বারবার পাথর নিক্ষেপ
প্রচারণায় কাজ হয়নি, অপরাধী ধরতে কক্সবাজার রুটের ট্রেনে বসল সিসিটিভি ক্যামেরা
চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রেলপথে চলাচলরত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ বন্ধ হচ্ছে না। প্রতিনিয়ত যাত্রীবাহী ট্রেনের বগি লক্ষ্য করে বাইরে থেকে ছোড়া হয় পাথর ও ইটের টুকরা। এতে অনেক সময় যাত্রীরা আহত হন। রেলের বগির জানালা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
প্রচার-প্রচারণাসহ বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়েও ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ বন্ধ করা সম্ভব হয়নি। এখন পাথর নিক্ষেপের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করতে এবং তা বন্ধে যাত্রীবাহী ট্রেনে ক্লোজড সার্কিট (সিসিটিভি) ক্যামেরা বসিয়েছে রেলওয়ে। গতকাল শনিবার এই রুটে চলাচলরত বিরতিহীন পর্যটক এক্সপ্রেসের একটি বগির দুই পাশে দুটি সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়।
পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেনে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক মামুনুল ইসলাম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, কক্সবাজার রেললাইনের ট্রেনগুলোতে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটছে বারবার। পাথর নিক্ষেপের সঙ্গে জড়িতদের শনাক্ত করতে একটি ট্রেনে পরীক্ষামূলকভাবে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করা হয়েছে। কার্যকর সফলতা পাওয়া গেলে পর্যায়ক্রমে অন্যান্য ট্রেনেও সিসিটিভি ক্যামেরা বসানো হবে। যাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য তাঁরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
কক্সবাজার রুটে প্রতিদিন চার জোড়া ট্রেন চলাচল করে। এর মধ্যে চট্টগ্রাম থেকে দুই জোড়া ও ঢাকা থেকে দুই জোড়া চলাচল করে। প্রতিদিন ৮ থেকে ৯ হাজার যাত্রী যাতায়াত করেন। এসব ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের সঙ্গে জড়িতদের চিহ্নিত করে দিতে পারলে আর্থিক পুরস্কারের ঘোষণা করেছিল রেলওয়ে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত কাউকে শনাক্ত করা যায়নি বলে রেলওয়ে সূত্র জানায়।
রেলওয়ের কর্মকর্তারা জানান, ২০২৩ সালের ডিসেম্বর রেলের এই নতুন রেলপথ চালু হয়। আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রী পরিবহন শুরু হলে অল্প সময়ের মধ্যে এই রেলপথের ট্রেনগুলো নিয়ে যাত্রীদের ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। পর্যটন শহর কক্সবাজারে বেড়াতে এবং প্রয়োজনীয় কাজে বিপুলসংখ্যক মানুষ আসেন। নিরাপদ ও স্বস্তিতে যাতায়াতের জন্য ট্রেনকে প্রাধান্য দেন তাঁরা। কিন্তু যাত্রাপথে অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, গত দেড় বছরে ৫০ বারের বেশি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। এর বাইরেও পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে থাকে।
সর্বশেষ গতকাল শনিবার কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী পর্যটক এক্সপ্রেসে পাথর নিক্ষেপের ঘটনায় ট্রেনের যাত্রী এক সরকারি কর্মকর্তার ছেলে আহত হয়েছেন বলে রেলওয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান। একই দিন পাথরের আঘাতে একটি বগির কাচের জানালা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
এ ছাড়া গত ২২ আগস্ট চট্টগ্রামের লোহাগাড়ায় ঢাকাগামী কক্সবাজার এক্সপ্রেসে পাথর নিক্ষেপ করলে শাহীন আহমদ (৩৯) নামের এক যাত্রীর মাথা ফেটে যায়। তিনি ঢাকার উত্তরার বাসিন্দা। প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়ার পরেও তাঁর রক্ত বন্ধ হচ্ছিল না। ট্রেনের যাত্রী এক চিকিৎসক তাঁকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দেন। পরে মাঝপথে ট্রেন থামিয়ে তাঁকে বোয়ালখালীর একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। অথচ এই ট্রেন চট্টগ্রাম ছাড়া আর কোথাও থামে না।
চলতি বছরের ২৭ এপ্রিল কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী কক্সবাজার এক্সপ্রেস ট্রেন চকরিয়া এলাকায় পৌঁছালে বাইরে থেকে দুর্বৃত্তরা পাথর নিক্ষেপ করে। এতে ট্রেনে থাকা তিন যাত্রী আহত হন। তাঁদের মধ্যে হিমেল আহমেদ নামের এক যাত্রীর চারটি দাঁত ভেঙে যায়।
এ বছরের ১৭ জানুয়ারি বিকেলে ঢাকা থেকে কক্সবাজারগামী পর্যটক এক্সপ্রেস ট্রেনে বাইরে থেকে ছোড়া পাথরে আহত হয়েছে ৯ বছর বয়সী এক শিশু।
ট্রেনের যাত্রীদের পাথর ছুড়ে আহত করলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের বিধান আছে। রেলওয়ে আইন ১৮৯০-এর ১২৭ ধারায় বলা হয়েছিল, যাত্রীদের ক্ষতি হতে পারে জেনেও কেউ যদি পাথর ছোড়ে, তাহলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হবে বা সর্বনিম্ন ১০ বছরের জেল দেওয়া হবে। তবে আইনের প্রয়োগ খুব একটা নেই।
কক্সবাজার রেলস্টেশনের স্টেশনমাস্টার জয়নাল আবেদীন প্রথম আলোকে বলেন, যাত্রীবাহী ট্রেনে পাথর নিক্ষেপের কারণে অনেক সময় সাধারণ যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। নতুন এই রেললাইনের কক্সবাজারের রামু, ইসলামাবাদ, চকরিয়া ও হারবাং এলাকায় সবচেয়ে বেশি পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। বিশেষ করে দিনের বেলায় চলাচলরত ট্রেনগুলোতে পাথর নিক্ষেপের ঘটনা ঘটছে। ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ বন্ধে রেলস্টেশন ও রেললাইনের আশপাশ এলাকায় প্রচার-প্রচারণা চালানো হয় এবং মতবিনিময় সভা করা হয়। এরপরও পাথর নিক্ষেপ বন্ধ হচ্ছে না।
চট্টগ্রাম-দোহাজারী-কক্সবাজার রেলওয়ে যাত্রী কল্যাণ পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মোহাম্মদ আবু সাঈদ তালুকদার প্রথম আলোকে বলেন, দেশের সবচেয়ে বড় সমুদ্রসৈকত ও পর্যটন শহর কক্সবাজারে সড়কপথে যাতায়াত ভোগান্তির। ট্রেন চলাচল শুরু হওয়ায় মানুষ স্বস্তিতে কক্সবাজারে যাতায়াত করার সুযোগ পেয়েছেন। যাত্রীরা যাতে ট্রেনে যাতায়াতে নিরুৎসাহিত হন, সে জন্য একটি মহল হয়তো পাথর নিক্ষেপের মতো ঘটনায় ইন্ধন দিতে পারে। এর সঙ্গে স্থানীয় বখাটে, নেশাগ্রস্ত ও দুর্বৃত্তরা জড়িত। যাত্রীদের যাতায়াত নিরাপদ করতে তাঁদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।