বরুরিয়ার পাশের বড়বিলা গ্রামের বড়বিলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক সাহিদা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার বাড়ি এই এলাকায়। বরুরিয়া আমার পাশের গ্রাম। ওই গ্রামে কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় নেই।’ একইভাবে টিআর প্রকল্পের দ্বিতীয় ধাপে বরুরিয়া সর্বজনীন মহাশ্মশানঘাট সংস্কারে ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ হয়। তবে ওই শ্মশানে কোনো ঘাটের অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি।

ঘিওর উপজেলা মানিকগঞ্জ-১ (ঘিওর, দৌলতপুর ও শিবালয়) আসনের অন্তর্ভুক্ত এলাকা। এই আসনের সংসদ সদস্য এ এম নাঈমুর রহমান দুর্জয়। তাঁর নামে থোক বরাদ্দের বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়মের এমন চিত্র পাওয়া গেছে।

প্রকল্পের নয়ছয়ের বিষয়ে জানতে চাইলে নাঈমুর রহমান দুর্জয় প্রথম আলোকে বলেন, ‘এলাকায় গেলে লোকজন বরাদ্দ চায়। বরাদ্দ নিয়ে কাজ না করলে ব্যবস্থা নেওয়ার দায়িত্ব পিআইও সাহেবের। আমার কাছে কেউ অভিযোগ করলে বা পিআইও যদি বলেন প্রকল্পটা ভুয়া নিয়েছে বা কাজ করেনি, সে ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নিতে পারি। তবে অভিযোগটা আগে আসতে হবে।’

গত ২৫ আগস্ট প্রথম আলোর পক্ষ থেকে এই প্রতিবেদক ২০২১-২২ অর্থবছরে ঘিওর উপজেলায় কাবিখা, কাবিটা ও টিআর প্রকল্পের আওতায় প্রাপ্ত বরাদ্দের পরিমাণ ও তালিকা চেয়ে তথ্য অধিকার আইনে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার (পিআইও) কার্যালয়ে আবেদন করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৪ সেপ্টেম্বর ওই কর্মকর্তার কার্যালয় থেকে তথ্য সরবরাহ করা হয়। এরপর গত ১৩ থেকে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত আট দিন উপজেলার ছয়টি ইউনিয়নের ৫২টি প্রকল্প এলাকা ঘুরেছেন এই প্রতিনিধি।

টিআর প্রকল্পের অনিয়ম

টিআর কর্মসূচির চার ধাপে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল ৫৮ লাখ ৫০ হাজার ৫৬২ টাকা। মোট প্রকল্প ছিল ৯০টি। দ্বিতীয় ধাপে বালিয়াখোড়া দুর্গামন্দির সংস্কার বাবদ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। মন্দির পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক সুশীল শীল প্রথম আলোকে বলেন, টিআর কর্মসূচির বরাদ্দের ৫০ হাজার টাকা পাননি।

ধুলন্ডী গ্রামের খলিলের বাড়ি থেকে মন্তোষের বাড়ি পর্যন্ত এবং কামারজাগী গ্রামের কালাম মাস্টারের বাড়ি থেকে রহমান আলীর বাড়ি পর্যন্ত সড়ক সংস্কার বাবদ ৫০ হাজার করে ১ লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। স্থানীয় লোকজন বলেন, খলিলের বাড়ির সড়কের আংশিক কাজ হলেও কামারজাগী গ্রামের সড়কের কোনো সংস্কার করা হয়নি।

টিআর প্রকল্পের তৃতীয় ধাপে সিংজুরী বাজার অফিস সংস্কার বাবদ ৫০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। তবে এই প্রকল্পের কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। সিংজুরী বাজার ব্যবসায়ী সমিতির কোষাধ্যক্ষ আবুল হোসেন বলেন, তাঁদের সমিতির কোনো অফিস নেই। বরাদ্দের টাকা পাওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।

পিআইও মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, কোনো প্রকল্পে কাজ না হলে দ্রুত সময়ের মধ্যে তা আদায় করে নেওয়া হবে।

কাবিটা প্রকল্পে যত অভিযোগ

দুই ধাপে কাবিটার ২২টি প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৩৬ লাখ ১৯ হাজার টাকা। দ্বিতীয় পর্যায়ের পয়লা ইউনিয়নের মধ্যঢালুট ফরিদের বাড়ি থেকে আফজালের বাড়ি পর্যন্ত সড়ক পুনর্নির্মাণে বরাদ্দ দেওয়া হয় ১ লাখ ৩২ হাজার টাকা। সব টাকা তুলে নেওয়া হলেও সরেজমিনে দেখা যায়, সড়কটিতে খুব সামান্যই মাটি ফেলা হয়েছে।

এর কাজ করেছেন উপজেলা শ্রমিক লীগের সভাপতি ছানোয়ার হোসেন। তিনি দাবি করেন, পাশে নদী থেকে খননযন্ত্র দিয়ে ও পাইপের মাধ্যমে ওই সড়কে মাটি ফেলেন। তবে বর্ষায় নদীর পানি বাড়ায় সড়কটিতে পুরোপুরি মাটি ফেলা যায়নি।

উভাজানী হাসপাতাল থেকে বাঠউমুরী বাবু মিয়ার বাড়ি পর্যন্ত সড়ক পুনর্নির্মাণ প্রকল্পে বরাদ্দ দেওয়া হয় দুই লাখ টাকা। স্থানীয় বাসিন্দা আফজাল হোসেন বলেন, সড়কের পাশের জমি থেকে অল্প কিছু মাটি কেটে সড়কের নিচু অংশে ফেলা হয়েছে। একইভাবে মির্জাপুর ব্রিজ থেকে শিহরপুর বাকির বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা পুনর্নির্মাণে দুই লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হলেও কাজ হয়েছে নামমাত্র।

কাবিটা প্রকল্পে প্রথম পর্যায়ে বালিয়াবাধা বাজারসংলগ্ন ইটের সলিং রাস্তা থেকে কে বি এম উচ্চবিদ্যালয়ের পূর্ব পাশের বন্যা আশ্রয়কেন্দ্রে প্রবেশের জন্য র‌্যাম পর্যন্ত রাস্তা ও গাইডওয়াল নির্মাণে এক লাখ টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। সরেজমিনে দেখা গেছে, শুধু গাইডওয়াল নির্মাণ করা হলেও রাস্তা নির্মাণ করা হয়নি। আশাপুর সিদ্দিকের বাড়ি থেকে ইজ্জতের বাড়ি পর্যন্ত রাস্তা পুনর্নির্মাণে এক লাখ টাকা বরাদ্দ হলেও কোনো কাজ হয়নি বলে স্থানীয় ব্যক্তিদের অভিযোগ। গ্রামের নবীন মিয়া বলেন, এ রাস্তায় কোনো মাটি ফেলা হয়নি।

কাবিখা প্রকল্পেও অনিয়ম

কাবিখা কর্মসূচির দুই ধাপে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল ১৪৪ মেট্রিক টন খাদ্যশস্য (চাল ও গম)। প্রকল্প ছিল ৩৩টি। দ্বিতীয় ধাপে গোয়ালডাঙ্গী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাটি ভরাট প্রকল্পে ছয় মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল। বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক অতুল কুমার তরফদার প্রথম আলোকে বলেন, মাঠের শুধু এক পাশে মাটি ফেলা হয়েছে।

খলিলুর রহমান নামের এক ব্যক্তি ওই বিদ্যালয় মাঠে মাটি ভরাটের কাজ করেন। প্রকল্প এলাকায় গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। পরে তাঁর মুঠোফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি ধরেননি।

কাবিখা কর্মসূচির প্রথম পর্যায়ে স্বল্পসিংজুরী গ্রামের মোহাম্মদ আলীর বাড়ি থেকে স্বল্পসিংজুরী জামে মসজিদ পর্যন্ত রাস্তা পুনর্নির্মাণ প্রকল্পেও কোনো কাজ হয়নি বলে স্থানীয় লোকজন জানান। এ প্রকল্পে চার মেট্রিক টন গম বরাদ্দ দেওয়া হয়েছিল।

প্রকল্পে অনিয়মের অভিযোগ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হামিদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ‘গত অর্থবছরের শেষের দিকে আমি এখানে যোগদান করেছি। এ বিষয়ে খোঁজ নিয়ে সত্যতা পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

সরকারি বরাদ্দের যথাযথ ও সঠিক ব্যবহারের দাবি জানিয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) মানিকগঞ্জ জেলা কমিটির সহসভাপতি ইকবাল হোসেন প্রথম আলোকে বলেন, সরকারি বরাদ্দগুলো যথাযথভাবে ব্যবহার করা হলে এলাকার উন্নয়ন আরও বেগবান হতো। এলাকার উন্নয়ন হলে সাধারণ মানুষ উপকৃত হতো।