ছেলে হারিয়ে দিশাহারা বাবা, বাবা হারিয়ে অনিশ্চিত দুই সন্তানের ভবিষ্যৎ

আবদুল আলিমছবি : সংগৃহীত

চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ডে জাহাজভাঙার কারখানায় ‘বিষাক্ত গ্যাসের’ প্রভাবে মৃত আবদুল আলিমের (৩৫) বাড়িতে এখন শুধুই শোকের ছায়া। ছেলেকে হারিয়ে দিশাহারা হয়ে পড়েছেন বাবা। আর বাবা হারিয়ে অসহায় হয়েছে দুই শিশুসন্তান। অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে তাদের ভবিষ্যৎ।

আবদুল আলিমের বাড়ি পাবনার সুজানগর উপজেলার আহম্মদপুর ইউনিয়নের সৈয়দপুর গ্রামে। বাবা মোহাম্মদ আলী কৃষিকাজ করেন। চার ভাইয়ের মধ্যে আলিম ছিলেন সবার বড়। তিনি সীতাকুণ্ডের ভাটিয়ারীর ফেরদৌস স্টিল শিপ রিসাইক্লিন ইন্ডাস্ট্রিজে নিরাপত্তা ও পরিবেশ সহকারী হিসেবে কর্মরত ছিলেন।

পরিবারের সদস্যরা জানান, আবদুল আলিম সহকর্মীদের বাঁচাতে ছুটে গিয়েছিলেন। এরপর নিজেই লাশ হয়ে ফিরেছেন। তিনি প্রায় ১৬ বছর আগে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে জাহাজভাঙার কাজ করার জন্য চট্টগ্রামে যান। পরে নিরাপত্তাবিষয়ক প্রশিক্ষণ নিয়ে নিরাপত্তা ও পরিবেশ সহকারী হিসেবে যোগ দেন। তাঁর স্ত্রী এবং ৬ বছর ও ৪ বছরের দুটি ছেলে আছে। স্ত্রী–সন্তানেরা গ্রামেই থাকে।

আজ রোববার সকালে গিয়ে দেখা যায়, সৈয়দপুর গ্রামের এক কোণে আবদুল আলিমের পৈতৃক বাড়ি। আধা পাকা ঘর ও টিনের ঘর নিয়ে বাড়িটি। পুরো বাড়ি সুনসান। ঘরের ভেতর নারীরা দোয়া পড়ছেন। বাইরে তেমন কেউ নেই।

আরও পড়ুন

কথা হয় আবদুল আলিমের বাবা মোহাম্মদ আলীর সঙ্গে। প্রত্যক্ষদর্শী সহকর্মীদের বরাত দিয়ে তিনি জানান, ঘটনার সময় সহকর্মীদের সাহায্যের জন্য চিৎকার শুনে আবদুল আলিম তাঁদের বাঁচাতে ছুটে যান। তিনি একজনকে উদ্ধারও করেন। পরে নিজেই বিষাক্ত গ্যাসে আক্রান্ত হয়ে মারা যান।

মোহাম্মদ আলীর অভিযোগ, কোম্পানির অবহেলার কারণেই তাঁর ছেলেসহ এতগুলো তাজা প্রাণ হারিয়েছে। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার হওয়া প্রয়োজন। কান্নাজড়িত কণ্ঠে তিনি বলেন, ‘আমার বেটা (ছেলে) পরিবারের প্রধান উপার্জনকারী ছিল। বেটার স্ত্রী ও দুইটা বেটা আছে। এহন কীভাবে এতগুলে মুখের আহার জুটপি, বুঝবের পারতেছিনে। চারদিক আন্ধার লাগতেছে।’

আরও পড়ুন
আবদুল আলিমের বাড়িতে সান্ত্বনা জানাতে এসেছেন প্রতিবেশী ও এলাকার লোকজন। আজ রোববার পাবনার সুজানগর উপজেলার আহম্মদপুর ইউনিয়নের সৈয়দপুর গ্রামে
ছবি : প্রথম আলো

সহকর্মী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাত দিয়ে আবদুল আলিমের চাচা মোজাম্মেল হোসেন বলেন, দুর্ঘটনাকবলিত ইয়ার্ডে পর্যাপ্ত নিরাপত্তার ব্যবস্থা ছিল না। গ্যাস নির্গমনের সময় যথাযথ উদ্ধার পরিকল্পনা ও দ্রুত সবাইকে হাসপাতালে পাঠানোর ব্যবস্থাও ছিল না। ঘটনাস্থল থেকে বের হওয়ার প্রধান ফটকটি ছিল তালাবদ্ধ। ফলে অকালেই এতগুলো প্রাণ ঝরে গেছে। ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের পরিবারের দায়িত্ব নেওয়া কোম্পানিটির ওপরই বর্তায়।

এদিকে গত শুক্রবারের ওই ঘটনার পর শনিবার সকাল ৬টার দিকে আবদুল আলিমের মরদেহ গ্রামের বাড়িতে পৌঁছায়। তাঁর লাশ একনজর দেখতে পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন ও গ্রামবাসী বাড়িটিতে ভিড় জমান। নেমে আসে শোকের ছায়া। গতকাল সকাল ১০টায় জানাজা শেষে গ্রামের কবরস্থানে তাঁর দাফন সম্পন্ন হয়।