যখন যে সরকারে থাকে, আইসাই বলে আইনশৃঙ্খলা আগের চেয়ে ভালো : জামায়াতের আমির

সিলেট সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। আজ বৃহস্পতিবার বিকেলেছবি : প্রথম আলো

দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতের আমির শফিকুর রহমান। তিনি বলেন, সরকার প্রায়ই দাবি করছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগের চেয়ে ভালো। কিন্তু সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতায় এর প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। আজ বৃহস্পতিবার বিকেলে সিলেট সার্কিট হাউসে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন।

দুই দিনের সফরে আজ সকালে সিলেটে আসেন শফিকুর রহমান। কয়েকটি দলীয় ও সামাজিক কর্মসূচিতে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি মতবিনিময় সভা করবেন তিনি। মতবিনিময় সভায় শফিকুর রহমান বলেন, ‘সরকারি দল, যখন যে সরকারে থাকে, আইসাই বলে যে আইনশৃঙ্খলা আগের চেয়ে ভালো। আমি সংসদে কথাটা বলেছি, ওই আগটাকে বুঝলাম না, আর ভালোটাও দেখলাম না। আপনি ভালো বলবেন। পথে–ঘাটে, রাস্তায় বিভিন্ন জায়গায় ঘরে–দুয়ারে যা ঘটতেছে, ভালো বলবেন?’

সম্প্রতি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকের ছেলের হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে জামায়াতের আমির বলেন, ‘একটা ছেলে কিছুদিন আগে মারা গেলে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাহিদা ম্যাডামের ছেলে; এখন তাকে দুষ্টু বানানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। এটা দায়িত্ব এভয়েড করার চেষ্টা করা হচ্ছে। সে দুষ্ট হলে এভাবে মারবে তারে? সে যদি দুষ্ট হয়ে থাকে, তাহলে তাকে ভালো করার চেষ্টা করেছি আমরা? এখন তার দায়িত্ব এড়িয়ে চলা, উদোর পিণ্ডি বুধোর ঘাড়ে ফেলে দেওয়া, এটা কোনো ভালো লক্ষণ নয়।’

মাদক ও অস্ত্রের বিস্তার নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন শফিকুর রহমান। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ‘সবার ব্যাপারে খবর রাখেন, শুধু নিজেরটা পারেন না। তাঁর একই রাজনৈতিক দলের নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেছেন, “মাদকের বড় চালান আসে উনার এলাকা থেকে। আমরা বলিনি।”’

চাঁদাবাজির প্রসঙ্গে জামায়াতের আমির বলেন, সিলেটে চাঁদাবাজি নেই—এমনটা বলা যাবে না। গণমাধ্যম স্বাধীনভাবে এসব বিষয় তুলে ধরতে পারলে প্রকৃত পরিস্থিতি সামনে আসবে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা তিনি বলেন, সাংবাদিকেরা অনেক সময় চাপের মধ্যে কাজ করেন এবং অনেক ক্ষেত্রে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রেও চাপ থাকে।

রেল যোগাযোগ মিটারগেজে রয়ে গেছে
সিলেটের বিভিন্ন সমস্যা তুলে ধরে বিরোধীদলীয় নেতা বলেন, ঢাকার সঙ্গে সিলেটের রেল যোগাযোগ এখনো মিটারগেজে রয়ে গেছে। এটি ডাবল লাইনে উন্নীত হয়নি। অথচ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে রেল যোগাযোগের উন্নয়ন হয়েছে। সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরও পূর্ণাঙ্গ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সুবিধা পায়নি। বিভিন্ন দেশ থেকে সরাসরি বিমান চলাচলও সীমিত। সিলেটের মানুষের অনেক ন্যায্য দাবি রয়েছে। এসব দাবি সরকারের কাছে তুলে ধরা কোনো অপরাধ নয়, বরং জনগণের অধিকার।

হজরত শাহজালাল (রহ.) মাজারের দানের অর্থ ব্যবস্থাপনা নিয়ে সাংবাদিকের এক প্রশ্নের জবাবে শফিকুর রহমান বলেন, বিষয়টি ধর্মীয় ও সংবেদনশীল। তাই এটা নিয়ে চাপ প্রয়োগের পরিবর্তে টেকসই সমাধান খুঁজতে হবে। আরও ভালো হতো যদি দানের অর্থের একটি বড় অংশ সমাজ ও ধর্মীয় কল্যাণে ব্যবহার করা যেত। সরকার, মাজারের খাদেম পরিবার এবং সিলেটের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার প্রতিনিধিদের নিয়ে একটি সংলাপ হতে পারে। আমার বিশ্বাস, সুন্দর কিছু বেরিয়ে আসবে।’

বাসে ভাড়া বেড়েছে
জ্বালানি তেলের দাম বাড়লেও নিত্যপণ্যের ওপর তেমন প্রভাব পড়বে না—সরকারের এমন বক্তব্যের সমালোচনা করেন বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, জ্বালানির দাম বাড়ার প্রভাব ইতিমধ্যে দ্রব্যমূল্যে পড়েছে। যাতায়াত খরচ বেড়েছে। বাসে ভাড়া বেড়েছে, ট্রেনের ভাড়াও বাড়তে পারে। বিরোধী দলের কর্মসূচিকে মুখরোচক বক্তব্য না দিয়ে দায়িত্বশীল বক্তব্য দেওয়ার আহ্বান জানানো প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিরোধী দল সংসদের ভেতরেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছে।

চা–শিল্পের উন্নয়ন প্রসঙ্গ
চা–শ্রমিকদের জীবনমান উন্নয়নে সরকার ও মালিকপক্ষ—দুই পক্ষেরই দায়িত্ব রয়েছে বলে মন্তব্য করেন বিরোধীদলীয় নেতা। তিনি বলেন, চা–শ্রমিকেরা এ দেশের নাগরিক এবং তাঁদের ভোটাধিকার রয়েছে। তাঁদের শুধু বেঁচে থাকা ও খাবারের অধিকার নয়, সন্তানদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও নাগরিক জীবনের মৌলিক সুযোগ পাওয়ার অধিকারও রয়েছে। চা–শিল্পের বর্তমান অবস্থার উন্নয়নেও সরকার ও মালিকপক্ষকে দায়িত্ব নিতে হবে বলে মন্তব্য করেন তিনি।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিলম্বিত হওয়ায় সাধারণ মানুষের ভোগান্তি বাড়ছে বলে মন্তব্য করেন শফিকুর রহমান। তাঁর মতে, অনেক জায়গায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি নেই। ফলে মানুষ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। নির্বাচন কমিশনের নির্বাচনসূচি ঘোষণার পর সেটি পিছিয়ে দেওয়ার বিষয়েও প্রশ্ন তোলেন তিনি। নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন ও শক্তিশালী ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান। দেশে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর মানুষের প্রত্যাশা অনুযায়ী কাঙ্ক্ষিত রূপান্তর এখনো দৃশ্যমান হয়নি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

মতবিনিময়কালে উপস্থিত ছিলেন সিলেট মহানগর জামায়াতে ইসলামীর আমির মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম, সিসিকের জামায়াতে ইসলামী মনোনীত মেয়র প্রার্থী নূরুল ইসলাম বাবুল ও সিলেট প্রেসক্লাবের সভাপতি মুকতাবিস উন নূর প্রমুখ।