বিশ্বভ্রমণের স্বপ্ন নিয়ে বানিয়েছিলেন নৌযান, কক্সবাজারে ছেলেকে হারিয়ে আকাশপথে নিউজিল্যান্ডে ফিরছেন এডওয়ার্ড

নিজেদের তৈরি কাঠের নৌযান ‘আইল্যান্ড গার্ল’ নিয়ে সমুদ্রপথে বিশ্বভ্রমণের স্বপ্ন ছিল নিউজিল্যান্ডের নাগরিক জন এডওয়ার্ড পুডনির। স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে কক্সবাজারে থেকে প্রায় আড়াই বছরের চেষ্টায় নৌযানটি তৈরি করেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই স্বপ্ন আর পূরণ হয়নি। এক ছেলে হারিয়ে তিনি নিজ দেশে ফিরে যাচ্ছেন।

নৌযানডুবির শিকার নিউজিল্যান্ডের পরিবারটির সদস্যরা। এর মধ্যে দুর্ঘটনায় একজনের (বাঁয়ে) মৃত্যু হয়েছেছবি:পুলিশের সৌজন্যে

নিজেদের তৈরি কাঠের নৌযান ‘আইল্যান্ড গার্ল’ নিয়ে সমুদ্রপথে বিশ্বভ্রমণের স্বপ্ন ছিল নিউজিল্যান্ডের নাগরিক জন এডওয়ার্ড পুডনির। স্ত্রী ও দুই সন্তানকে নিয়ে কক্সবাজারে থেকে প্রায় আড়াই বছরের চেষ্টায় নৌযানটি তৈরি করেছিলেন তিনি। পরিকল্পনা ছিল, এই নৌযানে করেই সমুদ্র পাড়ি দিয়ে নিজ দেশে ফিরবেন। কিন্তু তাঁর সেই যাত্রা আর হলো না।

চলতি বছর ২৫ আগস্ট কক্সবাজারের মহেশখালী চ্যানেলের সোনাদিয়া মোহনায় বড় ঢেউ ও তীব্র স্রোতে ডুবে যায় ‘আইল্যান্ড গার্ল’। জন এডওয়ার্ড, তাঁর স্ত্রী বেলা ও ১৩ বছর বয়সী ছেলে রালফকে জীবিত উদ্ধার করা হয়। নিখোঁজ ছিল তাঁদের ১৬ বছর বয়সী ছেলে আলবার্ট। পরদিন উদ্ধার হয় তার মরদেহ।

আজ শুক্রবার রাতে স্ত্রী বেলা ও ছেলে রালফকে নিয়ে আকাশপথে নিউজিল্যান্ডে ফেরার কথা রয়েছে জন এডওয়ার্ডের। কক্সবাজারে তিনি রেখে যাচ্ছেন প্রয়াত ছেলে আলবার্টের স্মৃতি। আর বাঁকখালী নদীর তীরে পড়ে আছে তাঁদের স্বপ্নের নৌযান ‘আইল্যান্ড গার্ল’।

কক্সবাজার সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) শেখ মোহাম্মদ আলী প্রথম আলোকে বলেন, আইনগত প্রক্রিয়া ও ময়নাতদন্ত শেষে নিউজিল্যান্ড দূতাবাস এবং পরিবারের অনুমতি নিয়ে ১৫ সেপ্টেম্বর কক্সবাজার শহরের একটি হিন্দু শ্মশানে আলবার্টের দাহকর্ম সম্পন্ন করা হয়। পরিবারের বাকি তিন সদস্যকে জেলা প্রশাসনের তত্ত্বাবধানে রাখা হয়েছিল। বাংলাদেশে নিউজিল্যান্ডের দূতাবাস না থাকায় নিকটতম শ্রীলঙ্কা দূতাবাসের সহযোগিতায় পরিবারের সদস্যদের দেশে ফেরানোর প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়েছে।

‘নিরাপত্তার ঝুঁকি বিবেচনায় পরিবারটিকে সমুদ্রযাত্রা থেকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছিল। তবে তাঁরা সমুদ্রযাত্রার পরিকল্পনা থেকে সরে আসেননি।’
—লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন, মিডিয়া কর্মকর্তা, কোস্টগার্ড পূর্ব জোন

কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের ইনচার্জের দায়িত্বে থাকা সহকারী কমিশনার মাহমুদুর রহমান বলেন, নৌযানডুবির পর থেকে পরিবারের তিন সদস্যকে কক্সবাজারের পর্যটন করপোরেশনের মোটেল শৈবালে রাখা হয়েছিল। তাঁদের নিরাপত্তাও জোরদার করা হয়। আজ শুক্রবার রাতে তাঁদের দেশে ফেরার কথা রয়েছে। ফেরার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত নৌযানটি কোস্টগার্ডের হেফাজতে রয়েছে। সেখান থেকে উদ্ধার করা কিছু জিনিসপত্র পরিবারের সদস্যদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। নৌযানডুবির সময় তাঁদের পাসপোর্টসহ প্রয়োজনীয় কিছু কাগজপত্র হারিয়ে যায়। এ কারণে বিকল্প ব্যবস্থায় দেশে ফেরার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়েছে।

বিশ্বজয়ের স্বপ্ন সাগরে বিলীন

গত ২৫ আগস্ট সকালে ‘আইল্যান্ড গার্ল’ নিয়ে চট্টগ্রামের উদ্দেশে যাত্রা করেছিলেন জন এডওয়ার্ড ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা। নাজিরারটেক থেকে কিছু দূরে মহেশখালী চ্যানেলের সোনাদিয়া মোহনায় সকাল সাড়ে নয়টার দিকে বড় ঢেউ ও তীব্র স্রোতের মুখে পড়ে নৌযানটি।

জন এডওয়ার্ড পুডনি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে পর্যটক ভিসায় বাংলাদেশে আসেন। পরে নৌযান তৈরির জন্য কক্সবাজারকে বেছে নেন তিনি। কক্সবাজার শহরের এসএম পাড়া এলাকায় স্থানীয় কারিগরদের সহযোগিতায় নৌযানটির নির্মাণকাজ শুরু হয়।

ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী সোনাদিয়ার জেলে আবদুর রহমান বলেন, দুটি কাঠের নৌযান জোড়া দিয়ে ‘আইল্যান্ড গার্ল’ তৈরি করা হয়েছিল। বড় ঢেউয়ের ধাক্কায় নৌযান দুটির সংযোগস্থল বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। এরপর ডুবে যায় নৌযানটির একটি অংশ। কয়েক মিনিটের মধ্যে অপর অংশটিও ডুবে যায়।

নৌযানটি ডুবে যাওয়ার পর পরিবারের চার সদস্য সাগরে পড়ে যান। স্থানীয় জেলেরা জন এডওয়ার্ড, তাঁর স্ত্রী বেলা ও ছেলে রালফকে উদ্ধার করেন। নিখোঁজ থাকেন আলবার্ট। তাঁকে উদ্ধারে দুর্ঘটনার পর থেকেই সাগর ও উপকূলে তল্লাশি শুরু হয়। দিনভর ও রাতেও অভিযান চালানো হয়।

আরও পড়ুন

পরদিন ২৬ আগস্ট সকাল থেকে আবার অনুসন্ধানে নামেন কোস্টগার্ড, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস, লাইফগার্ড ও স্থানীয় জেলেরা। ওই দিন বিকেল সাড়ে পাঁচটার দিকে কক্সবাজার পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের সমিতিপাড়া উপকূলে একটি মরদেহ ভাসতে দেখেন স্থানীয় লোকজন। পরে সেটি আলবার্টের বলে শনাক্ত করা হয়।

পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, ভিসার মেয়াদ–সংক্রান্ত বিষয়ে ব্যবস্থা নিতে তাঁরা সমুদ্রপথে চট্টগ্রামের দিকে যাচ্ছিলেন। নৌযানডুবির সময় আলবার্টের লাইফ জ্যাকেটের ক্লিপ ঠিকভাবে আটকানো ছিল না বলে তাঁদের ধারণা। আলবার্ট সাঁতার জানত না। সে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন ছিল।

জন এডওয়ার্ড পুডনি পরিবারের সদস্যদের নিয়ে পর্যটক ভিসায় বাংলাদেশে আসেন। পরে নৌযান তৈরির জন্য কক্সবাজারকে বেছে নেন তিনি। নাজিরারটেক এলাকার বাসিন্দা দিদারুল ইসলাম রুবেল বলেন, কক্সবাজার শহরের এসএম পাড়া এলাকায় স্থানীয় কারিগরদের সহযোগিতায় নৌযানটির নির্মাণকাজ শুরু হয়। প্রায় আড়াই বছর ধরে চলে এর নির্মাণকাজ।

আরও পড়ুন
কক্সবাজারের একটি ডকে দুটি নৌকা জোড়া দিয়ে তৈরি হয় আইল্যান্ড গার্ল নামের নৌযান। এতে সাগর পাড়ি দিয়ে চট্টগ্রাম আসতে গিয়ে দুর্ঘটনায় পড়ে নিউজিল্যান্ডের পরিবারটি
ছবি: পুলিশের সৌজন্যে

জন এডওয়ার্ড নৌযানটির নাম দিয়েছিলেন ‘আইল্যান্ড গার্ল’। দীর্ঘদিন সমুদ্রে থাকার পরিকল্পনা থেকে এর ভেতরে বসবাসের ব্যবস্থাও করা হয়েছিল। এতে শীততাপনিয়ন্ত্রিত কক্ষ, ফ্রিজ ও রান্নাঘর ছিল। নুনিয়াছড়া বিআইডব্লিউটিএ জেটির বিপরীতে বাঁকখালী নদীতে নৌযানটি প্রায়ই নোঙর করে রাখা হতো। এর আকার ও নকশা স্থানীয় লোকজনের নজর কেড়েছিল।

পরিবারটির সমুদ্রযাত্রা নিয়ে আগে থেকেই উদ্বেগ ছিল বলে জানিয়েছে কোস্টগার্ড। কোস্টগার্ড পূর্ব জোনের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট কমান্ডার সাব্বির আলম সুজন বলেন, নিরাপত্তার ঝুঁকি বিবেচনায় পরিবারটিকে সমুদ্রযাত্রা থেকে নিরুৎসাহিত করা হয়েছিল। তবে তাঁরা সমুদ্রযাত্রার পরিকল্পনা থেকে সরে আসেননি।

কোস্টগার্ডের এই কর্মকর্তা বলেন, এবারের দুর্ঘটনার আগে চলতি বছরের ৭ এপ্রিল বৈরী আবহাওয়ার মধ্যে মহেশখালী চ্যানেল অতিক্রমের সময়ও ‘আইল্যান্ড গার্ল’ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন পরিবারটি সোনাদিয়া দ্বীপে আশ্রয় নেয়। সেখানে রাতে তাঁদের ওপর দুর্বৃত্তরা হামলা করে ক্যামেরা, মুঠোফোন, পাসপোর্ট, ডলারসহ বিভিন্ন মালামাল লুট করে নিয়েছিল। খবর পেয়ে ১০ এপ্রিল কোস্টগার্ড তাঁদের উদ্ধার করে। অভিযান চালিয়ে লুট হওয়া অধিকাংশ মালামালও উদ্ধার করা হয়।

এরপর চলতি বছর ২৫ আগস্ট আবারও নৌযান নিয়ে সমুদ্রে যাত্রা করেন তাঁরা। কক্সবাজার থেকে নিউজিল্যান্ডের সম্ভাব্য সমুদ্রপথ প্রায় ১১ হাজার কিলোমিটার। সেই যাত্রা আর শেষ করতে পারল না পরিবারটি।

পরিবারটির স্থানীয় সহযোগী আবদুর রউফ বলেন, নিজেদের নৌযানে দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা শেষে নিউজিল্যান্ডে পৌঁছানোর পরিকল্পনা ছিল তাঁদের। নৌযান তৈরিতে দেড় কোটি টাকার বেশি খরচ করা হয়েছিল। জেলা প্রশাসনের পর্যটন সেলের ইনচার্জ মাহমুদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, কাঠের তৈরি নৌযানে এ ধরনের সমুদ্রযাত্রার বিষয়ে জেলা প্রশাসন অবগত ছিল না।