‘শিশুদের মানসিকভাবে সুস্থ রাখতে গণিতের চর্চা বাড়ানো দরকার’

ডাচ্-বাংলা-প্রথম আলো দিনাজপুর আঞ্চলিক গণিত উৎসবে যোগ দেওয়া শিক্ষার্থীরা। শনিবার সকালে দিনাজপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট মাঠেছবি: প্রথম আলো

শীতের সকালে ঝলমলে রোদ্দুর। দিনাজপুর পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের মাঠে আসতে শুরু করে খুদে শিক্ষার্থীরা। তাদের চোখেমুখে উচ্ছ্বাস। কেউ কেউ বাস–মাইক্রোবাস নিয়ে এসেছে পঞ্চগড় কিংবা ঠাকুরগাঁও থেকে। কেউ এসেছে জয়পুরহাট থেকে। অনেকের সঙ্গে অভিভাবক হিসেবে মা–বাবা ও শিক্ষকেরা এসেছেন।

আজ শনিবার সকালে দিনাজপুর আঞ্চলিক গণিত উৎসবে গণিত জয়ের স্বপ্ন নিয়ে পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের মাঠে খুদে শিক্ষার্থীদের এমন জমায়েত। ‘গণিত শেখো, স্বপ্ন দেখো’ স্লোগানে আজ ‘ডাচ্‌–বাংলা ব্যাংক–প্রথম আলো গণিত উৎসব–২০২৬’–এর দিনাজপুর আঞ্চলিক পর্ব অনুষ্ঠিত হয়েছে।

উৎসবের ২৪তম আয়োজনে রংপুর বিভাগের তিনটি জেলা ও রাজশাহী বিভাগের জয়পুরহাট জেলা থেকে পাঁচ শতাধিক খুদে গণিতবিদ অংশ নেয়।

সকাল সাড়ে ৯টায় জাতীয় সংগীতের সঙ্গে জাতীয় পতাকা, বাংলাদেশ ও আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের পতাকা উত্তোলনের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। জাতীয় পতাকা উত্তোলন করেন দিনাজপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) এস এম হাবিবুল হাসান, আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডের পতাকা উত্তোলন করেন ডাচ্‌–বাংলা ব্যাংকের দিনাজপুর শাখার উপব্যবস্থাপক মোস্তফা হেলাল ও বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াডের পতাকা উত্তোলন করেন পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ ওয়াদুদ মন্ডল।

এ সময় অন্যদের মধ্যে প্রথম আলো বন্ধুসভার উপদেষ্টা দিনাজপুর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের সার্জারি বিশেষজ্ঞ শিলাদিত্য শীল, দিনাজপুর জিলা স্কুলের সহকারী শিক্ষক শাহজাহান সাজু, প্রথম আলোর দিনাজপুর প্রতিনিধি রাজিউল ইসলাম, আঞ্চলিক কর্মকর্তা সাব্বির হাসান, বন্ধুসভার দিনাজপুর ও হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় শাখার বন্ধুরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন দিনাজপুর বন্ধুসভার সভাপতি শবনম মুস্তারিন।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন প্রথম আলো বন্ধুসভার উপদেষ্টা শিলাদিত্য শীল। তিনি বলেন, ‘গণিত হচ্ছে একটা ভাষা। এর মাধ্যমে বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয় জানা যায়। অধিকাংশই মনে করেন, গণিত একটা কঠিন বিষয়। কিন্তু একটুখানি চিন্তা করলে দেখতে পাব, ঘুম থেকে ওঠার পর ঘুমাতে যাওয়ার আগপর্যন্ত মানুষের জীবনে গণিত ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আজ খুদে শিক্ষার্থীরা গণিত রপ্ত করার জন্য সাহসী হয়ে উঠেছে। এ ধরনের আয়োজনের মধ্য দিয়ে শিক্ষার্থীরা গণিতকে বোঝা, জয় করা ও গণিতের উপকারিতা বুঝতে সচেষ্ট হবে।’

পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের অধ্যক্ষ ওয়াদুদ মন্ডল বলেন, ‘আমি খুবই অবাক হয়েছি, শিক্ষার্থী বন্ধুরা আমাদের আগেই এখানে হাজির হয়েছে। আজ অনেক শিক্ষার্থী ও অভিভাবক জিপিএ–৫–এর পেছনে ছোটেন। আজ গণিতকে ভালোবেসে শিক্ষার্থীদের এই উচ্ছ্বাস দেখে আমি অভিভূত। গণিতের প্রতি শিক্ষার্থীদের এই আগ্রহ ধরে রাখতে হবে। কারণ, গণিত আমাদের চিন্তা করতে শেখায়, ভাবতে শেখায়, কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে সহায়তা করে।’

ডাচ্‌–বাংলা ব্যাংকের উপব্যবস্থাপক মোস্তফা হেলাল বলেন, শরীর সুস্থ রাখতে শরীরচর্চা ও মনকে প্রফুল্ল রাখতে দরকার গণিতচর্চা। শিশুদের মানসিক বিকাশ ও মানসিকভাবে সুস্থ রাখতে গণিতের চর্চা বাড়ানো দরকার। তবে প্রযুক্তির উন্নতির ফলে গণিতচর্চা অনেক দূর এগিয়েছে। তাঁরা স্নাতকে পড়ার সময় গণিতের যেসব বিষয় পড়েছেন, খুদে শিক্ষার্থীরা মাধ্যমিকেই তা রপ্ত করছে।

বেলুন ও ফেস্টুন উড়িয়ে অনুষ্ঠানের উদ্বোধন ঘোষণা করেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক এস এম হাবিবুল হাসান। এ সময় তিনি বলেন, ‘এ রকম আয়োজনের মধ্য দিয়ে আইনস্টাইনের মতো মানুষ তৈরি হবে। তবে যাত্রাটা সহজ নয়। যখন দেখি বিশ্বের নামকরা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের পরাজিত করে আমাদের শিক্ষার্থীরা পতাকা ওড়াচ্ছে, তখন আমরা বড় সাফল্যের দেখা পাই। আজ নতুন প্রজন্ম অনেক পিছিয়ে পড়েছে। তাদের মধ্যে পুনর্জাগরণের জন্য ডাচ্‌–বাংলা ব্যাংক–প্রথম আলোর এই আয়োজনের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই।’

সকাল সোয়া ১০টায় ঘণ্টাব্যাপী মূল্যায়ন পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হয়। ফুলবাড়ী উপজেলার সূর্যপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে আসা বুশরা হাসান বলে, ‘অঙ্ক আমার খুব ভালো লাগে। এবারই প্রথম অনুষ্ঠানে এসেছি। নতুন বিষয়ে জানতে পারছি। খুব ভালো লাগছে।’

ঠাকুরগাঁও সরকারি বালক উচ্চবিদ্যালয় থেকে এসেছে নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী জিসান। সে বলে, ‘সকাল সাতটায় রওনা করেছি। বাবা নিয়ে এসেছেন। কয়েক দিন থেকে প্র্যাকটিস করছিলাম। ভালো প্রস্তুতি নিয়েছি। গণিত সমাধান করতে আমার খুব ভালো লাগে।’

দিনাজপুর শহরের চাউলিয়াপট্টি এলাকা থেকে আসা অভিভাবক শাহনাজ পারভীন বলেন, ‘আসলে গণিত ছাড়া বাচ্চারা তো আগাইতেই পারবে না। সঠিক চর্চা না থাকায় দেখবেন, গণিতে ফেল করার হার বেশি। এ ধরনের আয়োজন করায় শিক্ষার্থীদের মধ্যে গণিতে আগ্রহ বাড়ছে।’

আয়োজকেরা বলেন, ডাচ্‌–বাংলা ব্যাংকের পৃষ্ঠপোষকতায় ও প্রথম আলোর ব্যবস্থাপনায় বাংলাদেশ গণিত অলিম্পিয়াড কমিটি এ উৎসবের আয়োজন করেছে। দিনাজপুর আঞ্চলিক পর্বে প্রাইমারি, জুনিয়র, সেকেন্ডারি ও হায়ার সেকেন্ডারি—চার ক্যাটাগরিতে প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী নিবন্ধন করেছিল। অনলাইন বাছাইয়ের মাধ্যমে ৬৫৪ শিক্ষার্থীকে আঞ্চলিক পর্বে ডাকা হয়। আজ মূল্যায়ন পরীক্ষায় অংশ নেয় ৫১২ পরীক্ষার্থী।