‘বাপকে বিশ্বাস করি নাই, আপনাদের বিশ্বাস করে টাকা দিছি’

ক্ষুব্ধ আমানতকারীদের সঙ্গে কথা বলছেন ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামি ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ শাখা ব্যবস্থাপক ও পুলিশ সদস্যরাছবি: ভিডিও থেকে নেওয়া

‘ব্যাংকের কর্মকর্তাদের বেতন-বোনাস চলছে। কিন্তু আমরা আমাদের টাকা চাইলে তারা দিতে পারে না। শুধু সময় চাইছে আর হেয়ার কাটের কথা বলছে। আমরা প্রতিদিন এসে ঘুরে যাচ্ছি। আমানতকারীদের টাকা নিয়ে তারা এমন টালবাহানা করছে। আমরা আমাদের টাকা ফেরত চাই। আমরা আমাদের নিজেদের টাকা চাইছি, অন্য কারও টাকা চাইছি না।’

চট্টগ্রাম নগরের খাতুনগঞ্জ এলাকায় ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক এলাকায় ক্ষোভ নিয়ে কথাগুলো বলছিলেন অবসরপ্রাপ্ত চাকরিজীবী শাহীনুর বেগম। আজ দুপুরে ব্যাংকের খাতুনগঞ্জ করপোরেট শাখায় আরও দুই শতাধিক আমানতকারীর বিক্ষোভে তিনিও ছিলেন। এর আগে এদিন ইউনিয়ন ব্যাংক ও এক্সিম ব্যাংক খাতুনগঞ্জ করপোরেট শাখায় তালা দেন বিক্ষোভকারীরা।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীদের হেয়ার কাট (মুনাফা কেটে রাখা) বাতিল ও লেনদেন স্বাভাবিক করার দাবিতে এদিন সকালে ইউনিয়ন ব্যাংকের সামনে বিক্ষোভ করেন তাঁরা। পরে ব্যাংকটিতে তালা ঝুলিয়ে দেন। এরপর ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংকেও তালা দিতে গেলে সেখানে হট্টগোল শুরু হয়। পরে পুলিশ এসে তালা খুলে দিলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়।

একীভূত হওয়ার প্রক্রিয়ায় থাকা ব্যাংকগুলো হলো এক্সিম ব্যাংক, সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক, ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক, গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক ও ইউনিয়ন ব্যাংক। এসব ব্যাংকে প্রায় ৭৫ লাখ আমানতকারীর মোট ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা জমা রয়েছে। আমানত ফিরে পেতে এর আগেও দুই-তিন দফা চট্টগ্রামের বিভিন্ন শাখায় আমানতকারীরা প্রতিবাদ করেছিলেন।

দুপুর ১২টার দিকে ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক খাতুনগঞ্জ শাখায় পুলিশের একটি দল আসে। এ সময় শাখা ব্যবস্থাপকের কক্ষে প্রবেশ করেন আমানতকারীরা। সেখানে কয়েক দফা ব্যবস্থাপকের সঙ্গে বাগ্‌বিতণ্ডা হয় আমানতকারীদের। একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘বাপকে বিশ্বাস করি নাই, স্ত্রীকে বিশ্বাস করি নাই, আপনাদের বিশ্বাস করে টাকা দিছি। আমার টাকা কেন দিতে পারবেন না।’

জানতে চাইলে ব্যাংকটির শাখা ব্যবস্থাপক কে এম আবু সাঈদ বলেন, ‘হেয়ার কাট বাতিল ও স্বাভাবিক লেনদেন চালুর দাবিতে তাঁরা এসেছিলেন। আমরা তাঁদের দাবিগুলো ঊর্ধ্বতনদের জানিয়েছি। এখানে যাঁরা এসেছেন অধিকাংশই তৃণমূলের আমানতকারী। পুলিশ তাঁদের বোঝানোর পর তাঁরা চলে গেছেন।’

কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আফতাব উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা দুই পক্ষের সঙ্গে কথা বলেছি। আমানতকারীদের দাবিদাওয়াগুলো ব্যাংকের মাধ্যমে ঊর্ধ্বতনদের কাছে পাঠানো হয়েছে। ইউনিয়ন ব্যাংকের তালা খুলে দেওয়া হয়েছে বেলা ২টার দিকে।’

প্রসঙ্গত, গত ১৪ জানুয়ারি কেন্দ্রীয় ব্যাংক একীভূত প্রক্রিয়ায় থাকা পাঁচ ব্যাংকের আমানতে ২০২৪ সালের শুরু থেকে ২০২৫ সালের শেষ পর্যন্ত কোনো মুনাফা না দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানায়। এতে আমানতকারীদের মধ্যে উদ্বেগ ও সমালোচনা তৈরি হয়। পরে সেই অবস্থান থেকে সরে এসে নতুন সিদ্ধান্তে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের জন্য ব্যক্তিগত ও মেয়াদি আমানতে ৪ শতাংশ মুনাফা নির্ধারণ করা হয়।

এর আগে পাঁচ ব্যাংকের শেয়ার শূন্য ঘোষণা করা হয়। এতে লুটপাটের অভিযোগ থাকা উদ্যোক্তাদের পাশাপাশি পাঁচ ব্যাংকের সাধারণ বিনিয়োগকারীদের শেয়ারও শূন্য হয়ে পড়ে। তখন বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে বলা হয়, প্রতিটি শেয়ারের মূল্য ঋণাত্মক ২০০ থেকে ৩০০ টাকা হয়ে পড়েছে। ফলে বিনিয়োগকারীর পাশাপাশি আমানতকারীও ক্ষতিতে পড়ল।