হাঁটুপানিতে ডুবে আছে সাতকানিয়া স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, জরুরি রোগীরা আসছেন ভেলা ও নৌকায়
প্রবল বর্ষণ আর পাহাড়ি ঢলের পানিতে তলিয়ে গেছে চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স। হাসপাতালের সামনের সড়ক ও পাঁচটি ভবনের নিচতলায় এখন হাঁটুসমান পানি। জরুরি ও বহির্বিভাগের ৭টি ইউনিট তলিয়ে যাওয়ায় চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। পাঁচটি ভবনের দ্বিতীয় তলার বারান্দায় টেবিল পেতে বহির্বিভাগের রোগীদের সেবা দিচ্ছেন চিকিৎসকেরা। গুরুতর অসুস্থ রোগীদের পানি ডিঙিয়ে কাঁধে করে এবং নৌকা ও ভেলায় ভাসিয়ে হাসপাতালে আনছেন স্বজনেরা।
পৌরসভার ৬ নম্বর ওয়ার্ডের চরপাড়া এলাকায় অবস্থিত স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সামনের ৫০০ মিটার সড়ক গত মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকেই পানিতে ডুবে আছে। পানি ঢুকেছে হাসপাতালের পাঁচটি ভবনের নিচতলায়। আজ শনিবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা গেছে, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সড়কটিতে এখনো হাঁটুসমান পানি। হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্মচারীদের বাসভবনও ডুবে গেছে। এতে তাঁরাও ভোগান্তিতে পড়েছেন। পানি ডিঙিয়ে রোগীরা হাসপাতালে যাচ্ছেন। পুরো হাসপাতাল এলাকার চারদিকেই পানি থইথই করছে। ইউনিয়ন ও গ্রামীণ সড়কগুলো ডুবে থাকায় অনেক রোগী হাসপাতালে আসতে পারছেন না। কেবল গুরুতর অসুস্থ, আহত ও জরুরি প্রসূতি রোগীদের কোমরপানি মাড়িয়ে হাসপাতালে আনছেন স্বজনেরা। আজ বেলা ১টা পর্যন্ত মাত্র ৪৮ জন রোগী হাসপাতালে চিকিৎসাসেবা নিতে এসেছেন। তাঁদের কয়েকজন জানান, তাঁরা কেউ কোমরসমান, আবার কেউ গলাসমান পানিতে ডুবে থাকা পথ পাড়ি দিয়ে এসেছেন।
স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সড়কটিতে এখনো হাঁটুসমান পানি। হাসপাতালের চিকিৎসক ও কর্মচারীদের বাসভবনও ডুবে গেছে। এতে তাঁরাও ভোগান্তিতে পড়েছেন। পানি ডিঙিয়ে রোগীরা হাসপাতালে যাচ্ছেন। পুরো হাসপাতাল এলাকার চারদিকেই পানি থইথই করছে। ইউনিয়ন ও গ্রামীণ সড়কগুলো ডুবে থাকায় অনেক রোগী হাসপাতালে আসতে পারছেন না। কেবল গুরুতর অসুস্থ, আহত ও জরুরি প্রসূতি রোগীদের কোমরপানি মাড়িয়ে হাসপাতালে আনছেন স্বজনেরা।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার সন্ধ্যায় হাসপাতালে বন্যার পানি ঢুকে পড়ে। পরের দিন তা গলাসমান হয়। কিছুটা কমে এখনো পুরো হাসপাতাল এলাকা কোমরসমান পানিতে ডুবে আছে। হাসপাতাল ল্যাবের অনেক প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নষ্ট হয়ে গেছে।
রোগীদের ৫টি ওয়ার্ড বিভিন্ন ভবনের দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলায়। এসবের একটি মহিলা ওয়ার্ডে শ্বাসকষ্ট নিয়ে গত চার দিন আগে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৬০ বছর বয়সী বৃদ্ধা ছেনু আরা। ভারী বৃষ্টিতে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা তলিয়ে যাওয়ার পর স্বজনদের সঙ্গে তাঁর যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়। হাসপাতালে তাঁকে কেউ দেখতেও আসছেন না।
ছেনু আরার বাড়ি চট্টগ্রামের সাতকানিয়া উপজেলার খাগরিয়া ইউনিয়নের প্রত্যন্ত এলাকায়। শ্বাসকষ্ট বেড়ে গেলে একটি অটোরিকশায় চেপে গত মঙ্গলবার দুপুরে তিনি একাই সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এসে ভর্তি হন। ওই দিন সন্ধ্যায় হাসপাতালে বন্যার পানি ঢুকে পড়ে। পরের দিন তা গলাসমান হয়।
ছেনু আরা প্রথম আলোকে বলেন, ‘হাসপাতাল থেকে আমার বাড়ি প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে। বাড়িতে আমি একাই থাকি। তিন মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। হাসপাতালে ভর্তি আছি জানলে আমার পছন্দের খাবার নিয়ে মেয়েরা দেখতে আসত। বিদ্যুৎ ও নেটওয়ার্ক না থাকায় এখন তাদের ফোনে জানাতেও পারছি না। হাসপাতালে বাইরের সড়কেও পানি। বাড়িতেও ফিরতে সাহস পাচ্ছি না। হাতে যা টাকা ছিল তা শেষ হয়ে গেছে। কেউ ত্রাণ সহায়তাও দেননি। হাসপাতালে যে খাবার খেতে দেওয়া হয় তা আমি খেতে পারি না।’
ছেনু আরার মতো অবস্থা হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আরও অন্তত ৩০ জন রোগীর। তাঁদের অনেকেই পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারছেন না। হাসপাতাল ফটকে কথা হয় আবদুস সালাম নামে এক যুবকের সঙ্গে। তিনি ও তাঁর স্ত্রী এওচিয়া ইউনিয়ন থেকে গলাসমান পানি পার হয়ে দেড় বছরের শিশুকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছেন।
সাতকানিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জরুরি বিভাগের চিকিৎসক বেলাল উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘প্রতিদিন হাসপাতালে গড়ে ৬০০ রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। যোগাযোগব্যবস্থা বিচ্ছিন্ন থাকায় এখন রোগী আসছেন ১০০ থেকে ১৫০ জন। যাঁরা আসছেন তাঁরা অতি প্রয়োজনে আসছেন। হাসপাতাল ডুবে যাওয়ায় চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। লোডশেডিংয়ের কারণে পানির সংকট আছে। বন্যার মধ্যেও ১২টি প্রসব হয়েছে। এখনো হাসপাতালে ত্রাণ সহায়তা দেওয়া হয়নি। আমরা রোগীদের রান্না করা খাবার দিচ্ছি।’
গতকাল শুক্রবার সাতকানিয়া ও লোহাগাড়ার বন্যা পরিস্থিতির কিছুটা উন্নতি হয়েছে। আগের চেয়ে পানি কিছুটা কমেছে। তবে সাতকানিয়া পৌরসভা ও উপজেলার ১৭টি ইউনিয়ন এখনো কমবেশি প্লাবিত। পানিবন্দী আছেন অন্তত ৪ লাখ মানুষ। লোহাগাড়ার সদর ইউনিয়ন, আধুনগর, বড়হাতিয়া ও আমিরাবাদ ইউনিয়নের কিছু এলাকায় এখনো পানি আছে। সাতকানিয়ার ৮৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন কয়েক হাজার মানুষ। বন্যা আক্রান্ত অনেক পরিবারের কাছে এখনো ত্রাণ সহায়তা পৌঁছায়নি। এসব মানুষ খাবার ও পানি–সংকটে মানবেতর জীবন যাপন করছেন। সাতকানিয়া অংশে সাঙ্গু নদের পানি আবারও বেড়ে বিপৎসীমার ২৯ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। কেরানীহাট-বান্দরবান মহাসড়কে এখনো যান চলাচল স্বাভাবিক হয়নি।
পানি উন্নয়ন বোর্ড চট্টগ্রামের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী প্রশান্ত তালুকদার গতকাল শুক্রবার সন্ধ্যায় প্রথম আলোকে বলেন,‘বন্যা পূর্বাভাস কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, আগামী ২৪ ঘণ্টায় দেশের দক্ষিণ-পূর্ব অঞ্চলে ভারী থেকে অতি ভারী বৃষ্টিপাত হওয়ার সম্ভাবনা আছে। পরবর্তী নির্দেশনা না দেওয়া পর্যন্ত লোকজনকে নিরাপদ আশ্রয়ে অবস্থান করতে হবে।’