প্রধানমন্ত্রী আসবেন, তাই সড়ক সংস্কারে তোড়জোড়

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান আগামী রোববার কিশোরগঞ্জ সফরে আসছেন। এ উপলক্ষে ইটাখোলা-মঠখোলা-কটিয়াদী আঞ্চলিক মহাসড়কের সংস্কারে চলছে তোড়জোর। গতকাল বুধবার সকালে কটিয়াদীর ভোগপাড়া এলাকায়ছবি: প্রথম আলো

বুধবার সকাল পৌনে ৯টা। কিশোরগঞ্জের কটিয়াদীর ভোগপাড়া মোড়ে জনা সাতেক শ্রমিককে সড়ক সংস্কারে তুমুল ব্যস্ত দেখা যায়। তড়িঘড়ি ঢালা হচ্ছে ইটের খোয়া। তার ওপর দেওয়া হচ্ছে বালুর প্রলেপ। আগামী রোববার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের কিশোরগঞ্জ সফর উপলক্ষে চলছে সড়ক সংস্কারের এই তোড়জোড়। পাশেই দাঁড়িয়ে কাজের তদারকি করছিলেন ঠিকাদারের প্রতিনিধি রতন মিয়া। এত বড় বড় গর্তে এভাবে জোড়াতালি দিলে রাস্তা টিকবে তো? এমন প্রশ্নে রতন মিয়ার চটজলদি উত্তর, ‘আগে প্রধানমন্ত্রী যাক, পরে ভালো-মন্দ বোঝা যাবে।’

স্থানীয় বিএনপি সূত্রে জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী সফরে কিশোরগঞ্জ সদরের পাশাপাশি কটিয়াদী ও পাকুন্দিয়া উপজেলায় দুটি কর্মসূচিতে তিনি অংশ নেবেন।

এ তথ্য জানিয়ে কিশোরগঞ্জ-২ (কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া) আসনের সংসদ সদস্য মো. জালাল উদ্দীন প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর আগমন উপলক্ষে সব ধরনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। সড়কটির সংস্কারকাজও দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলছে।’

অত দিন খবর নাই, এহন দেখি ঘুম নাই। দিনেও কাজ করে, রাতেও কাজ করে। রাস্তার পাশে বড় বড় যন্ত্র। প্রথমে এত তড়িঘড়ির কারণ বুঝি নাই। পরে বুঝলাম, প্রধানমন্ত্রী আইব।
আবুল কাইয়ুম, বাসচালক

প্রধানমন্ত্রীর আগমন ঘিরেই হঠাৎ চলছে ইটাখোলা-মঠখোলা–কটিয়াদী আঞ্চলিক মহাসড়কের সংস্কারকাজ। সড়কটির কটিয়াদী থেকে পাকুন্দিয়ার বটতলা অংশের অবস্থা দীর্ঘদিন ধরে বেহাল। ওই অংশের মেরামতের কাজ চলছে দিনে–রাতে। তবে এ কাজ নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ও যানবাহনের চালকদের মনে কোনো আস্থা নেই। তাঁদের মতে, এই সংস্কার কেবলই এক দিনের জন্য। দীর্ঘদিনের বেহাল সড়কে দেওয়া হচ্ছে কেবল সংস্কারের ছিটা।

ইটাখোলা-মঠখোলা-কটিয়াদী আঞ্চলিক মহাসড়কের অবস্থা দীর্ঘদিন ধরে নাজেহাল
ছবি: প্রথম আলো

১২ কিলোমিটারে তিন জায়গায় কাজ

বুধবার কটিয়াদী থেকে পাকুন্দিয়ার বটতলা বাজার পর্যন্ত প্রায় ১২ কিলোমিটার সড়ক ঘুরে দেখা গেছে, স্থানে স্থানে ছোট-বড় অসংখ্য গর্ত। কোথাও জমে আছে বৃষ্টির পানি। এর মধ্যেই ১০ থেকে ১২ জনের দল বেঁধে শ্রমিকেরা কাজ করছেন। কোথাও গর্তে দেওয়া হচ্ছে কেবল ইট আর বালু। কোথাওবা পিচের হালকা ছিটা। বৃষ্টির পানিতে বালুর প্রলেপ দেওয়া অংশগুলো আরও বিপজ্জনক ও পিচ্ছিল হয়ে উঠেছে। অন্তত তিনটি স্থানে এমন সংস্কারকাজ চলতে দেখা যায়।

ভোগপাড়ার কাছেই একটি হেলিপ্যাড। সকাল ৯টা ১১ মিনিটে সেখানে গিয়ে দেখা যায়, সড়কের পাশাপাশি হেলিপ্যাডেও সংস্কারকাজ চলছে। সেখানে নয়জন শ্রমিক কাজ করছিলেন। শ্রমিকদের দলনেতা ফুল চান বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী রাস্তা দিয়াও আইতে পারে, আবার হেলিকাপ্টারেও আইতে পারে। এই কারণে দুই দিক ঠিক রাখতে আমরা কাজ করতাছি।’

সড়কের শিমুলকান্দী অংশে গিয়ে দেখা যায়, বড় বড় গর্ত। কোনো কোনো গর্ত দেখতে অনেকটা চুল্লির মতো। বাস ও ট্রাকগুলো গর্তের ওপর দিয়ে ধীরগতিতে চলছে। ছোট যানবাহনগুলো গর্ত এড়িয়ে কখনো ডানে, কখনো বাঁয়ে গিয়ে সড়ক পার হচ্ছে।

সেখানে কথা হয় জলসিঁড়ি পরিবহনের বাসচালক আবুল কাইয়ুমের সঙ্গে। তিনি অন্তত দুই দশক ধরে এই সড়কে বাস চালাচ্ছেন। কাইয়ুম বলেন, ‘অত দিন খবর নাই, এহন দেখি ঘুম নাই। দিনেও কাজ করে, রাতেও কাজ করে। রাস্তার পাশে বড় বড় যন্ত্র। প্রথমে এত তড়িঘড়ির কারণ বুঝি নাই। পরে বুঝলাম, প্রধানমন্ত্রী আইব।’

মহাসড়কটির পাশে হেলিপ্যাডেও সংস্কার কাজ চলছে। কটিয়াদীর ভোগপাড়ায়
ছবি: প্রথম আলো

ফুটো হয়ে যাওয়া সড়কে সংস্কারের ছিটা

সড়কের পাকুন্দিয়া উপজেলার মধ্যমান্দারকান্দী এলাকায় দেখা যায়, কয়েকটি গর্ত পিচ দিয়ে ভরাট করা হয়েছে। সেখানে কথা হয় ব্যাটারিচালিত রিকশাচালক লিয়াকত আলীর সঙ্গে। তিনি পাশের পুটিয়া গ্রামের বাসিন্দা। সংস্কারকাজ দেখিয়ে হাসতে হাসতে লিয়াকত বলেন, ‘পুরো সড়ক ফুটো হয়ে গেছে। যে কাজ দেখতাসি, তা সংস্কারের ছিডাও না। এই ছিডা দিয়া ১৬ তারিখ পর্যন্ত চলব। এরপর কী হইব, আল্লাহ জানেন।’

মধ্যমান্দারকান্দীর মা-বাবা ভ্যারাইটিজ স্টোরে অন্তত ১০ জন স্থানীয় লোক বসে ছিলেন। তাঁদের কয়েকজনের সঙ্গে সড়কটির সংস্কারকাজ নিয়ে কথা হয়। তাঁদের কেউই কাজের ধরন নিয়ে সন্তুষ্ট নন। মধ্যবয়সী রুস্তম মিয়া বলেন, ‘ভেকু দিয়া খামছাইতাছে, রোলার দিয়া ঢলা দিতাছে। প্রধানমন্ত্রী যাওয়ার পর হাত দিয়া খামছা দিলেই শেষ।’

সড়কের মেরাতলা অংশে কয়েকজন শ্রমিককে গর্ত বন্ধের প্রস্তুতি নিতে দেখা যায়। শ্রমিকদের দলনেতা মনসুর মিয়া জানান, পাথরের গুঁড়া ও বিটুমিন দিয়ে গর্ত বন্ধ করা হবে।’ কাজটি টেকসই হবে কি না, জানতে চাইলে মনসুর মিয়া বলেন, ‘হওয়ার তো কথা, তবে বৃষ্টি আইলে সমস্যা।’

মধ্য মেরাতলার দোকানি আবদুল আমিন মুন্সি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী না আইলে বালু দিয়াও গাতা ভরতে অনেক সময় নিত।’

আঞ্চলিক মহাসড়কের কটিয়াদী–মঠখোলা অংশে বেহাল দশার কারণে যানবাহন চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে
ছবি: প্রথম আলো

সাড়ে ১২ কিলোমিটার সংস্কারে খরচ ১৬ কোটি

ভৈরব সড়ক উপবিভাগ সূত্র জানায়, ইটাখোলা-মঠখোলা-কটিয়াদী সড়কের দৈর্ঘ্য ৪৫ দশমিক ১১ কিলোমিটার। সড়কটির অবস্থান নরসিংদী ও কিশোরগঞ্জ জেলায়। এটি আঞ্চলিক মহাসড়ক। এর মধ্যে কিশোরগঞ্জ অংশ ১২ কিলোমিটার। এই অংশ বেহাল দীর্ঘদিন ধরে।

সড়কটি ব্যবহার করে ভৈরব এড়িয়ে নরসিংদীর ইটাখোলা হয়ে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ওঠা যায়। এতে কটিয়াদী, পাকুন্দিয়া, কিশোরগঞ্জ সদর এবং নরসিংদীর মনোহরদী, শিবপুরসহ আশপাশের এলাকার মানুষের ঢাকা যাতায়াতে প্রায় ১৩ কিলোমিটার দূরত্ব কমে। এ ছাড়া গাজীপুরের কাপাসিয়া হয়েও দ্রুত রাজধানীতে যাওয়া যায়।

সওজের বিবেচনায়, সড়কটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কিন্তু সরু পেভমেন্ট (যানবাহন চলাচলের পাকা অংশ) ও বিভিন্ন স্থানের ক্ষতিগ্রস্ত দ্রুত মেরামত করা না যাওয়ায় সড়কের চেহেরা বেহাল। সড়কটির কটিয়াদী অংশের প্রায় সাড়ে ১২ কিলোমিটার মেরামতের জন্য মেসার্স দাস ট্রেডার্সকে কার্যাদেশ দেওয়া হয়েছে। ২ এপ্রিল প্রতিষ্ঠানটি ১৬ কোটি ৯১ লাখ ২৩ হাজার ১১৪ টাকার কার্যাদেশ পায়।

প্রতিষ্ঠানটির প্রকল্প ব্যবস্থাপক অরবিন্দ কুমার দাস বলেন, মেরামতকাজ আগে থেকেই শুরু হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর কথা বিবেচনায় রেখে কাজে গতি বাড়ানো হয়েছে। কাজের বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, শুধু বালু ও খোয়া দিয়ে গর্ত ভরাট করা হচ্ছে না। কার্পেটিংও করা হচ্ছে। বেতাল বাজারে এরই মধ্যে ৩৬০ মিটার আরসিসি সড়ক করা হয়েছে।

সড়কটির কটিয়াদী অংশের ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব সওজের ভৈরব সড়ক উপবিভাগের। ওই কার্যালয়ের উপসহকারী প্রকৌশলী ফরিদুল ইসলাম বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরের জন্য জরুরি ভিত্তিতে মেরামতকাজ করা হচ্ছে। তবে এই সড়কে মেরামতকাজ অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছে।