‘বাংলাদেশ যদি থাকে, তবে একাত্তর চিরদিন মাথা উঁচু করে থাকবে’

কুষ্টিয়ায় বন্ধুসভার মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াডে বিজয়ীদের সঙ্গে অতিথিরা। আজ বেলা ১১টার পর শহরের হাউজিং এলাকায় এডুকেয়ার আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের মিলনায়তনেছবি: প্রথম আলো

মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, তাৎপর্য ও মূল্যবোধ নতুন প্রজন্মের মাঝে ছড়িয়ে দিতে কুষ্টিয়ায় অনুষ্ঠিত হয়েছে বন্ধুসভা মুক্তিযুদ্ধ অলিম্পিয়াড ২০২৬। আজ শনিবার বেলা ১১টায় শহরের হাউজিং এলাকায় এডুকেয়ার আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের মিলনায়তনে এর আয়োজন করে কুষ্টিয়া বন্ধুসভা। এতে জেলা শহরের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অন্তত ৮০ জন শিক্ষার্থী অংশ নেয়।

অলিম্পিয়াডে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক ৩০টি বহুনির্বাচনী প্রশ্ন নিয়ে কুইজ প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। নির্ধারিত ২০ মিনিটের এ পরীক্ষা শেষে কুষ্টিয়া সরকারি মহিলা কলেজের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক কবিরুল ইসলাম, দর্শন বিভাগের প্রভাষক আশরাফ আলী এবং এডুকেয়ার আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষক ফয়জুর রহমান উত্তরপত্র মূল্যায়ন করেন।

ফলাফল ঘোষণার আগে মহান মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচারণা করেন কুষ্টিয়া মুক্তিযোদ্ধা সংসদের সাবেক কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা রফিকুল আলম। তিনি বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধে ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণ নিয়ে দেশে আসি। হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না, কিন্তু মনে ছিল সাহস। সেই সাহস নিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর অস্ত্রের মুখে মোকাবিলা করেছি। পরে অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ করেছি। চোখের সামনে বন্ধু ও অনুজদের বুকে রক্ত ঝরতে দেখেছি।’

স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে আপ্লুত হয়ে এই মুক্তিযোদ্ধা শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ‘একসঙ্গে আটজনকে শহীদ হতে দেখেছি। সেই স্মৃতি আজও ভুলতে পারি না। জীবন দিয়ে এই স্বাধীনতা অর্জন করতে হয়েছে। স্বাধীনতা রক্ষা করতে তোমাদেরও জীবন দিতে হতে পারে—এ জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। লাল-সবুজের পতাকা ধরে রাখতে হবে। স্বপ্ন না, কল্পনা না—৭১-ই বাংলাদেশ। বাংলাদেশ যদি থাকে, তবে ৭১ চিরদিন মাথা উঁচু করে থাকবে।’

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক অধ্যাপক সরওয়ার মুর্শেদ রতন বলেন, ‘যে প্রশ্ন করে না, স্বপ্ন দেখে না, সে মৃত মানুষ। তোমরা স্বপ্ন দেখবে, প্রশ্ন করবে। দেশকে ভালোবাসবে, সত্যকে ভালোবাসবে।’

আয়োজনটির প্রশংসা করে সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) সভাপতি আসমা আনসারী বলেন, ‘বর্তমান সময়ে এটি প্রথম আলোর একটি সাহসী উদ্যোগ। এখন তো মুক্তিযুদ্ধ শব্দ বলতেও ভয় করে! সেখানে এমন একটি আয়োজন সত্যিই প্রশংসনীয়।’

মুক্তিযুদ্ধে শহীদ পরিবারের সদস্য ও কুষ্টিয়া সিটি কলেজের সাবেক সহকারী অধ্যাপক ওবাইদুর রহমান বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বয়স ছিল ছয় বছর। তখন আমার বাবাকে হত্যা করা হয়েছিল। আমার পরিবারের আরও কয়েকজন শহীদ হয়েছেন।’

প্রথম আলো কুষ্টিয়া বন্ধুসভার সাধারণ সম্পাদক শিহাব উদ্দিন হৃদয়ের স্বাগত বক্তব্যের মাধ্যমে শুরু হওয়া আলোচনা সভায় আরও বক্তব্য দেন এডুকেয়ার আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ক্যাপ্টেন নজরুল ইসলাম, উপাধ্যক্ষ রেজাউর রহমান খান এবং প্রথম আলোর কুষ্টিয়ার নিজস্ব প্রতিবেদক তৌহিদী হাসান।

বন্ধুসভার সাবেক সাধারণ সম্পাদক ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক ইমাম মেহেদীর সঞ্চালনায় বক্তারা বলেন, ইতিহাস কখনো পরিবর্তন বা বিকৃত করা যায় না। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জানতে বেশি বেশি বই পড়ার আহ্বান জানান তাঁরা।

আলোচনা সভা শেষে অলিম্পিয়াডে বিজয়ীদের মধ্যে পুরস্কার বিতরণ করা হয়। উত্তরপত্র মূল্যায়নের ভিত্তিতে ছয়জনকে বিজয়ী নির্বাচিত করা হয়। প্রথম হয়েছেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী সাগর হোসেন। দ্বিতীয় ও তৃতীয় হয়েছেন যথাক্রমে কুষ্টিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী সুরুজ আলী ও রায়ানা তাবাসসুম। চতুর্থ এবং যৌথভাবে পঞ্চম হয়েছেন এডুকেয়ার আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী নুসরাত জাহান, স্নিগ্ধা আক্তার ও নাফিজা আঞ্জুম।

অনুষ্ঠান শেষে বিজয়ীদের হাতে বই তুলে দেন অতিথিরা। সমাপনী বক্তব্য দেন কুষ্টিয়া বন্ধুসভার সভাপতি জসীম উদ্দীন।