প্রাধ্যক্ষের ‘বাসার কাজে রাজি না হওয়ায়’ হলের তিন কর্মচারীকে চাকরিচ্যুতির অভিযোগ

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ফাইল ছবি

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের ফজিলতুন্নেসা হলের প্রাধ্যক্ষের বাসায় কাজ করতে অস্বীকৃতি জানানোয় আবাসিক হলের তিন কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করার অভিযোগ উঠেছে। তাঁরা দেড় বছর ধরে হলে কর্মরত ছিলেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার এ বি এম আজিজুর রহমান চাকরিচ্যুত করার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, প্রাধ্যক্ষ নজরুল ইসলামের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে বাসায় কাজ করাতে চাপ দেওয়ার অভিযোগ সত্য নয় বলে দাবি করেছেন প্রাধ্যক্ষ।

চাকরিচ্যুত তিন কর্মচারী হলেন ফজিলতুন্নেসা হলের ডাইনিং অ্যাটেনডেন্ট মিরা রানী রায়, চম্পা ও পরিচ্ছন্নতাকর্মী মোছা. সোমা। গতকাল রোববার তাঁদের চাকরিচ্যুত করে নতুন করে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে সিতা রানী, রহিমা আক্তার ও সুমা বেগমকে।

ভুক্তভোগী কর্মচারীরা জানান, ২০২৩ সালে ওয়ার্ল্ড সিকিউরিটি সলিউশন নামের আউটসোর্সিং কোম্পানির মাধ্যমে তাঁরা হলে নিয়োগ পান। শুরুতে স্বাভাবিকভাবে কাজ চললেও প্রাধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম দায়িত্ব নেওয়ার পর তাঁদের হলের কাজের পাশাপাশি তাঁর বাসায় গিয়ে কাজ করতে বলা হয়। তাঁরা অস্বীকৃতি জানালে গত এপ্রিল মাসে তাঁদের চাকরিচ্যুত করার হুমকি দেওয়া হয়। সাংবাদিকদের মধ্যে বিষয়টি জানাজানি হওয়ার পর সাময়িক সমাধান হলেও গতকাল তাঁদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছে।

ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, তাঁদের বাদ দিয়ে প্রাধ্যক্ষের বাসায় আগে থেকে কর্মরত ব্যক্তিদের হলে কর্মচারী হিসেবে নতুন করে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। তাঁরা বলেন, তাঁদের যে পদে নিয়োগ হয়েছে, সে পদেই কাজ করবেন। হলের সব কাজ তাঁরা করতে রাজি। কিন্তু প্রাধ্যক্ষের বাসায় কেন কাজ করতে যাবেন? আজ হঠাৎ শোনেন, তাঁদের চাকরি নেই। এই চারকির ওপর সংসার চলে। তাঁরা এখন কীভাবে চলবেন? উপাচার্যের কার্যালয়ে এ বিষয়ে অভিযোগ দিয়েছেন বলে জানান তাঁরা।

ওয়ার্ল্ড সিকিউরিটি সলিউশনের পরিচালক (অপারেশন) মিনারুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রভোস্টের বাসায় কাজ করতে অস্বীকৃতি জানানোয় তাঁদের সরানো হয়েছে। হলের কর্মচারীরা প্রভোস্টের বাসায় কাজ করবেন কেন, সেটাও আমার প্রশ্ন।’

অভিযোগ অস্বীকার করে ফজিলতুন্নেসা হলের প্রাধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার হলে সুইপার সংকট ছিল। তাঁদের সুইপারের কাজ করতে বলা হলে তাঁরা অস্বীকৃতি জানান। তাই আউটসোর্সিং কোম্পানিকে জানানো হয়। তারা ওই তিনজনকে পরিবর্তন করে দিয়েছে। নতুন করে যাঁদের নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, ডাইনিংয়ে তাঁদের নিয়োগ হলেও সুইপারের কাজও করবেন।’

বাসায় কাজ করানোর অভিযোগের বিষয়ে প্রাধ্যক্ষ আরও বলেন, ‘আমার বাসায় আলাদা কর্মচারী রয়েছেন। তাঁদের দিয়েই কাজ করাই। নতুন যাঁরা নিয়োগ পেয়েছেন, তাঁরা আগে থেকেই হলে দৈনিক মজুরি ভিত্তিতে কাজ করতেন। এবার নিয়োগ পাওয়ায় তাঁরা সুইপারের কাজও করবেন, এতে হলের খরচও কমবে।’

প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদ

প্রথম আলো অনলাইনে প্রকাশিত এই প্রতিবেদনের প্রতিবাদ জানিয়েছেন ফজিলতুন্নেসা হলের প্রাধ্যক্ষ অধ্যাপক নজরুল ইসলাম।

মঙ্গলবার (৩০ সেপ্টেম্বর) পাঠানো প্রতিবাদপত্রে বলা হয়, প্রতিবেদনে তাঁকে জড়িয়ে যেসব তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণ বানোয়াট এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কোনো প্রাধ্যক্ষেরই কর্মচারীকে চাকরিচ্যুত করার ক্ষমতা নেই। আউটসোর্সিংয়ের কর্মচারীদের নিয়োগ, অব্যাহতি বা বদলির ক্ষমতা কেবল সংশ্লিষ্ট কোম্পানির। তিনি অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করার পর জানতে পারেন, হল থেকে একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী প্রাধ্যক্ষের বাসায় কাজ করে থাকেন। এই সূত্র ধরে হল সুপার হলের কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে দৈনিক মজুরিতে একজন পরিচ্ছন্নতাকর্মীকে বাসায় কাজের জন্য পাঠান। হলে যোগদানের পরপর আউটসোর্সিং এবং হলের কোনো কর্মচারীকেই তিনি চিনতেন না। সুতরাং কে বাসায় ক্লিনিং কাজে রাজি হলো বা না হলো, তার কোনোটাই তাঁর জানার কথা নয়।

প্রতিবাদপত্রে আরও বলা হয়, গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর দুজন হল সুপার প্রভোস্ট বরাবর একটি লিখিত চিঠির মাধ্যমে আউটসোর্সিংয়ে কর্মরত তিনজন কর্মচারীর বিরুদ্ধে ছাত্রীদের অভিযোগ, দায়িত্বে অবহেলা, ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ, গ্রুপিং তৈরি করে কর্মচারীদের মধ্যে বিশৃঙ্খলা তৈরি করা ইত্যাদি বিষয়ে অভিযোগ করে ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানান। এর পরিপ্রেক্ষিতে হলের সাধারণ সভায় বিষয়টি আলোচনা করলে সবাই একমত পোষণ করেন এবং বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে অবগত করার জন্য সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন।

বিষয়টি জানতে পেরে আউটসোর্সিং কোম্পানি তাদের কর্মচারীদের সতর্ক করে প্রথমে মৌখিকভাবে এবং পরবর্তীতে (১১ মার্চ ২০২৫) লিখিত নোটিশ প্রদান করেন। পাশাপাশি তাদের একবার সুযোগ দেওয়ার জন্য প্রশাসনকে অনুরোধ করেন। হল কর্তৃপক্ষও বিষয়টি মানবিকভাবে দেখে।

প্রতিবাদপত্রে আরও বলা হয়, ১০ তলা হলে মাত্র একজন স্থায়ী মহিলা সুইপার কর্মরত আছেন। আউটসোর্সিং এ অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে হলে ডাইনিং না থাকা সত্ত্বেও ডাইনিং কর্মচারীসহ ১৬ জন কর্মচারী নিয়োগ দিলেও কোনো সুইপার নিয়োগ দেননি। অধিকন্তু হলের টাকা দিয়ে দৈনিক মজুরিতে অতিরিক্ত আরও দুইজন ক্লিনার নিয়োগ দিয়ে যান পূর্ববর্তী প্রশাসন। একজন মাত্র সুইপার দিয়ে এত বড় হলের সব ওয়াশরুম পরিষ্কার করা সম্ভব না হওয়ায় ছাত্রীদের কাছ থেকে সর্বদা অভিযোগ আসতে থাকে। এ অবস্থায় হলে সিদ্ধান্ত নিয়ে আউটসোর্সিং কোম্পানিকে অনুরোধ করা হয়, তাদের কিছু কর্মচারীকে সুইপিংয়ের কাজে নিয়োজিত করতে। গত ২৮ সেপ্টেম্বর কোম্পানি কর্তৃক জানতে পারেন যে হলে কর্মরত দৈনিক মজুরির দুজনসহ তিনজনকে ক্লিনিংয়ের কাজে নিয়োজিত করা হয়েছে এবং অভিযুক্ত তিনজনকে তাঁদের অন্য একটি প্রকল্পে বদলি করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।