পাগল হাসানের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী: গানে-কথায়-সুরে বেঁচে আছেন প্রিয়জনদের অন্তরে
‘পাগল হাসান বেশি মিশতেন সাধারণ মানুষের সঙ্গে। এই মানুষেরাই তাঁর গান আর গানের জন্যই তাঁকে মনে রেখেছেন। সংগীতশিল্পী পাগল হাসান তাঁদের অন্তরে আছেন এবং থাকবেন।’ সুনামগঞ্জের তরুণ সংগীতশিল্পী, গীতিকার ও সুরকার মতিউর রহমান হাসান ওরফে পাগল হাসান সম্পর্কে এভাবে বলছিলেন সংস্কৃতিকর্মী দেওয়ান গিয়াস চৌধুরী।
আজ পাগল হাসানের মৃত্যুর দুই বছর পূর্ণ হলো। ২০২৪ সালের ১৮ এপ্রিল সকালে সুনামগঞ্জের ছাতক উপজেলার সুরমা সেতু এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় তিনি মারা যান। দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আজ শনিবার সন্ধ্যায় জেলা শিল্পকলা একাডেমিতে স্মরণানুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে।
পাগল হাসান নেই, কিন্তু তাঁর গান, কথা ও সুর এখনো বেঁচে আছে। ‘জীবন খাতায় প্রেমকলঙ্কের দাগ দাগাইয়া/ ছাড়িয়া যাইওনারে বন্ধু মায়া লাগাইয়া...’ —এমন গানের পঙ্ক্তিতে তাঁকে আগলে রেখেছেন শ্রোতা, শিল্পী, বন্ধু ও অনুরাগীরা।
জেলা শিল্পকলা একাডেমি চত্বরে পাগল হাসান নামে একটি উন্মুক্ত মঞ্চের নামকরণ করা হয়েছে, সেটি ‘পাগল হাসান কুঞ্জ’। জেলা সাংস্কৃতিক কর্মকর্তা আহমেদ মঞ্জুরুল হক চৌধুরী জানান, এখানেই তাঁকে স্মরণ করা হবে। এ ছাড়া শহরের সাংস্কৃতিক সংগঠন স্পন্দনের বর্ষবরণ আয়োজন ‘বৈশাখী স্পন্দন’ও তাঁকে উৎসর্গ করা হয়েছে।
মাত্র ৩৩ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে পাগল হাসান লিখেছেন অসংখ্য মরমি গান। নিজেই সুর করে গেয়েছেন সেগুলো। তাঁর গানে ছিল মায়া, বেদনা আর আধ্যাত্মিকতার মিশেল। গায়কিতেও ছিল স্বাতন্ত্র্য—যেন অন্তর্গত দুঃখ সুর হয়ে ঝরে পড়ত। ২০১১ সালে সুনামগঞ্জ শহরের বাসিন্দা লুৎফা বেগমকে বিয়ে করেছিলেন হাসান। তাঁদের সংসারে দুই ছেলে আছে।
ছাতক উপজেলার শিমুলতলা গ্রামের কৃষক দিলোয়ার হোসেন (দিলশাদ) ও আমিনা বেগমের সন্তান পাগল হাসান। শৈশবেই বাবাকে হারিয়ে দারিদ্র্যের সঙ্গে লড়াই করে বড় হয়েছেন। টানাপোড়েনের মধ্যে পড়াশোনার পাশাপাশি নানা কাজ করেছেন। পরে একটি সরকারি টেকনিক্যাল স্কুলে অফিস সহায়ক হিসেবে চাকরি নেন। তবে গানের প্রতি টান তাঁকে টেনে নেয় সাংস্কৃতিক অঙ্গনে।
পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনদের ভাষ্য, জীবনের কষ্ট তাঁর গানেই প্রতিফলিত হয়েছে। নিজেই বলতেন, গান লিখতে হলে ‘বুকভরা দুঃখ’ দরকার। সেই দুঃখই তাঁর সৃষ্টির মূল সুর হয়ে উঠেছিল। সহজিয়া জীবন ছিল তাঁর। ভেতরে দুঃখ চেপে বাইরে লাজুক হাসিতে সবাইকে ভুলিয়ে রাখতেন।
সুনামগঞ্জ শহরে সংগীতশিল্পী ও প্রশিক্ষক দেবদাস চৌধুরীর সংস্পর্শে এসে পাগল হাসানের গানের পথচলা নতুন গতি পায়। স্পন্দন সংগীত বিদ্যালয়ে যুক্ত হয়ে নিজের লেখা গান গেয়ে ধীরে ধীরে পরিচিতি পান। একসময় চাকরি ছেড়ে পুরোপুরি সংগীতে মনোনিবেশ করেন। ‘পাগল এক্সপ্রেস’ নামে একটি দল গড়ে তোলেন। তাঁর লেখা গানের সংখ্যা প্রায় এক হাজার বলে জানিয়েছেন স্বজনেরা।
পাগল হাসানের জনপ্রিয় গানের মধ্যে আছে- ‘আসমানে যাইওনারে বন্ধু ধরতে পারব না...’, ‘জীবন খাতায় প্রেমকলঙ্কের দাগ দাগাইয়া...’, ‘দুই দিনের সংসারী আর মিছা দুনিয়াদারি...’, ‘কইরো ঘৃণা যায়–আসে না...’, ‘জানতাম যদি তোমার পিরিত কচুপাতার পানি...’–সহ আরও অসংখ্য গান।
দেশের জনপ্রিয় সংগীতশিল্পী আসিফ আকবরের সঙ্গে পাগল হাসানের ঘনিষ্ঠতা ছিল। তাঁর মৃত্যুর পর আসিফ আকবর লিখেছিলেন, ‘তরুণ এই শিল্পী গীতিকার, সুরকার ও গায়ক হিসেবে ছিল অমিত প্রতিভার অধিকারী।’
বন্ধুরা জানান, গান করে পাগল হাসান যা আয় করতেন, তার বড় অংশই বিলিয়ে দিতেন অন্যদের মধ্যে। তাই হয়তো তাঁর মৃত্যুর পর অনেকেই নতুন করে তাঁকে চিনেছেন, তাঁর জন্য কেঁদেছেন। এখনো সুনামগঞ্জের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তাঁকে স্মরণ করে নিয়মিত আড্ডা ও সংগীতানুষ্ঠানের আয়োজন করেন তাঁর বন্ধুরা—সোহেল রানা, দেওয়ান গিয়াস চৌধুরী, রিপন চন্দ, সামির পল্লব, মেহেদী হাসান, কানু চন্দ, আতাব রহমান, সুসেন চন্দসহ অনেকে।
এ কথা হয়তো অনেক আগেই উপলব্ধি করেছিলেন পাগল হাসান। তাই গেয়েছেন, ‘মানুষ মইরা গেলে কদর বাইড়া যায়/ বাঁইচা থাকতে নিকৃষ্ট কয়/ মরলে শ্রেষ্ট পদক পায়...!’