দিশারীর সভাপতি হাসান শিকদার বলেন, ‘আমাদের বিদ্যালয়ের উদ্দেশ্য হলো শিশুদের স্কুলমুখী করা। এ জন্য প্রাক্‌-প্রাথমিক থেকে শুরু করে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ানো হয়। এরপর তাদের পাশের সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দিই। ঝরে যাচ্ছে কি না, খোঁজখবর রাখি। শিক্ষা উপকরণ দিই। এ ছাড়া চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীদের প্রতিদিন বিকেলে পড়ান আমাদের স্বেচ্ছাসেবীরা।’

দিশারী স্কুল নামের ওই বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, বস্তির বাঁধের পাশে আধপাকা ঘরে চলছে শিশুদের পাঠদান। বাইরে থেকে কয়েকজন অভিভাবক তা দেখছেন। বিদ্যালয়টিতে তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী খাদিজা। মা-বাবা কেউই বেঁচে নেই। দাদির সঙ্গে বস্তিতে থাকে। খাদিজা বলে, ‘এহানে পড়তে আমার ভালো লাগে। স্যারেরা পড়ার সঙ্গে সঙ্গে মজার মজার গল্প বলে।’

আগে খরচের ভয়ে সন্তানকে স্কুলে দিতে ভয় পেতেন দরিদ্র আফজাল হোসেন। এখন তাঁর ছেলে মো. আলিফ হোসেন দিশারী স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ে। আফজাল হোসেন বলেন, ‘ঠিকমতো খাওনই জুটে না, পোলাপান গো পড়াশোনা করামু কেমনে! তয় এই স্কুলের ছোট ছোট স্যাররা আমাগো ভুল ভাঙাই দিছে। হেরা (তারা) বিনা পয়সায় পড়াচ্ছে। খাতা-কলম থেইক্যা শুরু কইর‍্যা স্কুলব্যাগও দিছে।’

স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন দিশারী সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে এই বিদ্যালয়ে ৫৫ জন শিশু পড়াশোনা করছে। প্রতিদিন বেলা সাড়ে তিনটা থেকে বিকেল সাড়ে পাঁচটা পর্যন্ত দুই ঘণ্টা শিক্ষার্থীদের পাঠদান করা হয়।

সংগঠনটির সদস্যরাই বিদ্যালয়ের শিক্ষক। এখানে তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ার পর শিশুদের পার্শ্ববর্তী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তি করিয়ে দেন সংগঠনের সদস্যরা। এসব শিশুর কারও জন্মসনদ না থাকায় তাদের বিদ্যালয়ে ভর্তি করানো যেত না। পৌর কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে তাদের জন্মসনদের ব্যবস্থা করেন দিশারীর সদস্যরা।

২০১৬ সালে দুই বন্ধু হাসান শিকদার ও আবুল হাসনাত শহরের বেউথা সেতু এলাকায় বেড়াতে যান। ওই সময় বস্তির কর্মজীবী শিশুদের দেখে মন খারাপ হয় দুজনের। কীভাবে তাদের স্কুলমুখী করা যায়, তা নিয়ে ভাবতে থাকেন দুই বন্ধু। এরপর ২০১৭ সালের ১৩ জানুয়ারি হাসান ও হাসনাত তাঁদের কলেজপড়ুয়া বন্ধু আল জাবের, জান্নাতুল ফেরদৌস, শানজীতা রহমানসহ ১১ জনকে নিয়ে গড়ে তোলেন স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন দিশারী।

হাসান ও হাসনাত জানান, নিজেদের হাতখরচের টাকা বাঁচিয়ে প্রতি মাসে শিক্ষা উপকরণ দিয়ে যাচ্ছিলেন তাঁরা। কিন্তু শিশুরা স্কুলমুখী হচ্ছিল না। এর কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখেন, সন্তানের লেখাপড়ার ব্যাপারে উদাসীন অভিভাবকেরা।

শেষমেশ সিদ্ধান্ত নেন, বস্তির শিশুদের তাঁরাই পড়াবেন। ২০১৭ সালে এপ্রিলে বস্তির একটি গাছের নিচে ১৭ শিশুকে চট বিছিয়ে শুরু করেন পাঠদান। ধীরে ধীরে স্কুলে উপস্থিতি বাড়তে থাকে।

এই উদ্যোগের কথা জানতে পারেন তৎকালীন জেলা প্রশাসক এস এম ফেরদৌস। তিনি বস্তির পাশে দিশারীর নামে একটুকরা খাসজমি এবং একটি ঘর তুলে দেন। ২০১৮ সালের ১০ জানুয়ারি থেকে আধপাকা ঘরে শিশুদের পাঠদান শুরু হয়।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) মানিকগঞ্জের সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, এটি একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন