পবিত্র ঈদুল আজহায় অস্থায়ী পশুর হাট ইজারা দিয়ে সাত বছরের মধ্যে এবার সবচেয়ে কম আয় করতে যাচ্ছে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন। তিনটি হাটের জন্য ইজারাদার নিয়োগে বিজ্ঞপ্তি দিলেও ইজারাদার পাওয়া গেছে দুটি হাটে। এগুলোর জন্য সর্বোচ্চ ইজারা দর জমা পড়েছে মোট ২ কোটি ১৪ লাখ ১০ হাজার টাকা। অন্যটিতে কোনো ফরম জমা পড়েনি।
গতকাল মঙ্গলবার ছিল দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন। এ জন্য সিটি করপোরেশন এলাকায় নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার করা হয়। গত বছর কোরবানি পশুর হাটের দরপত্র জমাকে কেন্দ্র করে মারামারির ঘটনা ঘটেছিল।
আজ বুধবার দরপত্র মূল্যায়ন কমিটির সভায় ইজারাদার চূড়ান্ত হওয়ার কথা রয়েছে। গত বছর ৫টি হাট থেকে সিটি করপোরেশনের মোট রাজস্ব আয় হয়েছিল ৩ কোটি ৪৬ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। গতবার সব কটি পশুর হাট পেয়েছিলেন বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতারা। ছাত্র-জনতার আন্দোলনে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে পশুর হাটগুলোর নিয়ন্ত্রণ ছিল দলটির নেতাদের হাতে।
ইজারাদারদের অভিযোগ, অনুমোদনের পর সব হাটের জন্য বিজ্ঞপ্তি না দেওয়া; নগরের বিভিন্ন এলাকায় ব্যক্তিমালিকানাধীন পশুর খামারে কোরবানি গরু বিক্রি এবং নগর ও নগরের প্রবেশমুখে অবৈধ হাট বসার কারণে অস্থায়ী পশুর হাটগুলো নিয়ে প্রতিযোগিতা কমেছে। তাই সিটি করপোরেশনের আয় কমছে।
সাত বছরের মধ্যে কম আয়
সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, এবারের তিনটি হাটের মধ্যে দুটি হাটে জন্য দর পড়েছে ২ কোটি ১৪ লাখ ১০ হাজার টাকা। এর মধ্যে নগরের বাকলিয়ার এক কিলোমিটার এলাকার কর্ণফুলী পশুর হাটের জন্য সর্বোচ্চ দর জমা পড়েছে ২ কোটি ১২ লাখ টাকা। এই হাটের জন্য সিটি করপোরেশনের প্রত্যাশিত দর ছিল ২ কোটি ৪ লাখ টাকা। মোট চারটি দরপত্র জমা পড়ে।
নগরের উত্তর পতেঙ্গার মুসলিমাবাদ সড়কের সিআইপি জসিমের খালি মাঠের জন্য সিটি করপোরেশন দর দিয়েছিল ১ লাখ ৯৬ হাজার টাকা। যদিও দর পড়েছে ২ লাখ ১০ হাজার টাকা। এই হাটের জন্য মাত্র একটি দরপত্র ফরম জমা পড়েছে। নগরের পাঁচলাইশ ওয়ার্ডের ওয়াজেদিয়া পশুর হাটের জন্য কোনো দরপত্র জমা পড়েনি। সর্বোচ্চ দর দেওয়া ব্যক্তিরা হাটের ইজারা পাওয়ার কথা রয়েছে।
সাত বছরের মধ্যে অস্থায়ী হাট থেকে সবচেয়ে বেশি আয় করেছিল ২০২৪ সালে। তখন কোরবানির পশুর হাট নিয়ন্ত্রণ নিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতারা দ্বন্দ্বে জড়িয়েছিলেন। এতে লাভ হয় সিটি করপোরেশনের। সাতটি হাট থেকে সিটি করপোরেশন রাজস্ব পেয়েছিল ৫ কোটি ৬ লাখ টাকা।
২০২০ সালে করোনা মহামারির পর থেকে এখন পর্যন্ত এবারই সবচেয়ে কম দর জমা পড়েছে অস্থায়ী পশুর হাটের জন্য। ওই বছর কোভিড পরিস্থিতির কারণে তিনটি হাট বসানোর অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। এই তিন হাট ইজারা দিয়ে আয় হয়েছিল ২ কোটি ৮৭ লাখ টাকা। ২০২১ সালেও কোভিড পরিস্থিতির জন্য হাট বসেছিল ৩টি। তখন আয় হয়েছিল ২ কোটি ৫০ লাখ টাকা।
সাত বছরের মধ্যে অস্থায়ী হাট থেকে সবচেয়ে বেশি আয় করেছিল ২০২৪ সালে। তখন কোরবানির পশুর হাটের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতারা দ্বন্দ্বে জড়িয়েছিলেন। এতে লাভ হয় সিটি করপোরেশনের। সাতটি হাট থেকে সিটি করপোরেশন রাজস্ব পেয়েছিল ৫ কোটি ৬ লাখ টাকা। ২০২৩ সালে ৭টি হাট ইজারা দিয়ে আয় হয়েছিল ৩ কোটি ১৩ লাখ টাকা এবং ২০২২ সালে মাত্র তিনটি হাট থেকেই রাজস্ব পেয়েছিল ৪ কোটি ৯৩ লাখ ৭০ হাজার টাকা।
আয় কমছে যে কারণে
এবারের পবিত্র ঈদুল আজহায় নগরের বিভিন্ন এলাকায় ১৬টি অস্থায়ী পশুর হাট বসাতে চেয়েছিল সিটি করপোরেশন। জেলা প্রশাসন অনুমোদন দেয় ছয়টি হাটের। কিন্তু সিটি করপোরেশন তিনটি হাটে ইজারাদার নিয়োগের জন্য বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। অন্য তিনটি হাটের জন্য দেয়নি।
জেলা প্রশাসনের অনুমোদন থাকলেও ইজারা বিজ্ঞপ্তি না দেওয়া হাটগুলো হচ্ছে উত্তর পতেঙ্গার পূর্ব হোসেন আহম্মদপাড়া সাইলো সড়কের পাশে টিএসপি মাঠ, আউটার রিং রোডের সিডিএ বালুর মাঠ এবং মধ্যম হালিশহরের মুনিরনগর আনন্দবাজার–সংলগ্ন রিং রোডের পাশে খালি মাঠ।
সাধারণত ১ থেকে ১০ জিলহজ পর্যন্ত (ঈদের আগের ১০ দিন) অস্থায়ী পশুর হাটগুলো বসে। এবার চলতি মাসের শেষ সপ্তাহে পবিত্র ঈদুল আজহা অনুষ্ঠিত হতে পারে। অর্থাৎ হাতে সময় আছে ১৪ থেকে ১৫ দিন। এ সময়ের মধ্যে ইজারাদার নিয়োগ করা না হলে রাজস্ব হারাবে সিটি করপোরেশন।
হাটগুলো ইজারা নিতে আগ্রহী অন্তত তিনজন ইজারাদার অভিযোগ করেছেন, সিটি করপোরেশন ‘পছন্দের’ ব্যক্তিদের হাটগুলো তুলে দিতে চায়। যাঁরা এই হাটগুলো নিতে চান, তাঁরা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী। একটি বিশেষ দলের সমর্থক। তাঁদের দেওয়ার জন্য ইজারা বিজ্ঞপ্তি দেয়নি। তাঁদের মতে, এভাবে হাটগুলো পছন্দের ব্যক্তির হাতে তুলে দেওয়া হলে সিটি করপোরেশন রাজস্ব হারাবে। কেননা, প্রতিযোগিতা ছাড়া ইজারাদার নিয়োগ হলে প্রত্যাশিত দর পাওয়া যাবে না।
সিটি করপোরেশন সূত্র জানায়, গত বছর এই তিনটি হাটের জন্য ৫১টি দরপত্র ফরম জমা পড়েছিল। হাটগুলো থেকে সিটি করপোরেশনের আয় হয়েছিল ১ কোটি ৫৯ লাখ ২৫ হাজার টাকা।
তবে পছন্দের ব্যক্তিকে হাট ইজারার দেওয়ার বিষয়টি ঠিক নয় বলে দাবি করেছেন সিটি করপোরেশনের প্রধান রাজস্ব কর্মকর্তা এস এম সরওয়ার কামাল। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ইজারা ছাড়া হাট দেওয়ার কোনো পরিকল্পনা নেই। যেসব জায়গায় হাটগুলো বসবে, সেগুলোর মালিকানা নিয়ে স্থানীয় পর্যায়ে দ্বন্দ্ব রয়েছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বিবেচনা করে আপাতত বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হচ্ছে না। আর যে হাটগুলোর জন্য বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছে, সেগুলোয় প্রত্যাশার চেয়ে বেশি দর পাওয়া গেছে।
সিটি করপোরেশনের সবচেয়ে বড় অস্থায়ী পশুর হাট কর্ণফুলী পশুর হাটের ইজারাদার ছিলেন খোরশেদ আলম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, অস্থায়ী পশুর হাটগুলোর আয়তন কমেছে। নগরের প্রবেশমুখে কিছু অবৈধ হাট রয়েছে, ওখানে কোনোটাতে হাসিল (গরু-ছাগলের ক্রেতাদের ইজারাদারকে নির্ধারিত অঙ্কের টাকা দিতে হয়) নেওয়া হয় না, কোনোটাতে নিলেও কম। এ ছাড়া কয়েক বছর ধরে নগর ও নগরের আশপাশে প্রচুর খামার হয়েছে। মানুষ হাটে এসে গরু কেনার চেয়ে খামার থেকে কিনতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। এসব কারণে হাট ইজারা নিয়ে একসময় যে আয় হতো তা এখন হচ্ছে না। ফলে অস্থায়ী পশুর হাটগুলো নিয়ে ইজারাদারদের মধ্যে আগ্রহ কমছে। প্রতিযোগিতা কমায় দরও পড়ে তুলনামূলকভাবে কম।