ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে মেহেরপুরের দুটি আসনে তিনজন করে প্রার্থী টিকে রইল। প্রতিটি আসনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর পাশাপাশি জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রার্থীদের মনোনয়নপত্র বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে। জেলায় ভোটের রাজনীতিতে জাতীয় পার্টির খুব একটা প্রভাব না থাকায় বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যেই মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে বলে মনে করছেন ভোটাররা।
নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার আগে থেকেই প্রচার-প্রচারণা চালিয়ে আসছিলেন বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা। সভা-সমাবেশ, উঠান বৈঠক ও গণসংযোগে জমে ওঠে নির্বাচনী পরিবেশ। বিএনপির প্রার্থী ঘোষণাকে কেন্দ্র করে জেলায় বিক্ষোভ-অবরোধের ঘটনাও ঘটে। তফসিল ঘোষণার পর মনোনয়নপত্র যাচাই-বাছাই শেষে বর্তমানে চূড়ান্ত প্রচার-প্রচারণার প্রস্তুতি নিচ্ছেন প্রার্থীরা। মেহেরপুর-১ আসনে নয়জনের মধ্যে ছয়জনের মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা। মেহেরপুর-২ আসনে তিন প্রার্থীর মনোনয়নপত্রই বৈধ হয়েছে।
তফসিল অনুযায়ী রিটার্নিং কর্মকর্তার সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ইসিতে আপিল করা যাবে ৫ থেকে ৯ জানুয়ারি। ইসি আপিল নিষ্পত্তি করবে ১০ থেকে ১৮ জানুয়ারি। মনোনয়নপত্র প্রত্যাহারের শেষ তারিখ ২০ জানুয়ারি। ২১ জানুয়ারি প্রতীক বরাদ্দ শেষে নির্বাচনী প্রচারণা চলবে ২২ জানুয়ারি থেকে ১০ ফেব্রুয়ারি সকাল সাড়ে ৭টা পর্যন্ত।
মেহেরপুর-১ (সদর-মুজিবনগর)
আসনটিতে নয়জন মনোনয়নপত্র দাখিল করলেও যাচাই-বাছাই শেষে টিকে আছেন ছয়জন। সাবেক সংসদ সদস্য মাসুদ অরুণ আসনটিতে বিএনপির প্রার্থী হয়েছেন। তিনি বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির নির্বাহী সদস্য। জেলা বিএনপির বিগত কমিটির সভাপতিও ছিলেন। ২০০১ সালে তিনি প্রথমবারের মতো সংসদ সদস্য নির্বাচিত হন। জামায়াত এখানে প্রার্থী করেছে মো. তাজউদ্দীন খানকে। তিনি জেলা জামায়াতের আমির। এর বাইরে জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রার্থী জেলা সভাপতি আবদুল হামিদ দলীয় প্রার্থী হয়েছেন।
মেহেরপুর-১ আসনে বিএনপির তিন নেতা প্রার্থী হতে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন। তাঁরা হলেন জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক কামরুল হাসান, সাংগঠনিক সম্পাদক রোমানা আহমেদ ও মুজিবনগর উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিরুল ইসলাম। তবে বিএনপির প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করলেও দলীয় মনোনয়নের চিঠি না থাকায় যাচাই-বাছাইয়ে বাদ পড়েছেন তাঁরা। এর বাইরে এনসিপি থেকে মনোনয়ন দাখিল করেছিলেন ঢাকা মহানগর এনসিপির যুগ্ম সম্পাদক সোহেল রানা। যাচাই-বাছাইয়ে তিনিও বাদ পড়েছেন। স্বতন্ত্র প্রার্থী মাহাবুব রহমান এবং সিপিবির প্রার্থী মিজানুর রহমানেরও মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণা করেছেন রিটার্নিং কর্মকর্তা।
ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জাপার আবদুল হামিদ প্রার্থী হলেও তেমন কোনো প্রচার–প্রচারণা বা সভা–সমাবেশ হতে দেখা যায়নি। এ আসনে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীই শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচিত হচ্ছেন।
স্থানীয় পর্যায়ের নেতা-কর্মীদের ভাষ্য, সদর ও মুজিবনগর এলাকায় দুই দলেরই শক্ত সাংগঠনিক ভিত্তি রয়েছে। ফলে এখানে ভোটের ফলাফল নির্ধারিত হবে ভোটার উপস্থিতি ও শেষ মুহূর্তের প্রচারণার ওপর। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) ভোট টানতে পারার ওপরও নির্ভর করছে জয়-পরাজয়ের হিসাব-নিকাশ।
বিএনপির প্রার্থী মাসুদ অরুণ প্রথম আলোকে বলেন, ‘এ আসনের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত। সুষ্ঠু নির্বাচন হলে জনগণই তাদের রায় দেবে। আমি নির্বাচিত হলে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও এলাকার অবকাঠামোগত উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেব।’
জামায়াতের প্রার্থী তাজউদ্দীন খান বলেন, ‘মানুষ পরিবর্তন চায়। ন্যায়বিচার, সুশাসন ও ইসলামি মূল্যবোধের রাজনীতির পক্ষে মানুষ এখন ঐক্যবদ্ধ হচ্ছে। আমরা আশাবাদী, ভোটাররা আমাদের দিকেই তাকাবে।’
মেহেরপুর-২ (গাংনী)
বিএনপির দলীয় প্রার্থী ঘোষণার পর থেকেই আসনটিতে নির্বাচনী উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে। এখানে বিএনপির প্রার্থী মো. আমজাদ হোসেন। তিনি ২০০৮ সালের নির্বাচনে এ আসন থেকে সংসদ সদস্য হয়েছিলেন। মনোনয়নপত্র দাখিলের আগে জেলা বিএনপির সভাপতি জাভেদ মাসুদের সঙ্গে তাঁর বিরোধ তুঙ্গে ওঠে। তাঁদের কর্মী-সমর্থকেরা একে অপরের কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর চালান। আমজাদ হোসেনের মনোনয়ন বাতিলের দাবিতে টানা বিক্ষোভ-অবরোধ করেন জাভেদ মাসুদের অনুসারীরা। সর্বশেষ আমজাদ হোসেনকেই চূড়ান্ত মনোনয়ন দেয় বিএনপি।
জাভেদ মাসুদ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করলেও দাখিল করেননি। বর্তমানে তিনি নিশ্চুপ আছেন। শেষ পর্যন্ত কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে তিনি দলীয় প্রার্থীর পক্ষে নির্বাচনী মাঠে নামবেন কি না, তা নিয়ে এলাকায় নানা আলোচনা আছে।
বিএনপির প্রার্থী আমজাদ হোসেন বলেন, ‘গাংনীর মানুষ উন্নয়ন ও নিরাপত্তা চায়। আমি দীর্ঘদিন মানুষের পাশে ছিলাম। নির্বাচিত হলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও কৃষি খাতে বিশেষ গুরুত্ব দেব।’
আসনটিতে উপজেলা জামায়াতের আমির মো. নাজমুল হুদাকে প্রার্থী করেছে দল। তিনি বলেন, ‘এ আসনে সৎ ও যোগ্য নেতৃত্বের অভাব রয়েছে। আমরা দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি। ভোটাররা যদি স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারেন, তাহলে ফল আমাদের পক্ষে আসবে বলে বিশ্বাস করি।’
এ আসনে বিএনপি-জামায়াতের বাইরে জাপার মো. আবদুল বাকি নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। তবে জাপার প্রভাব এ এলাকায় খুব কম থাকায় তাঁকে নিয়ে তেমন আলোচনা শোনা যায়নি।