চট্টগ্রাম নার্সিং কলেজের জ্যেষ্ঠ শিক্ষক অঞ্জলী রানী দেবী খুনের ঘটনার ১১ বছরেও কোনো কূলকিনারা হয়নি। একের পর এক তদন্ত কর্মকর্তা ও তদন্তকারী সংস্থার বদল হয়েছে শুধু। কী কারণে, কারা অঞ্জলী দেবীকে হত্যা করেছেন, তা আজও জানা যায়নি। তদন্তকারী সংস্থার দাবি, কাঁধে স্কুলব্যাগ নিয়ে হত্যাকাণ্ডে অংশ নেন চার যুবক। তবে সেই যুবক কারা থানা-পুলিশ, গোয়েন্দা (ডিবি), পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ও অ্যান্টিটেররিজম ইউনিট (এটিইউ) তদন্ত করেও বলতে পারছে না।
আজ শনিবার এই হত্যাকাণ্ডের ১১ বছর পূর্ণ হচ্ছে। এত বছরেও তদন্তে কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় হতাশ নিহত ব্যক্তির পরিবার। তাই বিচারের আশাও ছেড়ে দিয়েছেন তাঁরা। মামলার বাদী ও নিহত ব্যক্তির স্বামী ডা. রাজেন্দ্র লাল চৌধুরী পেশায় চিকিৎসক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘১১ বছরেও কিছুই হয়নি। তাই বিচারের আশাও ছেড়ে দিয়েছি।’
২০১৫ সালের ১০ জানুয়ারি সকালে বাসা থেকে বেরিয়ে কর্মস্থলে যাওয়ার পথে নগরের চকবাজারের উর্দু গলিতে দুর্বৃত্তদের ধারালো অস্ত্রের আঘাতে খুন হন অঞ্জলী দেবী। এ ঘটনায় তাঁর স্বামী চিকিৎসক রাজেন্দ্র লাল চৌধুরী বাদী হয়ে ওই দিন রাতে পাঁচলাইশ থানায় অজ্ঞাতপরিচয় যুবকদের আসামি করে একটি হত্যা মামলা করেন।
তদন্ত কর্মকর্তা ও সংস্থা বদল, ফলাফল শূন্য
শুরু থেকে মামলাটি তদন্ত করেছে পাঁচলাইশ থানার পুলিশ। দু-এক দিন পর থেকে তদন্ত করে নগর গোয়েন্দা পুলিশ। সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে আবু সাঈদ মো. রেজা নামের পটিয়ার এক ব্যক্তিকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে জঙ্গি মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে থাকা এরশাদ হোসেন, শফিকুল ইসলাম ও মোসাবিরুল ইসলামকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। এরপর গ্রেপ্তার দেখানো হয় এহতেশামুল হক ওরফে ভোলা নামের এক ব্যক্তিকে। সবাইকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। কিন্তু কারও কাছ থেকে অঞ্জলী হত্যার ক্লু (সূত্র) পাওয়া যায়নি।
প্রকাশ্যে দিনদুপুরে একজন মানুষকে খুন করা হলো। মায়ের খুনিরা কি ধরা পড়বে না।অর্পিতা চৌধুরী, অঞ্জলী রানী দেবীর মেয়ে
২০১৮ সালের ৩০ আগস্ট এহতেশামকে এ মামলায় গ্রেপ্তার দেখানোর পর গত সাড়ে সাত বছরেও নতুন কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে মামলাটি তদন্তের জন্য ডিবি পুলিশ থেকে পিবিআইয়ের কাছে স্থানান্তর করা হয়। পিবিআইয়ের তিন কর্মকর্তা ২০২২ সালের অক্টোবর পর্যন্ত তদন্ত করেন। পিবিআইয়ের সর্বশেষ কর্মকর্তা পরিদর্শক মোজাম্মেল হক। তিনি বলেন, তদন্তে কিছু পাওয়া যায়নি।
থানা, ডিবি ও পিবিআই কিছু করতে না পারায় পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে মামলাটি ২০২২ সালের নভেম্বরে অ্যান্টিটেররিজম ইউনিটে যায়। সেখানেও কোনো অগ্রগতি নেই। শুধু বদল হয়েছে তদন্তকারী কর্মকর্তা। মামলাটির বর্তমান তদন্তকারী কর্মকর্তা এটিইউ চট্টগ্রামের পরিদর্শক শাহাদাত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘বলার মতো কোনো অগ্রগতি নেই।’ কাঁধে স্কুলব্যাগ নিয়ে ঘটনার পর পালিয়ে যাওয়া চার যুবককে শনাক্ত করা গেছে কি না প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, ‘আমরা হাল ছাড়িনি। চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
তদন্তসংশ্লিষ্ট পুলিশ সূত্র জানায়, এটি পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড। হত্যাকাণ্ডে চার যুবক অংশ নেন। তাঁদের প্রত্যেকের কাঁধে স্কুলব্যাগ ছিল। ওই ব্যাগে করে তাঁরা রামদা নিয়ে আসেন। অঞ্জলী দেবীকে কুপিয়ে রামদা ব্যাগের ভেতরে নিয়ে দৌড়ে পালিয়ে যান। হত্যাকারীরা ছিনতাইকারী হলে অঞ্জলীর মুঠোফোন ও টাকা কেড়ে নিতেন। কিন্তু তাঁর কাছ থেকে কিছুই নেননি তাঁরা। এদিকে তদন্ত প্রতিবেদনের জন্য আদালতে বছরের পর বছর শুধু তারিখ পড়ছে। এখন পর্যন্ত ১৮২টি তারিখ পড়েছে।
থানা, ডিবি ও পিবিআই কিছু করতে না পারায় পুলিশ সদর দপ্তরের নির্দেশে মামলাটি ২০২২ সালের নভেম্বরে অ্যান্টিটেররিজম ইউনিটে যায়। সেখানেও কোনো অগ্রগতি নেই। শুধু বদল হয়েছে তদন্তকারী কর্মকর্তা। মামলাটির বর্তমান তদন্তকারী কর্মকর্তা এটিইউ চট্টগ্রামের পরিদর্শক শাহাদাত হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, ‘বলার মতো কোনো অগ্রগতি নেই।’
অঞ্জলী রানীর দুই মেয়ে অর্পিতা চৌধুরী ও সঙ্গীতা চৌধুরী পেশায় চিকিৎসক। অর্পিতা চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রকাশ্যে দিনদুপুরে একজন মানুষকে খুন করা হলো। মায়ের খুনিরা কি ধরা পড়বে না।’
নিহত অঞ্জলীর স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অঞ্জলীর পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কারও কোনো বিরোধ ছিল না। অঞ্জলী হত্যার রহস্য এখনো বের না হওয়ায় বিস্ময় জানিয়েছেন চট্টগ্রাম নার্সিং কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ রঞ্জু রানী শীল। নিজ কার্যালয়ে তিনি প্রথম আলোকে বলেন, জড়িত ব্যক্তিদের গ্রেপ্তার ও আইনের আওতায় আনা হোক।
৭১ বছর বয়সী অঞ্জলীর স্বামী রাজেন্দ্র লাল চৌধুরী মৃত্যুর আগে অন্তত স্ত্রীর খুনি কারা তা দেখে মরতে চান। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বিচার দূরে থাক, খুনি কারা তা–ও এখনো বের করতে পারেনি পুলিশ।’