‘বিদ্যালয়কে নদীভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করুন, না হলে পড়ালেখা করতে পারব না’
‘আমাদের বিদ্যালয় নদীভাঙনের হাত থেকে রক্ষা করুন, না হলে আমরা আর পড়ালেখা করতে পারব না। আমাদের ঘরবাড়িও কিছু থাকবে না।’
নদীভাঙন রোধের দাবিতে আজ বুধবার দুপুরে বরিশালের সন্ধ্যা নদীর তীরে মানববন্ধনে অংশ নিয়ে এমন দাবি জানায়, পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী তানহা আক্তার। সে বরিশালের বাবুগঞ্জ উপজেলার কেদারপুর ইউনিয়নের মধ্য-পশ্চিম ভূতেরদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। সেই বিদ্যালয়টিই এখন নদীভাঙনের মুখে।
নদীভাঙন থেকে বিদ্যালয়সহ বসতভিটা ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে আজ দুপুরে স্থানীয় বাসিন্দারা এ মানববন্ধনের আয়োজন করেন। পশ্চিম ভূতেরদিয়া ও উত্তর বাহেরচর বাজারসংলগ্ন ভাঙনকবলিত এলাকায় আয়োজিত মানববন্ধনে ভাঙনকবলিত পরিবারের সদস্য, শিক্ষার্থী, শিক্ষক, ব্যবসায়ীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার কয়েক শ মানুষ অংশ নেন।
শুধু ওই প্রাথমিক বিদ্যালয় নয়, ভাঙনের মুখে রয়েছে বসতবাড়ি, বাজার, দোকানপাট ও আরেকটি মাধ্যমিক বিদ্যালয়। নদীতীরের অর্ধশতাধিক পরিবারও ঘরবাড়ি হারানোর শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, চলতি বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই সন্ধ্যা নদীর প্রবল স্রোতে পশ্চিম ভূতেরদিয়া এলাকায় নতুন করে ভাঙন শুরু হয়েছে। এরই মধ্যে গ্রামের একটি বড় অংশ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। নদীর পাড় ক্রমেই লোকালয়ের দিকে এগিয়ে আসায় আতঙ্কে রয়েছেন নদীতীরের বাসিন্দারা।
স্থানীয় বাসিন্দা ইউসুফ চৌকিদার, ভাঙন নতুন নয়। প্রায় প্রতিবছরই বর্ষা মৌসুমে সন্ধ্যা নদীর স্রোতে এ এলাকায় ভাঙন দেখা দেয়। এতে কোনো কোনো বছর বসতভিটা ও ফসলি জমি নদীতে চলে যায়। কিন্তু স্থায়ী প্রতিরোধব্যবস্থা না থাকায় ভাঙনের ঝুঁকি থেকেই যায়।
এবার পশ্চিম ভূতেরদিয়া এলাকায় ভাঙন তীব্র হওয়ায় পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আরও অনেক ঘরবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হতে পারে।
ভাঙনের ঝুঁকিতে থাকা স্থাপনাগুলোর মধ্যে রয়েছে মধ্য-পশ্চিম ভূতেরদিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ও বাহেরচর আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাছাকাছি নদীর পাড় ভেঙে গেলে বিদ্যালয়টির ভবন ও শিক্ষার্থীদের যাতায়াতও ঝুঁকিতে পড়বে। এতে শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা করছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
বিদ্যালয়ের পাশাপাশি উত্তর বাহেরচর বাজার নিয়েও শঙ্কিত স্থানীয় ব্যবসায়ীরা। বাজারটিতে শতাধিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। নদীর ভাঙন অব্যাহত থাকলে এসব দোকানপাটও ঝুঁকিতে পড়তে পারে। বাজারটির আশপাশের কয়েকটি গ্রামের মানুষের কেনাকাটা ও ব্যবসা-বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। ভাঙনে বাজার ক্ষতিগ্রস্ত হলে শুধু ব্যবসায়ীরা নয়, এলাকার সাধারণ মানুষও সমস্যায় পড়বেন।
বাহেরচর আদর্শ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক বজলুর রহমান বলেন, বাবুগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় প্রতিবছর নদীভাঙনে মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। বর্ষা এলেই সন্ধ্যা নদীর প্রবল স্রোতে ভাঙন তীব্র হয়। স্থায়ী ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিবছরই মানুষ বসতভিটা হারাচ্ছেন। এবার পশ্চিম ভূতেরদিয়া এলাকায় ভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। এভাবে ভাঙন চলতে থাকলে সামনে বড় ধরনের ক্ষতি হতে পারে। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাজার রক্ষা করা জরুরি। নদীতীরে দ্রুত প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া না হলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে।
মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, নদীভাঙনে একদিকে মানুষ বসতভিটা হারাচ্ছেন, অন্যদিকে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলোও ঝুঁকিতে পড়ছে। ফলে এখনই ব্যবস্থা নেওয়া না হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে।
মানববন্ধনে আরও বক্তব্য দেন মুন্না হাওলাদার, রিপন হাওলাদার, মিজান হাওলাদার, শাহে আলম হাওলাদার, আবদুর রাজ্জাক হাওলাদার, মো. রহমান হাওলাদার, পলাশ খান প্রমুখ।
প্রতি বর্ষা মৌসুমে জেলার বিভিন্ন উপজেলার নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করে। গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও স্থাপনা রক্ষায় পর্যায়ক্রমে ভাঙন প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।জাবেদ ইকবাল, নির্বাহী প্রকৌশলী, পাউবো, বরিশাল
বক্তারা আরও বলেন, শুধু সাময়িকভাবে বালুর বস্তা ফেলে বা অন্য কোনো উপায়ে ভাঙন ঠেকানো নয়, দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই নদীতীর সংরক্ষণ প্রকল্প নিতে হবে। প্রতিবছর ভাঙন শুরু হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার পরিবর্তে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো চিহ্নিত করে আগেই প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন।
ভাঙন প্রতিরোধের বিষয়ে জানতে চাইলে বরিশাল পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী জাবেদ ইকবাল বলেন, প্রতি বর্ষা মৌসুমে জেলার বিভিন্ন উপজেলার নদীভাঙন তীব্র আকার ধারণ করে। গুরুত্বপূর্ণ স্থান ও স্থাপনা রক্ষায় পর্যায়ক্রমে ভাঙন প্রতিরোধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তবে স্থানীয় বাসিন্দাদের আশঙ্কা, ‘পর্যায়ক্রমে’ ব্যবস্থা নেওয়ার অপেক্ষায় থাকতে থাকতে বিদ্যালয়, বাজার বা ঘরবাড়ি নদীতে চলে গেলে তখন বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যাবে। তাঁদের দাবি, ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার আগে জরুরি ভিত্তিতে নদীতীর সংরক্ষণের কাজ শুরু করা হোক।