টঙ্গীতে মাদ্রাসায় যৌন নিপীড়ন: ঘটনার পরদিন মিষ্টি নিয়ে শিশুটির বাড়িতে গিয়েছিলেন অভিযুক্ত শিক্ষক
হাতে লাল রঙের একটি ব্যাগ। তাতে মিষ্টির প্যাকেট। পাঞ্জাবি পরা এক ব্যক্তি ভবনের নিচতলায় ঢুকে কথা বলছেন নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে। এরপর এগিয়ে গেলেন লিফটের দিকে। কিছুক্ষণ পর লিফটে করে ওপরে উঠলেন। কিন্তু যে বাসায় যাওয়ার কথা, সেই বাসার দরজা আর খোলা হলো না। প্রায় ১০ মিনিট পর একই ব্যাগ হাতে ভবন থেকে বের হয়ে যান তিনি।
ব্যক্তিটি হলেন গাজীপুরের টঙ্গীর একটি মাদ্রাসার শিক্ষক মোসলেম আহম্মদ (৩০)। ১৯ অক্টোবর ওই মাদ্রাসায় সাত বছরের এক মেয়েশিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ উঠেছিল তাঁর বিরুদ্ধে। ঘটনার পরদিন দুপুরে শিশুটির পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন তিনি। সঙ্গে ছিল মিষ্টির প্যাকেট।
আজ সোমবার দুপুরে শিশুটির পরিবার যে ভবনে থাকে, সেখানকার ক্লোজড সার্কিট (সিসিটিভি) ক্যামেরার ফুটেজ প্রথম আলোর হাতে এসেছে। ফুটেজে দেখা যায়, ২০ অক্টোবর দুপুর ১২টা ৩৮ মিনিটে লাল রঙের ব্যাগ হাতে ভবনে প্রবেশ করেন মাদ্রাসার শিক্ষক মোসলেম আহম্মদ। নিচতলায় নিরাপত্তাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে তিনি লিফটের দিকে যান। ১২টা ৩৯ মিনিটে তাঁকে লিফটে উঠতে দেখা যায়। পরে তিনি আবার নিচে নেমে বেরিয়ে যান। পুরো সময় তাঁর হাতে ছিল সেই ব্যাগ। অন্য একটি ফুটেজে ব্যাগের ভেতরে মিষ্টির প্যাকেট দেখা যায়।
শিশুটির পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দেখা করতে না পেরে শিশুটির মায়ের হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে ২০ অক্টোবর দুপুর ১২টা ৪৫ মিনিটে একটি বার্তা পাঠান অভিযুক্ত শিক্ষক। তাতে লেখা ছিল, ‘আপু, আপনার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছি। আপনার সঙ্গে একটু দেখা করতে আসছি (এসেছি)।’
ওই সময় বাসায় ছিলেন না শিশুটির বাবা। শেষ পর্যন্ত শিশুটির পরিবারের সঙ্গে আর দেখা হয়নি অভিযুক্ত শিক্ষকের। দেখা না করেই তিনি ফিরে যান মাদ্রাসায়। বর্তমানে তিনি কারাগারে আছেন। যে কারণে ঘটনার পরদিন কেন তিনি মিষ্টি নিয়ে শিশুটির পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন, সে বিষয়ে তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
‘অভিযোগ তুলে নিতে বলছে, আতঙ্কের মধ্যে আছি’
শিশুটির পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার পর থেকে তাঁরা বিভিন্নভাবে হুমকি পেয়েছেন। পরিবারের সদস্যদের মোবাইল নম্বর ছড়িয়ে পড়ায় বিভিন্ন নম্বর থেকে তাঁদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হচ্ছে। অভিযোগ তুলে নিতে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা ভিডিও সরিয়ে ফেলতে চাপ দেওয়া হচ্ছে বলেও দাবি করেন শিশুটির বাবা।
সোমবার বিকেলে শিশুটির বাবার সঙ্গে প্রথম আলোর কথা হয়। তিনি বলেন, ‘আমার এবং আমার পরিবারের মোবাইল নম্বরগুলো সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। এই সুযোগে আমাদের ফোনে নানাভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। বলছে, অভিযোগ যেন তুলে নিই। যেসব ভিডিও আপলোড করা হয়েছে, সেগুলো যেন ফেলে দিই। সারাক্ষণ একটা আতঙ্কের মধ্যে কাটছে।’
শিশুটির বাবা আরও বলেন, ‘আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, আমার এই প্রতিবাদ আলেম সমাজের বিরুদ্ধে নয়। আমার এই প্রতিবাদ লেবাসধারীদের বিরুদ্ধে।’
শিশুটিকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। গত শনিবার টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে বিভিন্ন আলামত সংগ্রহ করেছি। এতে প্রাথমিকভাবে ঘটনার সত্যতা (শিশুকে নিপীড়ন করা হয়েছে) পাওয়া গেছে। এখনো তদন্তের কাজ চলমান।’
আমার এবং আমার পরিবারের মোবাইল নম্বরগুলো সব জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছে। এই সুযোগে আমাদের ফোনে নানাভাবে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। বলছে অভিযোগ যেন তুলে নিই। যেসব ভিডিও আপলোড করা হয়েছে, সেগুলো যেন ফেলে দিই। সারাক্ষণ একটা আতঙ্কের মধ্যে কাটছে।
যেভাবে ঘটনার সূত্রপাত
১৯ অক্টোবর টঙ্গীর একটি মাদ্রাসায় এক শিশুকে যৌন নিপীড়নের অভিযোগ ওঠে শিক্ষক মোসলেম আহম্মদের বিরুদ্ধে। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর শিশুটির পরিবারের পক্ষ থেকে থানায় অভিযোগ করা হয়। এ নিয়ে এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে অভিযুক্ত শিক্ষককে মারধর করে পুলিশের হাতে তুলে দেন শিশুটির বাবা ও স্থানীয় লোকজন। ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি দেশজুড়ে আলোচনার জন্ম দেয়।
শিশুটির বাবা অভিযোগ করেন, তাঁর সন্তানের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ঘটনার বিচার চাইতে তিনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে গিয়েছেন। তাঁর দাবি, বিচার চাওয়ার কারণে এখন উল্টো তাঁকে ও তাঁর পরিবারকে চাপের মুখে পড়তে হচ্ছে।
এ ঘটনায় করা মামলায় পুলিশ অভিযুক্ত শিক্ষক মোসলেমকে ২১ অক্টোবর গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠায়। গতকাল রোববার তাঁর জামিন শুনানির দিন ধার্য ছিল। আদালত তাঁর জামিন নামঞ্জুর করেন।
শিশুটির পরিবারের হুমকি পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে টঙ্গী পশ্চিম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, দুই পক্ষই থানায় মৌখিকভাবে অভিযোগ করেছেন তাদের হুমকি দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু হুমকির বিষয়ে এখন পর্যন্ত লিখিত কোনো অভিযোগ পাইনি।