বাবার কাছ থেকে শেখা, প্রতিমা তৈরি করেই সংসারের হাল ধরেছেন যূথীমনি
শৈশব থেকেই মাটির সঙ্গে সখ্য। প্রতিমা তৈরিতে বাবাকে সহায়তা করা আর মাটিতে বাবার নিপূণ স্পর্শে ধীরে ধীরে দেবীর অবয়ব ফুটে উঠতে দেখা—এসবের মধ্যেই কেটেছে যূথীমনি পালের শৈশব। তখনো জানতেন না, একদিন বাবার সেই কাজই হয়ে উঠবে পরিবারের টিকে থাকার অবলম্বন। বাবার মৃত্যুর পর তাঁর শেখানো কাজকেই পেশা হিসেবে নিয়ে সংসারের হাল ধরেছেন শেরপুরের বয়ড়া পালপাড়ার এই তরুণী।
যূথীমনি পাল এ বছর শেরপুর মডেল গার্লস কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষা দিয়েছেন। ফল প্রকাশের অপেক্ষায় থাকা এই তরুণীর স্বপ্ন, ভালো ফল করে চারুকলা অনুষদে পড়বেন। তবে নিজের স্বপ্ন পূরণের পাশাপাশি মা ও ছোট বোনের দায়িত্বও সামলাতে হচ্ছে তাঁকে। তাঁর মা রেখা রানি পাল গৃহিণী। ছোট বোন প্রিয়াঙ্কা রানি পাল স্থানীয় একটি বিদ্যালয়ে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ে।
শারদীয় দুর্গাপূজা শুরুর আগে মণ্ডপে মণ্ডপে চলছিল শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। প্রতিমা তৈরির কারিগরদের ব্যস্ততাও তখন তুঙ্গে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত প্রতিমা তৈরির কাজে ব্যস্ত সময় পার করেছেন যূথীমনি। নিপুণ হাতে মাটির প্রতিমায় ফুটিয়ে তুলেছেন দেবীর অবয়ব। সময়মতো প্রতিমা বুঝিয়ে দেওয়ার তাড়া ছিল।
এবারের দুর্গাপূজায় ১৮টি মণ্ডপের প্রতিমা তৈরির কাজ করেছেন যূথীমনি। কাজ সময়মতো শেষ করতে মায়ের পাশাপাশি তিনজন সহযোগীও নিয়েছেন। একসময় বাবার পাশে দাঁড়িয়ে যে কাজ শিখেছিলেন, এখন সেই কাজই তাঁর পরিবারের জীবিকানির্বাহের প্রধান উৎস।
প্রতিমা তৈরির আয়ে চলে সংসার
২০২৪ সালের ২২ ডিসেম্বর বাবা দিলীপ কুমার পালের মৃত্যুর পর বদলে যায় যূথীমনির জীবন। পরিবারের উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়ে পরিবারটি। তিন মেয়ের মধ্যে বড় মেয়ের বিয়ে হয়েছে সিরাজগঞ্জে। নিজের সংসার নিয়ে ব্যস্ত তিনি। ফলে মা ও ছোট বোনকে নিয়ে সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে যূথীমনির কাঁধে। বাবার কাছ থেকে শেখা প্রতিমা তৈরির কাজকেই লেখাপড়ার পাশাপাশি পেশা হিসেবে বেছে নেন তিনি।
প্রতিমা তৈরির কাজটি এত সহজ নয়; এর জন্য প্রয়োজন দক্ষতা, ধৈর্য, পরিশ্রম ও শিল্পবোধ। প্রতিকূলতার মধ্যেও সেই দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে ধীরে ধীরে নিজের পরিচিতি তৈরি করেছেন যূথীমনি। এখন শেরপুর জেলা শহরের পাশাপাশি বিভিন্ন উপজেলাতেও তাঁর তৈরি প্রতিমার চাহিদা রয়েছে।
ওর বাবা যখন কাজ করতেন, তখন যূথী মন দিয়ে বসে বসে দেখত। বাবার শেখানো সেই কাজ যে একদিন আমার মেয়ে করবে, তা ভাবিনি। এখন যূথীমনি লেখাপড়ার পাশাপাশি বছরে দুবার প্রতিমা তৈরির কাজ করে। আমি ওর পাশে থাকি। এবারের পূজায় তিন মাস ধরে রাত–দিন কাজ করতে হয়েছে। এই বয়সে এত কাজের চাপ সহ্য করে কাজ করে। তার আয়েই আমাদের সংসার চলে।
বছরে দুর্গাপূজা ও সরস্বতীপূজার প্রতিমা তৈরি করেন যূথীমনি। এই দুই মৌসুমের আয় দিয়েই চলে তাঁদের সংসার। প্রতিমা তৈরির কাজের পাশাপাশি নিজের লেখাপড়া চালিয়ে যাওয়া, মায়ের দেখাশোনা এবং ছোট বোনের পড়াশোনার খরচ জোগানোর দায়িত্বও পালন করতে হয় তাঁকে।
যূথীমনি বলেন, ‘বাবার কাছ থেকে প্রতিমা তৈরির কাজ দেখেছি। বাবা প্রতিমার কাপড় পরাতে দিতেন। সেই থেকে এ কাজে আগ্রহ তৈরি হয়। হঠাৎ বাবার মৃত্যুর পর সাহস করে প্রতিমা তৈরির কাজ শুরু করি। লেখাপড়ার পাশাপাশি বছরে দুই সময়ে প্রতিমা তৈরি করি। এ আয়েই এখন আমাদের সংসার চলে।’
এ বছর ১৮টি মণ্ডপের প্রতিমা তৈরি করেছেন বলে জানালেন যূথীমনি। তিনি বলেন, জেলা শহরের পাশাপাশি বিভিন্ন উপজেলায় গিয়েও কাজ করেছেন তিনি। প্রতিটি মণ্ডপের প্রতিমা তৈরির জন্য আকারভেদে ২০ হাজার থেকে ৪৫ হাজার টাকা পর্যন্ত মজুরি পেয়েছেন।
প্রতিমা তৈরির কাজে মেয়েকে সহযোগিতা করেন মা রেখা রানি পাল। তিনি বলেন, ‘ওর বাবা যখন কাজ করতেন, তখন যূথী মন দিয়ে বসে বসে দেখত। বাবার শেখানো সেই কাজ যে একদিন আমার মেয়ে করবে, তা ভাবিনি। এখন যূথীমনি লেখাপড়ার পাশাপাশি বছরে দুবার প্রতিমা তৈরির কাজ করে। আমি ওর পাশে থাকি। এবারের পূজায় তিন মাস ধরে রাত–দিন কাজ করতে হয়েছে। এই বয়সে এত কাজের চাপ সহ্য করে কাজ করে। তার আয়েই আমাদের সংসার চলে।’
দুর্গাপূজার আনন্দের পেছনে রয়েছে যূথীমনিদের মতো অনেক কারিগরের এমন শ্রমের গল্প। প্রতিমা তৈরির পালপাড়ার আরেক কারিগর ধীরেন চন্দ্র পাল (৭০) বলেন, ‘লেখাপড়ার পাশাপাশি মেয়েটা প্রতিমা তৈরি করে সংসারের হাল ধরেছে। বাবার কাছ থেকে দেখে দেখে কাজ শিখেছে। ভবিষ্যতে সে আরও ভালো করবে।’