মানবিক এই কাজের সঙ্গে কীভাবে যুক্ত হলেন জানতে চাইলে হারুন অর রশিদ জানালেন, গত বছর আগস্ট মাসের এক দিন দুপুরে তাঁর কাছে এক বৃদ্ধ ভাত চেয়ে বলেছিলেন, ‘তিন-চার বাড়িতে গিয়েছি, কেউ ভাত তো দূরের কথা, বাড়ির দরজাটা পর্যন্ত খোলেনি।’ ওই বৃদ্ধের মুখ থেকে ওই কথা শোনার পর দুঃখে ভরে যায় তাঁর মন। এরপর তাঁদের মুখে খাবার তুলে দেওয়ার চিন্তা করতে থাকেন তিনি। ওই চিন্তা থেকেই গত বছরের ৩ সেপ্টেম্বর দুপুরে প্রথম দরিদ্রদের খাবার ব্যবস্থা করেন। বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার ফুলতলা গ্রামের মাছ বাজারের কাছে চালু করা হয় এই মেহমানখানা।

হারুন অর রশিদ বলেন, প্রতি শুক্রবার জুমার নামাজের পর এখানে খাবার খাওয়ানো হয়। প্রথম দিন ২০ থেকে ২৫ জন ভিক্ষুক ও প্রতিবন্ধীকে খাওয়ানো হয়। দ্বিতীয় সপ্তাহে লোকজন আরও বাড়তে থাকে। এভাবে অসহায়দের সংখ্যা ১২০, ১৫০ থেকে ২০০–তে দাঁড়ায়। ২৯ জুলাই এই কার্যক্রম ৪৪ সপ্তাহ অতিক্রম করে। ওইদিন ২৪০ জনকে খাওয়ানো হয়। তিনি তিন সপ্তাহ খাওয়ানোর পর ২৫ জন নানাভাবে এই কাজের সঙ্গে যুক্ত হন। এর মধ্যে কেউ নগদ অর্থ সহায়তা করেছেন। কেউ কেউ গ্লাস, থালা ও চেয়ার দিয়ে সহায়তা করেছেন।

মেহমানখানায় অনুদান হিসেবে ৫০টি গ্লাস দিয়েছেন বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক মাসুদ রানা। তিনি বললেন, ‘এটি একটি ব্যতিক্রমী উদ্যোগ। এমন উদ্যোগ আরও বিস্তৃত হলে এলাকার অসহায় মানুষের কষ্ট কমবে।’

এই উদ্যোগের সঙ্গে দীর্ঘদিন ধরে যুক্ত ফজলুর রহমান। তিনি বলেন, ‘মেহমানখানার উদ্যোগে অংশীদার হতে পেরে ভালো লাগছে। আমি শুরু থেকেই এই আয়োজনের সঙ্গে আছি। এই উদ্যোগে যুক্ত সবাই স্বেচ্ছাশ্রম ও আর্থিক সহায়তা দিচ্ছেন।’

বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার জিয়াখোর গ্রামের মনসুর আলী শুরু থেকেই এখানে রান্নার কাজ করছেন। অন্য সব অনুষ্ঠানে রান্না করতে তিনি পারিশ্রমিক নেন, কিন্তু এখানে রান্নার জন্য পারিশ্রমিক নেন না। তিনি বলেন, আট বছর ধরে বাবুর্চির কাজ করছি। মেহমানখানার রান্নার কাজ করতে গিয়ে যে তৃপ্তি মিলছে, তা অন্য কোথাও মেলে না।

২৪ জুন দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে ওই মেহমানখানায় গিয়ে দেখা যায়, পাঁচ-ছয়জন তরুণ-যুবক চেয়ার ও টেবিল সাজাচ্ছেন। পাশেই চলছে রান্নার আয়োজন। রান্নার কাজে ব্যস্ততার ফাঁকে ফাঁকে ফুলতলা গ্রামের আক্তারুল ইসলাম জানালেন, এখন কথা বলার সময় নেই। জুমার নামাজ শেষে মেহমানরা চলে আসবেন। আর এলেই তাঁদের প্লেটে খাবার তুলে দিতে হবে।

বেলা পৌনে দুইটায় মেহমানখানায় এক এক করে আসতে শুরু করেন দুস্থ নারী-পুরুষ ও শিশুরা। এরপর তাঁরা বসে পড়েন নির্দিষ্ট আসনে। আর স্বেচ্ছাসেবকের দায়িত্বে থাকা লোকজন তাঁদের খাবার পরিবেশন করতে থাকেন।

মেহমানখানায় আসা গৃহবধূ আকলিমা বেগম জানালেন, শুরু থেকেই এখানে খাচ্ছেন। কোনো দিন ভাত, সবজি, ডালের সঙ্গে মাছ; কোনো দিন ব্রয়লার মুরগির মাংস, আবার কোনো দিন ডিম দেওয়া হচ্ছে। খোরশেদ আলী বলেন, ‘এখানে খাইতে আসে খারাপ লাগে না। সবাই আদর করে খাওয়ায়।’

কত দিন এ কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে—জানতে চাইলে হারুন অর রশিদ বলেন, একটি উদ্যোগ যখন সর্বজনীন হয়ে ওঠে, তখন এটা থেমে যাওয়ার ভয় থাকে না।

বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. যোবায়ের হোসেন সম্প্রতি মেহমানখানা পরিদর্শন করেন। তিনি এই উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে বলেন, ‘এটি একটি প্রশংসনীয় উদ্যোগ। আমরা এই কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে সহায়তা করব।’

জেলা থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন