পরিকল্পনায় গলদ, ১০ হাজার কোটি টাকা খরচা, বারবার ডুবছে চট্টগ্রাম

চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতা প্রকল্পের আওতায় সংস্কারের ৩৬ খালের তালিকায় নেই কালুরঘাট এলাকার নয়াখাল। ভরাট হয়ে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে পানিপ্রবাহ। গতকাল দুপুর ১২টায়ছবি: সৌরভ দাশ

চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় এক দশক ধরে চলছে বড় বড় প্রকল্প। খাল খনন, খাল সম্প্রসারণ, রেগুলেটর নির্মাণ, সড়ক, বাঁধ—নানা নামে তিন সরকারি সংস্থার চার প্রকল্পে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৪ হাজার কোটি টাকার বেশি। এর মধ্যে খরচ হয়ে গেছে ১০ হাজার কোটি টাকা। লক্ষ্য ছিল, বর্ষা এলেই ডুবে যাওয়া শহরকে জলাবদ্ধতার দুর্ভোগ থেকে মুক্ত করা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, মৌসুমের প্রথম ভারী বৃষ্টিতেই আবার ডুবে গেছে চট্টগ্রাম নগরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা।

গত মঙ্গলবার দুপুরের পর কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে প্রবর্তক, চকবাজার, আগ্রাবাদ, কাতালগঞ্জ, মুরাদপুর, জিইসি, বহদ্দারহাট, হালিশহর, নিউমার্কেট, তিন পুলের মাথাসহ অন্তত ২০টি এলাকা পানির নিচে চলে যায়। কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও কোমরসমান, আবার কোথাও বুকপানি জমে। অনেক এলাকায় পানি নামতে লাগে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা। পরদিন বুধবারও প্রবর্তক, কাতালগঞ্জ, পাঁচলাইশসহ কয়েকটি এলাকায় একই দুর্ভোগ দেখা যায়।

জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত কিচেন এশিয়া রেস্তোরাঁর আসবাবসহ জিনিসপত্র শুকাতে দিচ্ছেন এক কর্মী। গতকাল বৃহস্পতিবার বিকেলে চট্টগ্রাম নগরের প্রবর্তক মোড়ে
ছবি: প্রথম আলো

প্রশ্ন উঠেছে, এত বড় ব্যয়, এত বছর ধরে কাজ, এত সভা, এত সিদ্ধান্ত—তারপরও কেন চট্টগ্রাম নগর বারবার ডুবছে?

আরও পড়ুন

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সমস্যার শুরু প্রকল্পের পরিকল্পনাতেই। জলাবদ্ধতার মতো জটিল সংকট সমাধানে যে ধরনের বিস্তৃত মাঠ সমীক্ষা, পানিপ্রবাহ বিশ্লেষণ, জোয়ার-ভাটা বিবেচনা, খাল-নালা-জলাধারের সমন্বিত মূল্যায়ন দরকার ছিল, তা যথাযথভাবে করা হয়নি। নগরের সব খালকে প্রকল্পের আওতায় আনা হয়নি। ১৯৯৫ সালের ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রস্তাবও বাদ পড়েছে। ফলে প্রকল্প যতই এগোক, পুরো নগরের ড্রেনেজ ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসছে না।

প্রশ্ন উঠেছে, এত বড় ব্যয়, এত বছর ধরে কাজ, এত সভা, এত সিদ্ধান্ত—তারপরও কেন চট্টগ্রাম নগর বারবার ডুবছে?

প্রকল্পগুলো নেওয়া হয় আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। শুরু থেকেই প্রকল্পের পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের নানা আপত্তি ছিল। মাঠ সমীক্ষার ঘাটতি, খাল অন্তর্ভুক্তির সীমাবদ্ধতা ও সমন্বয়ের অভাব নিয়ে সতর্ক করেছিলেন তাঁরা। তবে সেই সময় সরকারের নীতিনির্ধারণী পর্যায় থেকে এসব পরামর্শকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। যে কারণে এখনো নগরবাসী দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।

বৃষ্টিতে সড়কে জমে থাকা পানি ডিঙিয়ে যাচ্ছেন দুই নারী। মঙ্গলবার দুপুরে নগরের তিনপুলের মাথা এলাকায়
ছবি: সৌরভ দাশ

গত এক দশকে আওয়ামী লীগ আমলে মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন সেবা সংস্থার সমন্বয়ে বড় আকারে অন্তত ৫০টি সভা হয়েছে। নেওয়া হয়েছে দুই শতাধিক সিদ্ধান্ত। কিন্তু সিদ্ধান্তগুলোর বড় অংশই কাগজে সীমাবদ্ধ থেকেছে। বিগত অন্তর্বর্তী সরকারও বিষয়টিকে অগ্রাধিকার দিয়ে একাধিক সভা করেছে। উপদেষ্টারা প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তবু মাঠপর্যায়ে দৃশ্যমান পরিবর্তন খুব একটা আসেনি। এখন নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই বিষয়টি জাতীয় সংসদে আলোচনায় উঠেছে।

আরও পড়ুন

গত বুধবার চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান পয়েন্ট অব অর্ডারে জলাবদ্ধতার বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় সমস্যা এখন জলাবদ্ধতা; মানুষ কার্যত পানিতে ভাসছে। তাঁর বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম নগরের বাসিন্দাদের দুর্ভোগের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি জানান, যত দ্রুত সম্ভব এ সমস্যা থেকে মানুষকে মুক্ত করতে সরকার কাজ করছে।

আরও পড়ুন

বড় প্রকল্প, অসম্পূর্ণ পানি নিষ্কাশন

চট্টগ্রাম নগরের প্রবর্তক মোড় পানিতে তলিয়ে গিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েন নগরবাসী। গতকাল বেলা দেড়টায়
ছবি- জুয়েল শীল

চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে বর্তমানে চারটি বড় প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে তিনটি সরকারি সংস্থা। চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) দুটি, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের একটি এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি প্রকল্প মিলিয়ে মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ১৪ হাজার ২৫৭ কোটি টাকা। গত মার্চ পর্যন্ত এসব প্রকল্পে খরচ হয়েছে ১০ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা। কিন্তু কোনো প্রকল্পই এখনো শতভাগ শেষ হয়নি।

এর মধ্যে সবচেয়ে বড় প্রকল্প সিডিএর ‘চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন’। ২০১৭ সালে অনুমোদিত এ প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার কনস্ট্রাকশন ব্রিগেড। কাগজে-কলমে প্রকল্পের অগ্রগতি প্রায় ৯০ শতাংশ। তারপরও নগরের গুরুত্বপূর্ণ এলাকা কেন বারবার বুকসমান পানিতে ডুবছে—এ প্রশ্ন তুলছেন নগরবাসীরা।

গত বুধবার চট্টগ্রাম-১০ আসনের সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান পয়েন্ট অব অর্ডারে জলাবদ্ধতার বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় সমস্যা এখন জলাবদ্ধতা; মানুষ কার্যত পানিতে ভাসছে। তাঁর বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে চট্টগ্রাম নগরের বাসিন্দাদের দুর্ভোগের জন্য দুঃখ প্রকাশ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি জানান, যত দ্রুত সম্ভব এ সমস্যা থেকে মানুষকে মুক্ত করতে সরকার কাজ করছে।

সিডিএর তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রকল্পে ৩৬টি খাল নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ৩০টির কাজ শেষ হয়েছে। বাকি খালগুলোর বেশির ভাগই শেষ পর্যায়ে। তবে হিজড়া খাল ও জামালখান খালের কাজ এখনো চলমান। এসব খালে কাজের জন্য অস্থায়ী বাঁধ দেওয়া হয়েছিল। মৌসুমের প্রথম ভারী বৃষ্টির সময় ওই বাঁধের কারণে পানি চলাচল বাধাগ্রস্ত হয় বলে সিডিএর কর্মকর্তারাই স্বীকার করছেন।

জানতে চাইলে সিডিএর চেয়ারম্যান মো. নুরুল করিম প্রথম আলোকে বলেন, প্রকল্পের কিছু সুফল ইতিমধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। গত বছর আগের তুলনায় কম এলাকায় জলাবদ্ধতা হয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, সব খাল একসঙ্গে নেওয়া সম্ভব হয়নি। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে প্রথম ধাপে ৩৬টি খাল নেওয়া হয়েছে। বাকি খালগুলো পর্যায়ক্রমে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তিনি বলেন, সেনাবাহিনীর সহায়তা না থাকলে অনেক জায়গায় কাজ এগোনো কঠিন হতো। তবে প্রকল্প শেষ হলেও শহরের ২০-২৫ শতাংশ এলাকায় জলাবদ্ধতা থেকে যাবে। সে জন্য প্রকল্পের বাইরে থাকা খালগুলো খনন ও সম্প্রসারণ করতে হবে।

প্রকল্পের কিছু সুফল ইতিমধ্যে পাওয়া যাচ্ছে। গত বছর আগের তুলনায় কম এলাকায় জলাবদ্ধতা হয়েছে। তবে তিনি স্বীকার করেন, সব খাল একসঙ্গে নেওয়া সম্ভব হয়নি। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারণে প্রথম ধাপে ৩৬টি খাল নেওয়া হয়েছে।
সিডিএর চেয়ারম্যান মো. নুরুল করিম

প্রকল্পের বাইরে ৩৮ খাল

দোকানে ঢুকে পড়েছে পানি। তা সেচে বের করার চেষ্টায় দোকানি। মঙ্গলবার দুপুরে নগরের রেয়াজুদ্দিন বাজারে
ছবি: সৌরভ দাশ

জলাবদ্ধতা নিরসনের বড় প্রকল্প চললেও নগরের সব খাল সেই উদ্যোগের আওতায় আসেনি। সিডিএ বলছে, চট্টগ্রাম নগরে ছোট-বড় ৭৪টি খাল আছে। এর মধ্যে ৬১টি খাল নিয়ে বিভিন্ন সময়ে পরিকল্পনা করা হয়েছে। কিন্তু বড় প্রকল্পে নেওয়া হয়েছে মাত্র ৩৬টি খাল। অর্থাৎ বাকি ৩৮টি খাল এখনো প্রকল্পের বাইরে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব খাল অবহেলিত থাকলে প্রকল্পের পুরো সুফল নগরবাসী পাবে না।

গতকাল বৃহস্পতিবার কালুরঘাট এলাকার ফরেস্ট খাল, নয়াখাল, কৃষ্ণখালি খাল ও কুয়াইশ খাল ঘুরে অবস্থা নাজুক দেখা যায়। একসময় যেসব খাল দিয়ে জোয়ার-ভাটার পানি চলাচল করত, বৃষ্টির পানি দ্রুত নেমে যেত, সেগুলোর অনেকটাই এখন সরু নালায় পরিণত হয়েছে। কোথাও খালের বুকজুড়ে পলির স্তর, কোথাও প্লাস্টিক, পলিথিন, বোতল ও গৃহস্থালি আবর্জনার স্তূপ। পানির প্রবাহ এতটাই কমে গেছে যে কিছু অংশে পানি প্রায় স্থির হয়ে আছে।

খালের পানির রং কালচে। দুর্গন্ধে দাঁড়িয়ে থাকা কঠিন। পাশের কলকারখানার বর্জ্য মিশে পানি আরও ঘন ও দূষিত হয়ে উঠেছে। কোথাও পানির ওপর ভাসছে পচা ময়লা, কোথাও শেওলা জমে পানির মুখ বন্ধ হয়ে গেছে। খালের দুই পাশে দখলও স্পষ্ট। কোথাও কোথাও পাকা স্থাপনা, কোথাও কারখানার বর্জ্য ফেলার পাইপ খালের দিকে মুখ করে আছে। খালের জায়গা সংকুচিত হয়ে পানির পথ সরু হয়েছে। বৃষ্টি হলেই এসব খাল উপচে পানি সড়ক ও বসত এলাকায় ঢুকে পড়ে।

গতকাল বৃহস্পতিবার কালুরঘাট এলাকার ফরেস্ট খাল, নয়াখাল, কৃষ্ণখালি খাল ও কুয়াইশ খাল ঘুরে অবস্থা নাজুক দেখা যায়। একসময় যেসব খাল দিয়ে জোয়ার-ভাটার পানি চলাচল করত, বৃষ্টির পানি দ্রুত নেমে যেত, সেগুলোর অনেকটাই এখন সরু নালায় পরিণত হয়েছে। কোথাও খালের বুকজুড়ে পলির স্তর, কোথাও প্লাস্টিক, পলিথিন, বোতল ও গৃহস্থালি আবর্জনার স্তূপ।

মোহরা এলাকায় কৃষ্ণখালি খালের পাশে দাঁড়িয়ে স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ সারওয়ার বলেন, এ খালে একসময় মাছ ধরা যেত। জোয়ারের পানি ঢুকত, ভাটায় নেমে যেত। খালের প্রশস্ততাও ছিল বেশি। এখন খালটি প্রায় মৃত। দুই পাশের ভবন ও প্রতিষ্ঠান থেকে আবর্জনা ফেলা হচ্ছে।

শুধু সিডিএর তালিকাভুক্ত খাল নয়, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম কার্যালয়ও নগরের আরও কিছু খালের তালিকা করেছে। এর মধ্যে পাঁচলাইশের কাজির বিল খাল, পতেঙ্গার মুসলিমাবাদ খাল ও চারপাড়া খাল দ্রুত খনন করা দরকার বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

নগরের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার মূল ভরসা খালগুলো। সড়ক, বসতি, বাণিজ্যিক এলাকা ও নিম্নাঞ্চল থেকে বৃষ্টির পানি খালের মাধ্যমে নদী বা বড় জলাধারে যায়। কিন্তু খাল ভরাট, দখল বা আবর্জনায় বন্ধ হয়ে গেলে পানি নামার পথ থাকে না। তখন সামান্য বৃষ্টিতেও জলাবদ্ধতা তৈরি হয়।

নকশার ‘ত্রুটি’, রক্ষণাবেক্ষণে ঘাটতি

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সিডিএর জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের বড় সীমাবদ্ধতা হলো এটি পূর্ণাঙ্গ নয়। নগরের সব খালকে একসঙ্গে বিবেচনায় নেওয়া হয়নি। ১৯৯৫ সালে প্রণীত ‘চিটাগাং স্টর্ম ওয়াটার ড্রেনেজ অ্যান্ড ফ্লাড কন্ট্রোল মাস্টারপ্ল্যান’ বা ড্রেনেজ মহাপরিকল্পনায় জলাবদ্ধতা নিরসনের জন্য যে সুপারিশ ছিল, তার অনেক কিছুই বর্তমান প্রকল্পে উপেক্ষিত হয়েছে।

ওই মহাপরিকল্পনায় তিনটি নতুন মূল খাল ও ১৫টি নতুন শাখা খাল খননের প্রস্তাব ছিল। বিদ্যমান মূল ও শাখা খাল সংস্কার, দখলমুক্ত করা, কর্ণফুলী নদী ও বঙ্গোপসাগরের সঙ্গে যুক্ত খালের মুখে ৩৬টি টাইডাল রেগুলেটর স্থাপন, পাহাড়ি বালু ঠেকাতে ১৯টি সিল্ট ট্র্যাপ নির্মাণ এবং বৃষ্টি বা জোয়ারের পানি ধারণে আটটি জলাধার সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান প্রকল্পে রিটেনশন পন্ড বা জলাধার সংরক্ষণের বিষয়টি কার্যত বাদ পড়েছে। এতে অতিরিক্ত পানি ধরে রাখার সুযোগ কমে গেছে।

গত বছর ২৯টি স্থানে পানি জমেছিল, বেশির ভাগ জায়গায় ২ থেকে ৪ ঘণ্টার মধ্যে পানি নেমে যায়। চলতি বছর জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকা ১০টিতে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ছিল। কিন্তু হিজড়া ও জামালখান খালে বাঁধ থাকার কারণে মৌসুমের প্রথম ভারী বৃষ্টিতেই অন্তত ২০টি এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। বাঁধ সরানো গেলে পানি নামার পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হতে পারে বলে সিডিএর কর্মকর্তারা আশা করছেন।

সিডিএর তথ্য অনুযায়ী, প্রকল্প শুরুর আগে নগরের ১১৩টি এলাকায় সর্বোচ্চ ৮ থেকে ৯ ঘণ্টা পানি জমে থাকত। পরে জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকা ও পানি জমে থাকার সময় কিছুটা কমে আসে। গত বছর ২৯টি স্থানে পানি জমেছিল, বেশির ভাগ জায়গায় ২ থেকে ৪ ঘণ্টার মধ্যে পানি নেমে যায়। চলতি বছর জলাবদ্ধতাপ্রবণ এলাকা ১০টিতে নামিয়ে আনার লক্ষ্য ছিল। কিন্তু হিজড়া ও জামালখান খালে বাঁধ থাকার কারণে মৌসুমের প্রথম ভারী বৃষ্টিতেই অন্তত ২০টি এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। বাঁধ সরানো গেলে পানি নামার পরিস্থিতি কিছুটা উন্নত হতে পারে বলে সিডিএর কর্মকর্তারা আশা করছেন।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ রাশিদুল হাসান বলেন, জলাবদ্ধতা সমস্যাকে আলাদা আলাদা প্রকল্প দিয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়; এটি একটি সমন্বিত নগর ব্যবস্থাপনার বিষয়। তাঁর মতে, পরিকল্পনা, বাস্তবায়ন এবং রক্ষণাবেক্ষণের মধ্যে কার্যকর সমন্বয় না থাকলে যেকোনো প্রকল্পই দীর্ঘ মেয়াদে অকার্যকর হয়ে পড়বে। খাল খনন বা অবকাঠামো নির্মাণের পাশাপাশি সেগুলোর নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে দায়িত্ব বণ্টন ও সমন্বয় নিশ্চিত করা জরুরি। তা না হলে জলাবদ্ধতার এই দুর্ভোগ থেকে নগরবাসীকে মুক্ত করা কঠিন হবে।

জলাবদ্ধতা সমস্যাকে আলাদা আলাদা প্রকল্প দিয়ে সমাধান করা সম্ভব নয়; এটি একটি সমন্বিত নগর ব্যবস্থাপনার বিষয়।
চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (চুয়েট) নগর ও অঞ্চল পরিকল্পনা বিভাগের অধ্যাপক মুহাম্মদ রাশিদুল হাসান

প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্য নিয়ে ক্ষোভ

চট্টগ্রাম নগরে প্রবর্তক মোড় পরিদর্শন করেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। এ সময় সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। গতকাল রাত ৮টায়
ছবি: জুয়েল শীল

গত মঙ্গলবার জলাবদ্ধতার একাধিক ছবি ও ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। পরদিন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি পরিদর্শনে এসে বিতর্কিত মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং আমার মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী আমাকে সরেজমিন দেখার নির্দেশ দিয়েছেন। আমি এসে দেখলাম এবং আবারও বলছি, চট্টগ্রাম নগরী পানির ওপর ভাসছে না। চট্টগ্রাম নগরী শুষ্ক মৌসুমে যেমন থাকে, এখনো তেমনই আছে।’

মন্ত্রী আরও বলেন, ‘হঠাৎ অতিবৃষ্টির কারণে কিছুটা পানি জমলেও সঠিক সময়ে পানি আবার নিষ্কাশিত হয়ে গেছে। আমি নিজে হেঁটে যে পানির মধ্য দিয়ে এসেছি, সেটি সর্বোচ্চ ৩০ ফুট জায়গা।’

আরও পড়ুন

মন্ত্রীর এই বক্তব্য ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়লে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া জানান ব্যবহারকারীরা। নাগরিকদের ভাষ্য, দুদিন ধরে পানিতে ডুবে থাকা মোড়ে প্রতিমন্ত্রী এসেছেন সন্ধ্যায়। এসে তিনি জলাবদ্ধতা সম্পর্কে যা বলেছেন, তা সঠিক নয়। মো. নুরুননবি জুয়েল নামের এক ফেসবুক ব্যবহারকারী লিখেছেন, ‘চট্টগ্রাম পানির ওপর ভাসছে না, পানি চট্টগ্রামের ওপর ভাসছে।’

পরদিন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি পরিদর্শনে এসে বিতর্কিত মন্তব্য করেন। তিনি বলেন, ‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবং আমার মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী আমাকে সরেজমিন দেখার নির্দেশ দিয়েছেন। আমি এসে দেখলাম এবং আবারও বলছি, চট্টগ্রাম নগরী পানির ওপর ভাসছে না। চট্টগ্রাম নগরী শুষ্ক মৌসুমে যেমন থাকে, এখনো তেমনই আছে।’

১৯ সদস্যের কমিটি

জলাবদ্ধতা সমস্যা সমাধানে গতকাল ১৯ সদস্যের একটি সমন্বয় কমিটি গঠন করেছে সরকার। স্থানীয় সরকার বিভাগের এক আদেশে জানানো হয়, কমিটিতে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়রকে আহ্বায়ক এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তাকে সদস্যসচিব করা হয়েছে। কমিটির প্রধান কাজ হবে খাল ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা সচল রাখা, জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পগুলোর অগ্রগতি তদারকি করা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা। কমিটিতে সেনাবাহিনীর ৩৪ ইঞ্জিনিয়ার ব্রিগেড, সিডিএ, সিটি করপোরেশন, পানি উন্নয়ন বোর্ড, ওয়াসা, বন্দর কর্তৃপক্ষসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সংস্থার প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।