বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস আজ : দেরিতে রোগ শনাক্ত, অনেকে পঙ্গু হয়ে যাচ্ছেন
হাসপাতালে পাশাপাশি দুটি কক্ষে বেডে শুয়ে আছেন ৯ জন রোগী। একটি কক্ষে আছেন দুজন নারী। তাঁদের সবার পায়ে ব্যান্ডেজ। কারও পায়ে ক্ষত, কারও আঙুল কেটে ফেলা হয়েছে। কারও কোমর থেকে গোড়ালি পর্যন্ত অনুভূতি নেই, আবার কারও হাঁটু থেকে গোড়ালি পর্যন্ত অসাড়। সুস্থ হওয়ার তীব্র আকুতি নিয়ে দিনের পর দিন পড়ে থাকছেন হাসপাতালের বেডে।
তাঁরা সবাই কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত। দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলার রতনপুর এলাকায় ধানজুড়ি কুষ্ঠ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। কেউ আছেন সর্বনিম্ন তিন সপ্তাহ থেকে দুই মাস ধরে। আসা–যাওয়ার মধ্যে রয়েছেন কেউ কেউ। প্রত্যেকেই নিম্ন আয়ের মানুষ। তাঁদের মধ্যে একজনের পেশা ভিক্ষাবৃত্তি। কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হওয়ায় একদিকে পরিবার ও সমাজে নিগৃহীত হচ্ছেন, অন্যদিকে ক্রমে পঙ্গুত্বের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন।
রোগীদের একজন পার্বতীপুর উপজেলার বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম (৪৮)। গত মঙ্গলবার হাসপাতালে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তিনি জানালেন, ছয় বছর আগে হঠাৎ করে মুখমণ্ডল ও দুই পা অস্বাভাবিকভাবে ফুলতে শুরু করে। সেই সঙ্গে শরীরের বিভিন্ন জায়গায় গুটির মতো দেখা দেয় এবং লালচে হয়ে যায়। শুরুতেই রংপুরে একজন চিকিৎসকের পরামর্শ নেন। বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ওষুধ খান কিছু দিন। কোনো কিছুতে কাজ হচ্ছিল না। পরে দিনাজপুর সদর হাসপাতালে দেখান। ওষুধ খেয়ে শরীরের ফোলা কমে যায়। কিছুদিন আগে এক পা অনুভূতিহীন হতে শুরু করে। দুই পায়ের বুড়ো আঙুল ফেটে ঘা হয়। এ সময় একজন তাঁকে কুষ্ঠ নিরাময়কেন্দ্রে যাওয়ার পরামর্শ দেন। সেখানেই চিকিৎসক শফিকুলকে জানান তিনি কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত। বর্তমানে ধানজুড়ি কুষ্ঠ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন তিনি।
গত কয়েক দিনে কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত এমন ১৫ জনের সঙ্গে কথা হয়েছে প্রতিবেদকের। আক্রান্তদের প্রায় প্রত্যেকের গল্পগুলো একই রকম। প্রথমদিকে তাঁরা বুঝে উঠতে পারেননি। ধীরে ধীরে হাত-পা ফুলে যায়, শরীরে গুটির মতো দেখা দেয়। অনুভূতিহীন লালচে দাগ হয়। একসময় হাত-পা অনুভূতিহীন হয়, বাঁকা হয়ে যায়, ঘা দেখা দেয়। চিকিৎসার একপর্যায়ে ক্ষতস্থান কেটে ফেলতে বাধ্য হন।
রহমতুল্লাহ নামের একজন বলেন, ‘কয়েক বছর থেকে পা অবশ হয়ে আছে। গত শীতে আগুন পোহাতে গিয়ে পায়ে ফোসকা পড়ে। ঘা হয়ে গেছে টেরই পাইনি। এখন দুই পায়ে ঘা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে আছি।’
চিকিৎসকদের ভাষ্য, কুষ্ঠ জীবাণুঘটিত একটি মৃদু সংক্রামক রোগ। ‘মাইকো-ব্যাকটেরিয়াম লেপ্রি’ নামক জীবাণু দ্বারা এই রোগ ছড়ায়। সাধারণত শরীরে অনুভূতিহীন লালচে দাগ হয়, ঘাম হয় না, আক্রান্ত স্থানের লোম পড়ে যায়। শরীরে গুটি ওঠা, হাত-পা ফুলে যাওয়া, বেঁকে যাওয়া, ব্যথাহীন ঘা হওয়া, কানের লতি মোটা হওয়াই কুষ্ঠরোগের লক্ষণ। তবে অনেকের শরীরে সাদা দাগ হয়, এটা কুষ্ঠ নয়। এই রোগ হাঁচি–কাশির মাধ্যমে ছড়ায়।
একাধিক চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কুষ্ঠরোগের ক্ষেত্রে শুরুর দিকে চিকিৎসা শুরু করলে বিপদমুক্ত থাকা যায়। দেরি হলে হাত-পা অনুভূতিহীন হওয়া ও প্রতিবন্ধিতা দেখা দেয়। সাধারণত অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকা ও পুষ্টিহীনতার কারণে কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হয় মানুষ। এই রোগ সম্পর্কে গ্রামে কিছু কুসংস্কার প্রচলিত আছে। এ ক্ষেত্রে সচেতনতা সৃষ্টি করা জরুরি।
রোগীর ভরসা ধানজুড়ি কুষ্ঠ হাসপাতাল
দিনাজপুর জেলায় বর্তমানে সরকারি স্বাস্থ্যবিভাগের পাশাপাশি বেসরকারিভাবে কুষ্ঠরোগের একমাত্র চিকিৎসা কেন্দ্র ধানজুড়ি কুষ্ঠ হাসপাতাল। ১৯২৭ সালে তৎকালীন ইতালির নাগরিক ফাদার পেসকাতো নামের এক ব্যক্তি এই হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিলেন। মূলত মিশনারিরাই সারা দেশের ন্যায় দিনাজপুরেও এই রোগ শনাক্ত করা ও চিকিৎসা দিয়ে আসছিলেন। আক্রান্ত ব্যক্তি সুস্থ হবার পর পুনর্বাসনের জন্য আর্থিক প্রণোদনাও দেওয়া হতো তাঁদের।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, পরে ১৯৬৫ সালে তদানীন্তন সরকার সরকারিভাবে কুষ্ঠ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম শুরু করে। ১৯৮৫ সাল থেকে বাংলাদেশ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সুপারিশক্রমে ‘মাল্টি ড্রাগ থেরাপি’ পদ্ধতিতে কুষ্ঠরোগের চিকিৎসা শুরু করে। বর্তমানে ধানজুড়িসহ আরও কয়েকটি হাসপাতাল সরকারের স্বাস্থ্য বিভাগের সঙ্গে সমন্বয় করে কুষ্ঠ নিয়ন্ত্রণে কাজ করে যাচ্ছে।
ধানজুড়ি কুষ্ঠ হাসপাতালের পরিচালক আগাপিত টুডু বলেন, ‘হাসপাতালে বেশির ভাগ সময় ২০ জন পর্যন্ত রোগী ভর্তি থাকেন। উপযুক্ত পরিবেশও আছে। সরকার থেকে আমাদের শুধু ওষুধ সরবরাহ করা হয়। বিগত দিনে রোগীদের উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা গেছে। কিন্তু বর্তমানে দাতা সংস্থার অর্থায়ন কমে যাওয়ায় সঠিকভাবে চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। চিকিৎসক ও নার্সের ঘাটতি থেকে যাচ্ছে। তারপরও আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছি। কুষ্ঠরোগীদের প্রতি সরকারের আরও মনোযোগী হওয়া জরুরি।’
দিনাজপুরে ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৮ হাজার ৮৫৬ জন রোগী চর্মরোগসংক্রান্ত বিষয়ে চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন। তাঁদের মধ্যে ১ হাজার ৩৪০ জনের কুষ্ঠরোগ শনাক্ত করা হয়েছেন।
দিনাজপুর জেলা সিভিল সার্জন কার্যালয়ের যক্ষ্মা ও কুষ্ঠবিষয়ক প্রোগ্রাম অফিসার (ভারপ্রাপ্ত) জুলফিকার আলী জানান, জেলায় ২০২১ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত ৮ হাজার ৮৫৬ জন রোগী চর্মরোগসংক্রান্ত বিষয়ে চিকিৎসাসেবা নিতে আসেন। তাঁদের মধ্যে ১ হাজার ৩৪০ জনের কুষ্ঠরোগ শনাক্ত করা হয়েছেন। এর মধ্যে ৬৪০ জন পুরুষ ও ৭০০ জন নারী। আর ১৯৮৫ থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত হয়ে প্রতিবন্ধিতার শিকার হয়েছেন ৪ হাজার ৩৪৫ জন। সর্বশেষ ২০ জানুয়ারি পর্যন্ত জেলায় আক্রান্ত কুষ্ঠরোগী রয়েছেন ২৫০ জন।
কুষ্ঠ দিবসে নানা আয়োজন
সুইজারল্যান্ডভিত্তিক কুষ্ঠবিরোধী সংগঠনগুলোর আন্তর্জাতিক ফেডারেশন ‘আইলেপ’। আইলেপের প্রতিষ্ঠাতা রাউল ফোলেরো বিশ্বব্যাপী কুষ্ঠরোগবিষয়ক সচেতনতা বৃদ্ধিকল্পে ১৯৫৪ সাল থেকে বিশ্ব কুষ্ঠ দিবস পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছিলেন। প্রতিবছর জানুয়ারি মাসের শেষ রোববার দিবসটি পালন করা হয়। দিবসটির এবারের প্রতিপাদ্য ‘কুষ্ঠরোগ নিরাময়যোগ্য, সামাজিক কুসংস্কার প্রকৃত বাধা’।
দিবসটি উপলক্ষে দিনাজপুর জেলা সিভিল সার্জন অফিস সচেতনতামূলক শোভাযাত্রা ও আলোচনা সভার আয়োজন করেছে। এ বিষয়ে দিনাজপুর ডেপুটি সিভিল সার্জন শাহ মোহাম্মদ শরীফ বলেন, ‘কুষ্ঠরোগ নির্ণয়ে আমাদের স্বাস্থ্যকর্মীরা কাজ করছেন। পাশাপাশি বেসরকারি একটি প্রতিষ্ঠান আছে তারাও রোগী শনাক্তকরণের কাজটি করে আমাদের অবহিত করেন। আমরা নিয়মিত ওষুধ সরবরাহ করছি। আক্রান্ত ব্যক্তি ওষুধ সেবন শুরু করলে দুই সপ্তাহের মধ্যে নিরাপদ হয়ে ওঠে। প্রতিটি উপজেলায় ওই হাসপাতালের স্বাস্থ্যকর্মীদের সঙ্গে আমাদের স্বাস্থ্যকর্মীদের সমন্বয় হয়। ২০৩০ সালের মধ্যে সরকারিভাবে এই রোগ নির্মূলে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমরা সেই লক্ষ্যেই কাজ করছি।’