পুকুরপাড়ে পড়ে ছিল ‘অবিস্ফোরিত বোমা’, চলত কাপড় ধোয়া, লাকড়ি কাটা

ঘটনাস্থল পরিদর্শনের পর ‘বোমাটির’ চারপাশে লাল নিশানা তুলে দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি তোলাছবি: স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত

কক্সবাজার শহর থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে রামুর লট উখিয়াঘোনার প্রত্যন্ত গ্রাম তচ্ছাখালী। দীর্ঘ ২০ বছর ধরে এই গ্রামের একটি পুকুর পাড়ে পড়ে ছিল একটি ‘অবিস্ফোরিত বোমা’, যা দেখতে অনেকটা গ্যাস সিলিন্ডারের মতো। গ্রামের মানুষ এই ‘বোমার’ ওপরই কাপড় ধোয়া, লাকড়ি কাটা, মাংস-তরকারি কাটা থেকে শুরু করে অনেক কাজই সামলে আসছেন।

সম্প্রতি বিষয়টি নজরে আসার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এরপর সিলিন্ডারসদৃশ বস্তুটি যে বোমা, তা নিশ্চিত হন কর্মকর্তারা। জেলা পুলিশের মুখপাত্র ও অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) অলক বিশ্বাস প্রথম আলোকে বলেন, প্রাথমিকভাবে মনে হয়েছে, এটি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার বোমা। বিষয়টি রামু ক্যান্টনমেন্টের বোমা ডিসপোজাল ইউনিটকে জানানো হয়। তারাও ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে একই ধারণা দিয়েছে। বোমাটির চারপাশে লাল নিশানা তুলে ঘিরে রাখা হয়েছে, যাতে কেউ আশপাশে যেতে না পারে। এ বিষয়ে লোকজনকেও সতর্ক করা হয়েছে।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার অলক বিশ্বাস আরও বলেন, অবিস্ফোরিত বোমাটি নিষ্ক্রিয় করার জন্য পুলিশের সদর দপ্তরে লিখিতভাবে জানানো হয়েছে। এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে সেনাবাহিনীর নির্দেশনাও জানতে চাওয়া হয়েছে। নির্দেশনা পাওয়ার পর বোমাটি নিষ্ক্রিয় বা অপসারণের বিষয়ে পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

সরেজমিন ঘুরে আসা পুলিশের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, ‘সিলিন্ডার আকৃতির বোমাটির সঙ্গে পাখার মতো অংশ ছিল, সেটি বহু আগে লোকজন খুলে নিয়ে গেছে। তখন মানুষ বুঝতে পারেনি, এটি ভয়ংকর বোমা।’ তিনি আরও বলেন, ‘দীর্ঘদিন বোমাটি গ্রামের একটি পুকুরপাড়ে পড়ে ছিল। ধাতব বস্তু মনে করে এত দিন গ্রামের মানুষ পুকুরপাড়ে গোসল করতে গিয়ে সিলিন্ডার আকৃতির এই ধাতব বস্তুর ওপর কাপড় ধোয়া, লাকড়ি কাটাসহ নিত্যদিনের অনেক কাজই করেছেন। এখন অবিস্ফোরিত বোমার খবর ছড়িয়ে পড়ায় ঘরে ঘরে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।’

স্থানীয় লোকজন জানান, ২০ বছর আগে পাহাড়বেষ্টিত তচ্ছাখালী গ্রামে মাটি কাটতে গিয়ে লোকজন সিলিন্ডারসদৃশ বস্তুটি খুঁজে পান। এরপর সেটি গ্রামের একটি পুকুরপাড়ে রাখা হয়। বর্তমানে সেটি স্থানীয় বাসিন্দা রোকসানা আক্তারের বসতবাড়ির পাশে রয়েছে।

গৃহবধূ রোকসানা আকতার বলেন, কয়েক বছর ধরে তিনিও এই বোমার ওপর কাপড় ধুয়ে আসছেন। এর ওপর ভেজা কাপড়ও শুকাতে দিয়েছেন। তখন কোনো ভয় ছিল না। বোমার বিষয়টি জানার পর এখন ভয়ে কেউ ধারেকাছেও যাচ্ছে না।

তচ্ছাখালী গ্রামের বাসিন্দা আবদুল গফুর বলেন, ২০ বছর ধরে বোমাটি পুকুরপাড়ে পড়ে থাকতে দেখেছেন। পাশেই তাঁর বাড়ি। কিশোর বয়স থেকে পুকুরে গোসল করতে গিয়ে এই বোমার ওপর কাপড় ধুয়েছেন। মোহাম্মদ রফিক নামের আরেকজন বলেন, ‘এত বড় একটা বোমা ২০ বছর ধরে পড়ে আছে, কেউ টেরই পেল না। এটি দ্রুত সরিয়ে নেওয়া উচিত।’

আরেক বাসিন্দা মো. ইরফান বলেন, এই বোমার ওপর আগে শিশু-কিশোরেরা খেলাধুলা করত। বোমার আশপাশে অনেক মানুষের ঘরবাড়ি। এখানে বোমাটি পড়ে থাকলে যেকোনো সময় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। সম্প্রতি সেনাবাহিনী ও পুলিশের দল এসে বোমাটি দেখে গেছে। চারপাশ লাল কাপড় দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। এটি দ্রুত নিষ্ক্রিয় কিংবা অপসারণ করা দরকার।