পর্যটকদের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. রেজাউল করিম প্রথম আলোকে বলেন, পর্যটকদের ছবি তোলার জন্য সৈকতে ছয় শতাধিক আলোকচিত্রী আছেন। আলোকচিত্রীদের ছবি তোলার লাইসেন্স (অনুমতিপত্র) দেয় জেলা প্রশাসনের পর্যটন শাখা। ট্যুরিস্ট পুলিশের কাছে আলোকচিত্রীদের তথ্য অথবা ডেটাবেজ নেই। ছবি তোলার জন্য জেলা প্রশাসন যাঁদের লাইসেন্স দিয়েছে, তাঁদের অনেকেই মাঠে নেই। বছরে সর্বোচ্চ এক লাখ টাকায় লাইসেন্স ভাড়া নিয়ে ক্যামেরা কাঁধে মাঠে নেমেছেন অপেশাদার অনেক তরুণ-যুবক। ছয় শতাধিক লাইসেন্সের বিপরীতে বছরে ২৪ লাখ টাকার বেশি আদায় হলেও আলোকচিত্রীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রাখা হয়নি। ভাড়াটে আলোকচিত্রীদের মারমুখী আচরণ, বাগ্‌বিতণ্ডা, হয়রানির ঘটনা পর্যটকের মনে নেতিবাচক ধারণার সৃষ্টি করছে।

ট্যুরিস্ট পুলিশ জানায়, গতকাল মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে সৈকতের সুগন্ধা পয়েন্টে ছবি তুলে পর্যটক হয়রানির অভিযোগে তহিদুল ইসলাম (৩০) নামের ভ্রাম্যমাণ আলোকচিত্রীকে আটক করে ট্যুরিস্ট পুলিশ। তাঁর কাছে ছবি তোলার লাইসেন্স, পরিচয়পত্র ও পোশাক—কোনোটাই ছিল না। তহিদুলের বাড়ি চকরিয়া উপজেলার উত্তর লক্ষ্যারচর গ্রামে।

এর আগের দিন সোমবার বিকেলে উখিয়ার ইনানী ও পাটোয়ারটেক সৈকতে ছবি ওঠানোর কথা বলে পর্যটকদের হয়রানির অভিযোগে এমন সাতজনকে আটক এবং সাতটি ক্যামেরা জব্দ করা হয়েছে। তাঁদের কাছে ছবি তোলার প্রশিক্ষণ ও লাইসেন্স নেই

সৈকতে আসা সিলেটের ব্যবসায়ী আবদুর রাজ্জাক (৪৫) বলেন, আলোকচিত্রীদের জন্য সৈকতে পা রাখা যায় না। ছবি তোলার বাহানায় পেছনে লেগে থাকে সারাক্ষণ। বিরক্ত করতে নিষেধ করলে কটুকথা শুনতে হয়। বাধ্য হয়ে ছবি তুললে অতিরিক্ত টাকা গুনতে হয়। ঘোড়ার পিঠে উঠে ১০টি ছবি তোলার কথা বলে আলোকচিত্রী ৫০টি ছবি তুলে তাঁর কাছ থেকে ২০০ টাকা নিয়ে গেছেন।

রাজধানীর সূত্রাপুর থেকে আসা সাজ্জাদ-সাজেয়া দম্পতি সৈকতে নামলে কয়েকজন আলোকচিত্রী তাঁদের ঘিরে ধরেন। পরে একজন আলোকচিত্রীকে ২০টা ছবি তুলে দিতে বলেন তাঁরা। ওই আলোকচিত্রী ছবি তোলেন ২০০টির বেশি। ওই ছবি মেমোরিকার্ডে ঢুকিয়ে দেওয়ার বিপরীতে তাঁদের কাছে দুই হাজার টাকা দাবি করেন। পরে দেড় হাজার টাকায় আপসরফা হয়।

মঙ্গলবার সৈকতের কলাতলী পয়েন্টে ক্যামেরা নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা নয়ন (২৩) বলেন, সকাল ৮টা থেকে বেলা ১১টা পর্যন্ত চার ঘণ্টায় তিনি ছবি তুলে ১ হাজার ১৫০ টাকা আয় করেন। বিকেল ৫টা পর্যন্ত আরও দুই হাজার টাকা আয় হবে জানিয়ে তিনি বলেন, দিনে যা আয় হয়, তার অর্ধেক লাইসেন্স মালিককে পরিশোধ করতে হয়। তাঁর লাইসেন্সের মূল মালিক থাকেন মালয়েশিয়ায়। বছরে ৮০ হাজার টাকায় ওই লাইসেন্স ভাড়া নিয়েছেন হাবিব উল্লাহ নামের একজন। হাবিবের কাছ থেকে ৫০ শতাংশ কমিশনে ভাড়া নিয়েছেন তিনি। লাইসেন্সের বিপরীতে হাবিবের মাসিক আয় ৬০ হাজার টাকা।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন আলোকচিত্রী বলেন, আগে পর্যটকের ছবি তুলে প্রিন্ট করে দিলে প্রতি কপিতে ১৫ থেকে ২০ টাকা পাওয়া যেত। তখন প্রতিটি ছবিতে আয় হতো ৭ থেকে ১০ টাকা। তখন আলোকচিত্রী ছিলেন দুই শতাধিক। এখন প্রিন্ট ছবিতে আগ্রহ নেই পর্যটকের। তাঁরা ডিজিটাল ক্যামেরায় তোলা ছবি মেমোরি কার্ড কিংবা পেনড্রাইভে ঢুকিয়ে নেন। এ ক্ষেত্রে টাকা আদায় হয় ইচ্ছেমতো।

জেলা প্রশাসনের পর্যটন শাখার নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মাসুম বিল্লাহ প্রথম আলোকে বলেন, লাইসেন্স ভাড়া নিয়ে কারও ছবি তোলার সুযোগ নেই। তবে লাইসেন্সধারী ব্যক্তিদের কেউ অসুস্থ হলে তাঁর সন্তান কিংবা ভাইদের কেউ উপার্জনের জন্য ক্যামেরা নিয়ে সৈকতে নামার অভিযোগ আছে। এখন সে সুযোগও বন্ধ করা হচ্ছে। লাইসেন্সধারী ছয় শতাধিক ব্যক্তির পরিচয় শনাক্ত করে ছবিযুক্ত পরিচয়পত্র সরবরাহের পাশাপাশি ৫০ থেকে ৬০ জন করে আলোকচিত্রীদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন