‘বিদ্রোহী’র চাপে বিএনপির রেজা কিবরিয়া, ভোটের মাঠে পাশে আছেন স্ত্রী

স্বামীর পক্ষে নির্বাচনী প্রচারণা চালাচ্ছেন হবিগঞ্জ–১ আসনের বিএনপির প্রার্থী রেজা কিবরিয়ার স্ত্রী সিমি কিবরিয়াছবি: সংগৃহীত

হবিগঞ্জ–১ (নবীগঞ্জ ও বাহুবল) আসনে ১৯৯১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছাড়া বাকি সব নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা জয়ী হয়েছেন। এবার আওয়ামী লীগ ভোটে না থাকলেও বিএনপির প্রার্থী রেজা কিবরিয়া দলটির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থী শেখ সুজাত মিয়ার কারণে ‘অনেকটা চাপে পড়েছেন’, এমন কথাই শোনা গেল ভোটারদের মুখে।

আজ রোববার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত দুই উপজেলার কয়েকটি এলাকা ঘুরে অন্তত ১৬ নারী–পুরুষ ভোটারের সঙ্গে কথা বলে এ চিত্র পাওয়া যায়। ভোটের মাঠে পাঁচ প্রার্থী থাকলেও আলোচনা ঘুরপাক খাচ্ছে মূলত রেজা কিবরিয়া ও স্বতন্ত্র প্রার্থী সুজাত মিয়াকে ঘিরে।

এ আসনে বিএনপির প্রার্থী সদ্য দলে যোগ দেওয়া নেতা রেজা কিবরিয়া। তিনি সাবেক অর্থমন্ত্রী ও প্রয়াত আওয়ামী লীগ নেতা শাহ এ এম এস কিবরিয়ার ছেলে। জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্য থেকে আছেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের সিরাজুল ইসলাম। বিএনপি থেকে মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন শেখ সুজাত মিয়া। এ ছাড়া জাসদের কাজী তোফায়েল আহমেদ ও ইসলামিক ফ্রন্ট বাংলাদেশের মোহাম্মদ বদরুর রেজাও আছেন প্রতিদ্বন্দ্বিতায়।

স্থানীয় লোকজনের ভাষ্য, প্রচারে এগিয়ে বিএনপি ও বিএনপির ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীই। শেখ সুজাত মিয়াকে সরে দাঁড়াতে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান অনুরোধ করেছিলেন বলেও জানা যায়। তবে জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক থাকা যুক্তরাজ্যপ্রবাসী এই নেতা মাঠ ছাড়েননি। পরে তাঁকে ওই পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। তাঁর পক্ষে কাজ করায় দল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছেন ২৫ থেকে ৩০ নেতা–কর্মী। তবু স্বতন্ত্র প্রার্থী গণসংযোগ চালিয়ে যাচ্ছেন।

অপর দিকে অর্থনীতিবিদ রেজা কিবরিয়া দিনরাত ভোটারদের দ্বারে দ্বারে ঘুরছেন। তাঁর সঙ্গে আছেন সহধর্মিণী সিমি কিবরিয়া। তরুণ ভোটারদের কাছে তিনি বেশ আলোচিত। তাঁকে নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বুলিং ও অপপ্রচার থাকলেও প্রচার থেমে নেই। স্থানীয় ভোটারদের কেউ কেউ বলছেন, নির্বাচনী প্রচারে সিমি কিবরিয়ার উপস্থিতি ও তরুণদের সঙ্গে সংযোগ রেজা কিবরিয়ার জন্য বাড়তি শক্তি হয়ে উঠতে পারে।

রেজা কিবরিয়ার বড় শক্তি হিসেবে অনেকেই দেখছেন তাঁর পারিবারিক পরিচয়। কিবরিয়ার গ্রামের বাড়ি নবীগঞ্জ উপজেলার জলালশাপ গ্রামে। আবার এলাকায় প্রচার আছে, অক্সফোর্ডে পড়াশোনা করা রেজা কিবরিয়া বিএনপি সরকার গঠন করলে মন্ত্রী হতে পারেন।

হবিগঞ্জ–১ (নবীগঞ্জ ও বাহুবল) আসনে বিএনপির প্রার্থী রেজা কিবরিয়া ও স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ সুজাত মিয়া
ছবি: সংগৃহীত

নবীগঞ্জ প্রবাসী–অধ্যুষিত এলাকা। অনেকেই ভোট দিতে দেশে এসেছেন। যুক্তরাজ্যপ্রবাসী ফিরোজ মিয়া বলেন, ‘আমরা এমন প্রার্থীকে ভোট দিতে চাই, যাঁর পরিচয়ে আমরা সারা দেশে পরিচয় দিতে পারি।’

নবীগঞ্জ বাজারের কয়েকজন বাসিন্দা জানান, আওয়ামী লীগ ভোটে না থাকলেও তাদের সমর্থকদের কাছে টানতে চেষ্টা করছেন বিএনপি ও স্বতন্ত্র—দুই পক্ষই। তাঁদের মতে, হিন্দু সম্প্রদায় ও আওয়ামী লীগের ভোট যেদিকে বেশি যাবে, সেই প্রার্থী এগিয়ে থাকবেন।

বাহুবল বাজারের ব্যবসায়ী সৈয়দ হুমায়ুন কবীর বলেন, ‘যিনি এলাকার উন্নয়ন করার যোগ্যতা রাখেন বা গ্রামীণ অর্থনীতির দিকে তাকাবেন, দলমত–নির্বিশেষে এমন প্রার্থীকে ভোট দেব।’

নবীগঞ্জের নোয়াগাঁও গ্রামের নজির মিয়া (৬০) মনে করেন, যোগ্যতায় পার্থক্য থাকলেও মূল লড়াই বিএনপির প্রার্থী ও বিদ্রোহীর মধ্যে। তিনি বলেন, ‘এলাকায় শান্তি থাকুক, উন্নয়ন হোক, এমনটা আমরা চাই। যাঁর দ্বারা মানুষের উপকার হবে এবং মানুষকে বুঝবে। আমরা তাঁকেই এমপি হিসেবে দেখতে চাই।’

বিএনপির প্রার্থী রেজা কিবরিয়া বলেন, ‘স্বতন্ত্র প্রার্থী দলের সঙ্গে অঙ্গীকার ভঙ্গ করে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। এখানে ব্যক্তির চেয়ে ধানের শীষ প্রতীক গুরুত্বপূর্ণ। বিদ্রোহী প্রার্থী অবাধে গ্রামে গ্রামে প্রচুর টাকা ছড়াচ্ছেন। কারও চরিত্র হনন করা ও মিথ্যাচারে জর্জরিত করা উচিত নয়। আমি মানুষকে বলেছি, একবার সুযোগ দিতে। আমি পাঁচ বছরে তাঁদের ৫০ বছরের উন্নয়ন দেব। অবহেলিত জনপদের উন্নয়ন ও শিক্ষা নিয়ে আমার অনেক পরিকল্পনা রয়েছে। সংসদে গিয়ে সেই পরিকল্পনা কাজে লাগাতে চাই।’

স্বতন্ত্র প্রার্থী শেখ সুজাত মিয়া বলেন, ‘যিনি জনগণের পাশে থাকবেন, তাঁকে মানুষ ভোট দেবেন। এ মাঠে প্রতীকের চেয়ে ব্যক্তি গুরুত্ব পাবেন। আশা করি, মানুষ আমাকে বেছে নেবেন। আমি কাজ করা মানুষ, কাজ করতে চাই।’

অন্য প্রার্থীরাও উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন। ধানের শীষের ভোট ভাগ হবে—এমন হিসাব কষে ১১–দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের প্রার্থী সিরাজুল ইসলাম বলেন, ‘মানুষের কাছ থেকে ব্যাপক সমর্থন পাচ্ছি। মানুষকে বলছি, আমরা যদি নির্বাচিত হতে পারি, সন্ত্রাস ও দুর্নীতিমুক্ত দেশ উপহার দেব।’