শিশুকে হত্যার পর বস্তায় ভরে লুকিয়ে রাখা হয় সেপটিক ট্যাংকে
ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় আট বছর বয়সী এক শিশুকে হত্যার পর মরদেহ বস্তায় ভরে সেপটিক ট্যাংকে ফেলে রাখেন প্রতিবেশী কলেজছাত্র। সন্দেহভাজন হিসেবে ওই তরুণকে আজ শনিবার দুপুরে আটকের পর জিজ্ঞাসাবাদে হত্যার কথা স্বীকার করলে তাঁর দেখানো স্থান থেকে দুপুরে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
নিহত শিশুটির নাম আন্দালিভ সাদমান ওরফে রাফি। সে মুক্তাগাছা উপজেলার বাঁশাটি ইউনিয়নের জমিনপুর গ্রামের ব্যবসায়ী জহিরুল ইসলাম ও পাপিয়া সুলতানা দম্পতির সন্তান। এক ভাই ও এক বোনের মধ্যে সে বড়। স্থানীয় রেসিডেন্সিয়াল মাদ্রাসায় দ্বিতীয় শ্রেণিতে পড়ালেখা করত শিশুটি।
হত্যায় অভিযুক্ত তরুণ খোকন মিয়া (২১) শিশুটির প্রতিবেশী। তিনি ওই গ্রামের আবদুল বারেকের ছেলে এবং স্থানীয় একটি কলেজে উচ্চমাধ্যমিক দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী।
পুলিশ ও নিহতের স্বজনেরা জানান, শিশু আন্দালিভ সাদমান প্রতিদিন সকাল সাতটার দিকে মাদ্রাসায় গিয়ে বেলা ১১টার দিকে বাড়িতে ফিরে আসে। গতকাল শুক্রবার মাদ্রাসা থেকে বাড়িতে না ফেরায় তার খোঁজ শুরু হয়। মাদ্রাসায় গিয়ে শিশুটিকে না পাওয়ায় আশপাশে খোঁজ করা শেষে এলাকায় মাইকিং করা হয় এবং রাতে থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করে পরিবার।
জিডির বিষয়টি নিয়ে পুলিশ আজ শনিবার দুপুরে এলাকায় তদন্ত করতে যায়। এ সময় শিশুটির পরিবারের সদস্যরা সন্দেহভাজন হিসেবে প্রতিবেশী কলেজছাত্র খোকন মিয়ার নাম বলে। খোকন কয়েক দিন ধরেই পাখির বাচ্চা দেবেন বলে শিশুটিকে তাঁর সঙ্গে ঘুরতে যেতে বলতেন। বিষয়টি পরিবারের সদস্যদের জানিয়েছিল শিশুটি।
পরিবারের সন্দেহের ভিত্তিতে বেলা একটার দিকে পুলিশ খোকন মিয়াকে নিজ বাড়ি থেকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য থানায় নিয়ে যায়। পরে পুলিশ হেফাজতে শিশুটিকে হত্যার পর লাশ বস্তায় ভরে সেপটিক ট্যাংকে ফেলে রাখার তথ্য দিলে পুলিশ বেলা আড়াইটার দিকে ঘটনাস্থলে গিয়ে শিশুটির মরদেহ উদ্ধার করে।
শিশুটির মরদেহ উদ্ধারের পর কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনেরা। মা পাপিয়া সুলতানা জানান, ‘কয়েক দিন ধরে তাঁর ছেলেকে পাখির বাচ্চা দেওয়ার কথা বলে খোকন তার সঙ্গে নিতে চেয়েছিল; কিন্তু পরীক্ষার কারণে ছেলেকে নিতে পারছিল না।’
পাপিয়া বলেন, ‘শুক্রবার জুমার আগে ফাঁকা পেয়ে আমার ছেলেকে নিয়ে যায়। আমরা জুমার নামাজের আগে ও পরে ছেলেকে খোঁজাখুঁজি শুরু করে না পেয়ে নিশ্চিত হই সে নিখোঁজ। তারপর খোকনের ওপর আমাদের সন্দেহ হয়; কিন্তু সে স্বীকার করছিল না, পারিবারিক কোনো শত্রুতাও ছিল না। আমরা ভাবতে পারিনি ছেলেকে এভাবে মেরে ফেলবে। আমার ছেলেকে যেভাবে নির্মভাবে হত্যা করেছে, আমি চাই, খোকনের কঠিন বিচার হোক।’
ছেলের লাশ বুকে নিয়ে আহাজারি শুরু করেন জহিরুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘খোকন মিয়া অনলাইন জুয়ায় আসক্ত ছিল। একটি সাইটে খোকনের ১ লাখ ১২ হাজার টাকা আটকে যাওয়ায় সেটি তুলতে না পারায় আমার সহযোগিতা চায়। টাকা তুলে দেওয়ার শর্ত ছিল—খোকন ১২ হাজার নেবে, বাকি টাকা আমাদের থাকবে। আমরা অনেক চেষ্টা করে সাইট থেকে মাত্র ২৪ হাজার টাকা পাই। ১২ হাজার টাকা সে নিয়ে গেলেও আরও টাকা চাইতে থাকে। এর জের ধরেই আমার ছেলেকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে।’
স্বজনেরা জানান, জুয়ার টাকা উদ্ধারের পর খোকন ভাগ দিতে চাইছিলেন না কাউকে। এ নিয়ে বিরোধে শিশুকে গুম করে মুক্তিপণ আদায়ের পরিকল্পনা ছিল। সে জন্য ঢাকায় এক ব্যক্তির কাছে বাচ্চা রাখার জায়গাও খুঁজেছিলেন খোকন।
মুক্তাগাছা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. কামরুল ইসলাম বলেন, শিশুটির বাবার সঙ্গে খোকন মিয়ার পাওনা টাকা নিয়ে এক মাস আগে একটি ঝগড়া হয়। টাকা না পাওয়ার ক্ষোভে শিশুটিকে হত্যা করার কথা প্রাথমিকভাবে জানিয়েছে আটক তরুণ। শিশুটিকে শ্বাসরোধে হত্যার পর লাশ বস্তায় ভরে সেপটিক ট্যাংকে ফেলে রাখা হয়। বিস্তারিত জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। খোকনের দেওয়া তথ্যে মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। লাশ ময়মনাতদন্তের জন্য মর্গে পাঠানো হয়েছে। এ ঘটনায় প্রয়োজনীয় আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।