বেশির ভাগ প্রার্থী সব ভোটকক্ষে এজেন্ট দিতে পারছেন না

নির্বাচনী প্রস্তুতি হিসেবে রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে গণভোট ও নির্বাচনের ব্যালট পেপার সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে পাঠানো হচ্ছে। গতকাল সোমবার খুলনা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনেছবি: প্রথম আলো

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনে বিভিন্ন দলের মোট ৩৮ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তবে তাঁদের বেশির ভাগ প্রার্থী সব ভোটকক্ষে পোলিং এজেন্ট দিতে পারছেন না। জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে খুলনা–৩ আসনে সর্বনিম্ন ৫০৬টি বুথ বা ভোটকক্ষ রয়েছে। সবচেয়ে বেশি ভোটকক্ষ রয়েছে খুলনা–৫ আসনে—৮৪৭টি।

দলীয় সূত্রে জানা গেছে, সব ভোটকক্ষের জন্য পোলিং এজেন্টের তালিকা চূড়ান্ত করেছেন বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) প্রার্থীরাও এজেন্টের তালিকা প্রস্তুত করেছেন। অন্য দলের অধিকাংশ প্রার্থী কেবল কিছু নির্বাচনী কেন্দ্রে এজেন্ট দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছেন।

খুলনায় বিএনপির ছয়, জামায়াতে ইসলামীর পাঁচ এবং ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের পাঁচজন প্রার্থী রয়েছেন। জাতীয় পার্টি চারটি আসনে, সিপিবি তিনটি আসনে প্রার্থী দিয়েছে। খেলাফতে মজলিস, ইসলামী ফ্রন্ট, জেএসডি, বাসদ, বাংলাদেশ মাইনরিটি জাতীয় পার্টি, গণ অধিকার পরিষদ, বাংলাদেশ সম অধিকার পরিষদ ও এনডিএম একটি করে আসনে প্রার্থী দিয়েছে। বাকিরা স্বতন্ত্র প্রার্থী।

অন্তত ১৩ জন প্রার্থীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁরা কেউ সব ভোটকক্ষে এজেন্ট দিতে পারছেন না। এমন প্রার্থীর সংখ্যা অন্তত ২২ জন হবে। একজনও এজেন্ট দিচ্ছেন না এমন প্রার্থীও রয়েছেন।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা বলছেন, পোলিং এজেন্টের সংখ্যার মাধ্যমে প্রার্থীদের সাংগঠনিক শক্তি ও সম্ভাব্য ফলাফল সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তাঁদের মতে, খুলনায় মূল লড়াই হবে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীদের মধ্যে।

খুলনা নাগরিক সমাজের সদস্যসচিব মো. বাবুল হাওলাদার বলেন, বড় দল বাদে অন্য দলের অধিকাংশ প্রার্থীই অপরিচিত মুখ। পোলিং এজেন্ট দিতে কর্মী-সমর্থক ও অর্থের প্রয়োজন, যা অনেকেরই নেই।

খুলনা–১ (দাকোপ-বটিয়াঘাটা) আসনে এবার ভোটার ৩ লাখ ৭ হাজার ১০৩ জন। এখানে ১১৯টি ভোটকেন্দ্রে ৬০২টি বুথ রয়েছে। ১৯৯১ সালের পর আওয়ামী লীগের বাইরে কেউ এ আসনে জয়ী হননি। এবার বিএনপির প্রার্থী আমীর এজাজ খান। জামায়াত প্রথমবার হিন্দুসম্প্রদায়ের কৃষ্ণ নন্দীকে প্রার্থী করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। এই আসনে মোট প্রার্থী ১২ জন। এর মধ্যে ৮ জনই সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। তবে এসব প্রার্থীর বেশির ভাগই এলাকার মানুষের কাছে ‘অচেনা’। বিএনপি, জামায়াত, ইসলামী আন্দোলন ও সিপিবির বাইরে এই আসনে অন্য দলের সাংগঠনিক ভিত্তি একেবারে নাজুক। আসনটির ১২ জন প্রার্থীর মধ্যে কম করে ৯ জন প্রার্থী সব ভোটকক্ষে এজেন্ট দিতে পারবেন না বলে জানা গেছে।

আসনটিতে বাংলাদেশ ইসলামী ফ্রন্টের প্রার্থী সুনীল শুভ রায় প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রতিটি ভোটকক্ষে হয়তো পারব না, এটা ব্যয়বহুল। তবে প্রতিটি কেন্দ্রে এজেন্ট থাকবে।’

খুলনা–২ (সদর-সোনাডাঙ্গা) আসনে ভোটার ৩ লাখ ৩৫ হাজার ২৪১ জন। ভোটকেন্দ্র ১৫৭টি, বুথ ৬৫৭টি। বিএনপি, জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলনের সাংগঠনিক অবস্থা শক্ত হওয়ায় প্রায় সব বুথে তাদের এজেন্ট থাকবে। বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, সব ভোটকক্ষের জন্য এজেন্ট তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে।

খুলনা–৩ (সিটি ১–১৫ নম্বর ওয়ার্ড, যোগীপোল, আড়ংঘাটা) আসনে ভোটার ২ লাখ ৫৪ হাজার ৪০৯ জন। ভোটকেন্দ্র ১১৫টি, বুথ ৫০৬টি। এখানে ৪ জন স্বতন্ত্রসহ মোট ১০ জন প্রার্থী রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অন্তত ছয়জন প্রার্থী সব ভোটকক্ষে তাঁদের এজেন্ট দিতে পারবেন না। বিএনপির ছাত্রবিষয়ক সম্পাদক রকিবুল ইসলাম বকুল দলটির প্রার্থী হয়েছেন। খুলনা মহানগর জামায়াতের আমির মাহফুজুর রহমান এবার দলীয় প্রার্থী।

খুলনা-৩ আসনে বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দলের (বাসদ) প্রার্থী জনার্দন দত্ত পোলিং এজেন্টদের হাতে নিয়োগপত্র তুলে দিচ্ছেন। আজ মঙ্গলবার খুলনার খালিশপুরে প্রার্থীর নির্বাচনী কার্যালয়ে
ছবি: প্রথম আলো

আসনটিতে বাসদ মনোনীত মই প্রতীকের প্রার্থী জনার্দন দত্ত প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রতিটি বুথে আমরা এজেন্ট দিতে পররব না। ২৫-৩০ জন এজেন্ট আমরা দেব।’ ফুটবল প্রতীকের প্রার্থী মঈন মোহাম্মদ মায়াজ বলেন, ‘প্রথমবার নির্বাচন করছি। সব কক্ষে পারব না, তবে চেষ্টা থাকছে।’

জাতীয় পার্টির প্রার্থী মো. আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘সব কক্ষে এজেন্ট দেওয়ার লোক আমাদের আছে। তবে দেব কি না, এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।’

খুলনা–৪ (রূপসা-তেরখাদা-দিঘলিয়া) আসনে ভোটার ৩ লাখ ৭৮ হাজার ৪৫৩ জন। ভোটকেন্দ্র ১৪৪টি, বুথ ৭৫৮টি। এই আসনে বিএনপির প্রার্থী কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি আজিজুল বারী হেলাল। জামায়াত আসনটি ছেড়ে দিয়েছে খেলাফত মজলিসের এস এম সাখাওয়াত হোসাইনকে। ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ এখানে প্রার্থী করেছে দলটির মহাসচিব ইউনূস আহম্মেদ শেখকে।

আসনটির স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এম আজমল হোসেন বলেন, ‘৬০০টির মতো বুথে এজেন্ট দেওয়ার পরিকল্পনা করেছি।’

খুলনা–৫ (ডুমুরিয়া-ফুলতলা-গিলাতলা ক্যান্টনমেন্ট) আসনে ভোটার ৪ লাখ ২ হাজার ৭৯৮ জন। ভোটকেন্দ্র ১৫০টি, বুথ ৮০৭টি। জামায়াতের মিয়া গোলাম পরওয়ার ও বিএনপির মোহাম্মদ আলী আসগার লবি ছাড়া অন্য দুই প্রার্থী সব বুথে এজেন্ট দিতে পারছেন না।

এই আসনের সিপিবির প্রার্থী চিত্ত রঞ্জন গোলদার বলেন, ‘সব ভোটকক্ষে এজেন্ট দিতে পারছি না। তবে সব কেন্দ্রে দেওয়ার চেষ্টা করছি, কতটা পেরে উঠব, বলা যাচ্ছে না।’

খুলনা–৬ (কয়রা-পাইকগাছা) আসনে ভোটার ৪ লাখ ২৩ হাজার ৩৩১ জন। ভোটকেন্দ্র ১৫৫টি, বুথ ৮৪৭টি। এখানে মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বিএনপির প্রার্থী এস এম মনিরুল হাসানের সঙ্গে জামায়াতের আবুল কালাম আজাদের। এখানেও বিএনপি ও জামায়াতের বাইরে অন্য প্রার্থীরা সব বুথে এজেন্ট দিতে পারবেন না।

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) খুলনা জেলা সাধারণ সম্পাদক কুদরত–ই–খুদা বলেন, খুলনায় বড় দল ছাড়া অধিকাংশ প্রার্থীই নতুন ও অপরিচিত। তাঁদের সাংগঠনিক সক্ষমতা সীমিত। খুলনায় বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে লড়াই জমজমাটই হবে।