশ্বাস বলেন, ‘আমাদের দরিদ্র পরিবার। মেয়েরা যখন ফুটবল খেলা শুরু করে, তখন এলাকার লোকজন বলত মেয়েদের তো নষ্ট করে ফেলতিছ। এখন তাঁরাই বলে তোমার নাতিন তো মানুষ হয়ে গেছে। এলাকায় আমাদের সুনাম বেড়েছে। এখন আমাদের আরও নাতনি বিকেএসপিতে (বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান) খেলতেছে।’

বাজারে একটা ছোট স্টুডিও বিদ্যুৎ কুমার বিশ্বাসের। সেখান থেকে আসা অল্প আয়েই চলে সংসার। তিনি বলেন, ‘আমার মেয়ে এত দূর যাবে ভাবিনি। দেশ–বিদেশে খেলতে যাচ্ছে, এটা বিশাল কিছু মনে হয়।’

এবার মাধ্যমিক পরীক্ষার্থী ছিল সাথি বিশ্বাস। তবে সাফে খেলতে যাওয়ার কারণে পরীক্ষায় অংশ নিতে পারেননি সাথি। এ বিষয়ে তাঁর মা সুদেবী বিশ্বাস বলেন, ‘পরীক্ষা দিবে না খেলতে যাবে, এটা জিজ্ঞেস করেছিল। আমি ওর শিক্ষকদের ওপরে ছেড়ে দিয়েছিলাম। দেশের জন্য খেলে ও যে সম্মান এনেছে, এতে আমি খুবই খুশি।’

সাথি ও ইতি ফুটবল খেলা শুরু করেছিল গোয়ালদহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে। সেখান থেকে বিকেএসপি হয়ে এখন জাতীয় দলের সদস্য।

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মূলত ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্রভাস রঞ্জন দেবজ্যোতি ও সহকারী শিক্ষক শহিদুল ইসলামের উদ্যোগে এলাকায় মেয়েদের ফুটবল খেলা ও অনুশীলন শুরু হয়। কয়েক বছর ধরে সকাল–বিকেল দুই বেলা বিদ্যালয়ের মেয়েদের ফুটবল অনুশীলন করান এই দুই শিক্ষক। তাতে সফলতাও এসেছে। জেলা ও বিভাগীয় পর্যায়ে টুর্নামেন্টে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পাশাপাশি এখন পর্যন্ত এই বিদ্যালয় থেকে ১৪ জন মেয়ে বিকেএসপিতে সুযোগ পেয়েছে। তার মধ্যে ৮ জনসহ মোট ১০টি মেয়ে বিভিন্ন বয়সভিত্তিক জাতীয় দলে খেলছেন।

প্রভাস রঞ্জন দেবজ্যোতি বলেন, ‘মেয়েরা যে গ্রামসহ মাগুরার নাম উজ্জ্বল করেছে, এতেই আমি খুশি।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন