শেরপুরের মহিষের দই, ঘ্রাণে–স্বাদে অন্য রকম

শেরপুরের শ্রীবরদী উপজেলার ঝগড়ারচর উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে সপ্তাহে দুই দিন বসে মহিষের টক দইয়ের হাটছবি: প্রথম আলো

শেরপুর শহর থেকে প্রায় ১২ কিলোমিটার দূরে শ্রীবরদী উপজেলার ঝগড়ারচর উচ্চবিদ্যালয়ের মাঠে সপ্তাহে দুই দিন বসে এক ব্যতিক্রমী হাট। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতে পারে, সাধারণ কোনো গ্রামীণ বাজার। কিন্তু ফটক পেরোতেই চোখে পড়ে সারি সারি মাটির হাঁড়ি—কাপড় দিয়ে ঢাকা। পাশে বসে আছেন বিক্রেতারা।

ক্রেতারা এগিয়ে এলে খুলে যায় ঢাকনা। ভেসে আসে দুধের ঘ্রাণ। এটি ঘন, সাদা, প্রাকৃতিকভাবে জমাট বাঁধা মহিষের টক দই।

শ্রীবরদী উপজেলার ঝগড়াচর উচ্চবিদ্যালয় মাঠে বুধ ও শনিবার দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে এ হাট। জেলা পেরিয়ে দূরদূরান্ত থেকেও মানুষ আসেন শুধু এই দই কিনতে। প্রতি কেজি দই বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ২০০ টাকায়।

সনাতন পদ্ধতিতে তৈরি

এই দই তৈরিতে নেই কোনো কৃত্রিম উপকরণ, অতিরিক্ত তাপ বা রাসায়নিক। বিক্রেতাদের ভাষ্য, প্রথমে মহিষের দুধ সংগ্রহ করে পরিষ্কার মাটির হাঁড়িতে ঢেলে ঢাকনা দিয়ে রেখে দেওয়া হয়। তিন দিন পর স্বাভাবিকভাবেই দুধ জমে তৈরি হয় ঘন টক দই। মহিষের দুধের উচ্চ ফ্যাট ও ঘনত্বের কারণেই এটি আলাদা করে জ্বাল দেওয়া বা বীজ মেশানো ছাড়াই জমে যায়।

বুধবার এই হাটে আসা উপজেলার ভেলুয়া গ্রামের ইসমাইল হোসেন বলেন, খাঁটি মহিষের দুধ ছাড়া এখানে কিছুই ব্যবহার হয় না। কোনো রং বা কেমিক্যাল নেই। তাই এ দইয়ের চাহিদা দিন দিন বেড়ে চলেছে।

শনিরচর গ্রামের জুয়েল মিয়া বলেন, হাঁড়ি ভালোভাবে পরিষ্কার করে সামান্য শর্ষের তেল মেখে রোদে বা হালকা তাপে শুকিয়ে নেওয়া হয়। তারপর ছেঁকে রাখা তাজা দুধ তিন দিনের মধ্যেই জমে দই তৈরি হয়। এতে আলাদা কোনো পরিশ্রম করতে হয় না।

একেকটি হাঁড়িতে ২ থেকে ১৫ কেজি পর্যন্ত দই বসানো যায়। এক কেজি দইয়ের জন্য লাগে এক লিটারের কিছু বেশি দুধ। একটি মহিষ থেকে দিনে তিন–চার লিটার দুধ মেলে। অনেক পরিবার দুই দিন দুধ জমিয়ে তৃতীয় দিনে দই বসান, এরপর হাটে নিয়ে আসেন।

প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে

ঝগড়ারচরের আবদুল হালিম প্রায় ৩০ বছর ধরে এ হাটে দই বিক্রি করছেন। তাঁর তিনটি মহিষ আছে। তিনি দুই দিনে প্রায় ২৪ কেজি দুধ সংগ্রহ করে দই তৈরি করেন। তিন দিন পর সেই দই বিক্রি করতে নেন। তিনি বলেন, এখানে মহিষের দুধ খাওয়ার চল কম, সবাই দই খায়।

শনিরচর গ্রামের মো. ইয়াকুব আলী এসেছেন দুটি হাঁড়িভর্তি দই নিয়ে। দুই ঘণ্টার মধ্যেই সব বিক্রি হয়ে যায়। তাঁর কথায়, ‘দাদার আমল থেকে আমরা এ দই বিক্রি করছি। প্রতি হাটে ১০–১৫ মণ পর্যন্ত বিক্রি হয়। দেশের বিভিন্ন জায়গায় যায় আমাদের দই।’

এ অঞ্চলের মানুষ ভাত ও চিড়া-মুড়ির সঙ্গে দই ও খেজুরের গুড় মিশিয়ে খান। গরমের দিনে দই, পানি ও চিনি মিশিয়ে তৈরি করেন ঘোল। রোজার মাসে ইফতারের সময়ও থাকে এই টক দইয়ের নানা আইটেম।

শেরপুর শহর থেকে দই কিনতে আসা কনটেন্ট ক্রিয়েটর লাভনী আক্তার বলেন, ইফতারের পর এই দই খেলে শরীর ঠান্ডা হয়ে যায়। এর ঘ্রাণ আর স্বাদই আলাদা।