পণ্য ওঠানামার ঠিকাদার নিয়োগ নিয়ে ধোঁয়াশা 

মামলায় হাজিরা না দিয়ে ঠিকাদার সেলিম রেজাকে কাজের সুযোগ করে দিচ্ছেন জেলা খাদ্য বিভাগ। 

যশোর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ের অধীনে থাকা ১০টি খাদ্য গুদামে (এলএসডি) পণ্য ওঠানামার (হ্যান্ডেলিং) ঠিকাদারি কাজের মেয়াদ শেষ হয় দেড় বছর আগে। এরপর নতুন ঠিকাদার নিয়োগে দরপত্র আহ্বান করছে না খাদ্য বিভাগ। ১০টি খাদ্যগুদাম যশোর সদর, মনিরামপুর, কেশবপুর, রুপদিয়া, নওয়াপাড়া, খাজুরা, ঝিকরগাছা, নাভারণ, বাগআঁচড়া ও চৌগাছায়। 

যশোর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য খুলনার লোটাস এন্টারপ্রাইজ ১০টি খাদ্যগুদামের পণ্য হ্যান্ডেলিং কাজের ঠিকাদারি পান। দুই বছরের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগমুর্হূতে খাদ্য বিভাগ দৈনিক মজুরির ভিত্তিতে কমিশন ঠিকাদারের মাধ্যমে কাজ চালানোর সিদ্ধান্ত নেয়।

ওই সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না করার জন্য আদালতে মামলা করেন লোটাস এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী সেলিম রেজা। এরপর দেড় বছরের মধ্যে ১১ বার শুনানির দিন পড়ে। কিন্তু একটি শুনানিতেও খাদ্য বিভাগের কোনো প্রতিনিধি হাজির হননি। যে কারণে মামলার কোনো অগ্রগতি নেই। এসব মামলার অজুহাতে দরপত্রও আহ্বান করা হচ্ছে না।

যশোর সিনিয়র জুডিশিয়াল আদালতে করা মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে এর রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী সদ্যপ্রয়াত বাহাউদ্দীন ইকবাল প্রথম আলোকে বলেছিলেন, মামলাটি পরিচালনা বা হাজিরা দেওয়ার বিষয়ে খাদ্য বিভাগের কর্মকর্তাদের গাফলতি রয়েছে। 

মামলা থাকা অবস্থায় দরপত্র আহ্বান করা যাবে কি না, এ বিষয়ে মতামত চেয়ে মাস দুয়েক আগে অধিদপ্তরের আইন উপদেষ্টার কাছে চিঠি লেখা হয়েছে। এখনো জবাব আসেনি। এর আগে অধিদপ্তর থেকে ঠিকাদার নিয়োগ বন্ধ রাখা হয়েছিল। আমরা বসে নেই। দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।  
নিত্যানন্দ কুণ্ডু, জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক, যশোর

যশোর জেলা ও দায়রা জজ আদালতের প্রশাসনিক কর্মকর্তা স্বাক্ষরিত মামলাটির সার্টিফাইড নথিতে বলা হয়েছে, জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ছাড়া অপর তিনজনের সমন ফেরতের জন্য মামলার দিন ধার্য আছে। বাদীপক্ষ গড় হাজির। সমন ফেরত আসেনি। আগামী ২১ আগস্ট পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য রয়েছে।

যশোর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক নিত্যানন্দ কুণ্ডু প্রথম আলোকে বলেন, ‘মামলার হাজিরা দেওয়ার জন্য আইনজীবী নিয়োগ করা আছে। আমাদের পক্ষে তাঁর হাজিরা দেওয়ার কথা। মামলাটি চলমান রয়েছে।’

কৌশলে ঠিকাদারি কাজ নিজের কবজায় রাখার অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদার সেলিম রেজা প্রথম আলোকে বলেন, ‘খাদ্য বিভাগ নতুন পদ্ধতি চালু করেছে। সেখানে পুরানো ঠিকাদারেরাই কাজের সুযোগ পাবেন। নতুন কেউ দরপত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগ পাবেন না। আমরা এর বিরোধিতা করে মামলা করেছি।’ 

তথ্য অধিকার আইনে জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে আবেদন করে জানা গেছে, ২০১৯ থেকে ২০২২ সালের নভেম্বর পর্যন্ত ঠিকাদারি কাজের জন্য সেলিম রেজাকে ২ কোটি ৫৪ লাখ ৬ হাজার ৫১৬ টাকা পরিশোধ করা হয়েছে। এর মধ্যে সরকার রাজস্ব পেয়েছে ১১ লাখ ২৯ হাজার ৪৮৪ টাকা। গত বছরের ডিসেম্বর থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত কোনো বিলের কাগজপত্র জমা দেননি ঠিকাদার।  

কয়েকজন ঠিকাদার নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মামলায় হাজিরা না দিয়ে ঠিকাদার সেলিম রেজাকে কাজের সুযোগ করে দিচ্ছেন জেলা খাদ্য বিভাগ। 

অভিযোগ অস্বীকার করে নিত্যানন্দ কুণ্ডু বলেন, ‘মামলা থাকা অবস্থায় দরপত্র আহ্বান করা যাবে কি না, এ বিষয়ে মতামত চেয়ে মাস দুয়েক আগে অধিদপ্তরের আইন উপদেষ্টার কাছে চিঠি লেখা হয়েছে। এখনো জবাব আসেনি। এর আগে অধিদপ্তর থেকে ঠিকাদার নিয়োগ বন্ধ রাখা হয়েছিল। আমরা বসে নেই। দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।’

নতুন ঠিকাদার নিয়োগের প্রস্তুতি নেওয়ার জন্য গত বছরের ৩০ ডিসেম্বর খুলনার আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. আবদুস সালাম জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কাছে একটি চিঠি পাঠান। চিঠিতে বলা হয়, সরকারি স্বার্থে ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তির মেয়াদ তিন মাস বাড়ানো হলো। বর্ধিত সময়ের মধ্যে নতুন ঠিকাদার নিয়োগের কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য অনুরোধ করা হলো।

খাদ্য অধিদপ্তরের আইন উপদেষ্টা মো. আবু ইউসুফ বলেন, কোনো মামলায় আদালতের স্থগিতাদেশ বা নির্দেশনা না থাকলে দরপত্র আহ্বান বা সরকারি কাজে আইনগত কোনো বাধা নেই। জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক মতামত চেয়ে কোনো চিঠি দিয়েছেন কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই।’