নাটোরে পুলিশ কনস্টেবলের নৃশংসতায় শিশুর বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া আঙুল জোড়া লাগানো সম্ভব হচ্ছে না। সময়মতো বিচ্ছিন্ন আঙুলসহ হাসপাতালে না আসতে পারায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।
রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মুখপাত্র শেখ শামীম আহমেদ প্রথম আলোকে বলেন, শিশুটির বিচ্ছিন্ন আঙুল আর জোড়া দেওয়া সম্ভব হবে না। একটা নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আঙুলসহ হাসপাতালে পৌঁছাতে পারলে জোড়া দেওয়া সম্ভব হতো। বিচ্ছিন্ন আঙুলটি এখন শুধু আলামত হিসেবে জারের ভেতরে রেখে দেওয়া হয়েছে।
গত বৃহস্পতিবার দুপুরে নাটোর শহরের একটি এলাকায় সাত বছর বয়সী শিশুটির ডান হাতের একটি আঙুল কেটে বিচ্ছিন্ন করে ফেলেন শিশুদেরই বাড়ির ভাড়াটে এক পুলিশ কনস্টেবল। এ ঘটনায় মামলার পর গতকাল শুক্রবার পুলিশের ওই সদস্য ও তাঁর স্ত্রীকে গ্রেপ্তার করা হয়।
আমার ছেলেটাকে চিরতরে বিকলাঙ্গ করে দিল ভাই। আমার ছেলেটা এই হাত দিয়ে আর কোনো দিন কলম ধরতে পারবে না। এখন আসামির যদি ১০-১২ বার ফাঁসি হয়, সূর্য যদি পশ্চিম দিক থেকেও ওঠে, তবু আমার ক্ষতিপূরণ হবে না। এই দুঃখ আমি কোনো দিন ভুলতে পারব না।শিশুটির বাবা
আজ শনিবার দুপুরে হাসপাতালের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ৫ নম্বর বেডে গিয়ে দেখা যায় শিশুটি চিকিৎসাধীন। পাশে বিমর্ষ বসে আছেন তার মা। তাঁর সঙ্গে কথা বলতে চাইলে তিনি ছেলের হাতের দিকে তাকিয়ে আঁচল দিয়ে মুখ ঢাকলেন। কোনো কথা বলতে পারলেন না।
শিশুটির বাবা কাঁদতে কাঁদতে বলেন, ‘আমার ছেলেটাকে চিরতরে বিকলাঙ্গ করে দিল ভাই। আমার ছেলেটা এই হাত দিয়ে আর কোনো দিন কলম ধরতে পারবে না। এখন আসামির যদি ১০-১২ বার ফাঁসি হয়, সূর্য যদি পশ্চিম দিক থেকেও ওঠে, তবু আমার ক্ষতিপূরণ হবে না। এই দুঃখ আমি কোনো দিন ভুলতে পারব না।’
শিশুটির বাবা জনতা ব্যাংকের ঢাকার একটা শাখায় ব্যবস্থাপক হিসেবে কর্মরত আছেন। তাঁর স্ত্রী দুই সন্তানকে নিয়ে নাটোরের বাসায় থাকেন। সেখানে তিনি একটি বাড়ি করেছেন। বাড়িতে তিনটি ফ্ল্যাট রয়েছে। একটি ফ্ল্যাটে অভিযুক্ত পুলিশের কনস্টেবল পরিবার নিয়ে থাকেন।
শিশুটির মা-বাবা জানান, গত বুধবার রাতে বাড়িতে পারিবারিকভাবে পিকনিকের আয়োজন করা হয়। সেখানে ওই কনস্টেবলের চার বছর বয়সী মেয়ের সঙ্গে শিশুটির ধাক্কাধাক্কি হয়। পরে বিষয়টি পারিবারিকভাবে মীমাংসা করা হয়।
পরদিন বৃহস্পতিবার দায়িত্ব পালন শেষে ওই পুলিশ কনস্টেবল বাসায় ফিরে শিশুটিকে জোর করে তাঁর বাসায় নিয়ে যান বলে অভিযোগ। কিছুক্ষণ পর শিশুটি ডান হাতের একটি বিচ্ছিন্ন আঙুল নিয়ে কান্না করতে করতে নিজের বাড়িতে ফিরে আসে। শিশুটি তার মাকে জানায়, খাটের পায়ার ওপর হাত রেখে তরকারি কাটার হাঁসুয়া দিয়ে তার আঙুল কেটে দেওয়া হয়েছে। পরে শিশুটিকে নাটোর সদর হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাকে রাজশাহীতে পাঠানো হয়।
ঘটনার পর ফ্ল্যাটের চাবি নিয়েও অভিযুক্ত পুলিশ সদস্য গড়িমসি করেন বলে জানান শিশুটির বাবা। এ জন্য আঙুল উদ্ধার করা দেরি হয়েছে। তিনি বলেন, পুলিশের ওই সদস্যের কাছে চাবি থাকা সত্ত্বেও তাঁরা ঘর খোলার ব্যবস্থা করছিলেন না। যখন তালা ভাঙার প্রস্তুতি নেওয়া হয়, তখন ওই পুলিশ সদস্য স্বীকার করেন তাঁদের কাছে চাবি আছে। আগে ঘর খুলতে পারলে আঙুলটা ছয় ঘণ্টার মধ্যে হাসপাতালে পৌঁছানোর ব্যবস্থা করা যেত।
এদিকে পুলিশ কনস্টেবল থানায় অভিযোগ করেছেন, তাঁর মেয়েকে যৌন নিপীড়ন করেছে বাড়িওয়ালার ছেলে। তবে এ বিষয়ে তিনি থানায় কোনো অভিযোগ দেননি।
এ বিষয়ে নাটোর সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. মনসুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, সাত বছরের ছেলের পক্ষে যৌন নিপীড়ন করা সম্ভব নয়। এটা পুলিশ কনস্টেবল বলেছেন, তাঁরা শুনেছেন। এ বিষয়ে কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। ওই পুলিশ কনস্টেবল ও তাঁর স্ত্রীকে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।