পৌরসভা ও বিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, মৌলভীবাজার পৌর এলাকার ১৪টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে করোনাকালে ক্ষতিগ্রস্ত শিশুদের চিকিৎসার এ কার্যক্রম গ্রহণ করে পৌর কর্তৃপক্ষ। কার্যক্রমটি সফল করতে গত সোমবার বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে পৌরসভার সভাকক্ষে একটি বৈঠক হয়। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী বুধবার থেকে পৌর মেয়র মো. ফজলুর রহমান চিকিৎসকদের নিয়ে বিদ্যালয়গুলোতে ছুটে যান। বৃহস্পতিবার এ কার্যক্রম শেষ হয়। শিশুদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন শিশু মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আবদুল্লাহ জিয়াদ, শিশুরোগ বিশেষজ্ঞ বিশ্বজিৎ দেব, চিকিৎসক সুমাইয়া আক্তার, ফারহানা হক, শান্তা সাহা ও পরিতোষ কুমার শীল।

বৃহস্পতিবার দুপুরে বাজার মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা গেছে, একটি শ্রেণিকক্ষে চিকিৎসকেরা শিশুদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করছেন। তাঁরা শিশুদের সমস্যার কথা জানার চেষ্টা করছেন। অভিভাবকদের সঙ্গে কথা বলে তাঁরা সমস্যা চিহ্নিত করে ব্যবস্থাপত্র ও পরামর্শ দিচ্ছেন। এ সময় চিকিৎসকদের পাশাপাশি পৌর মেয়র, বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির কর্মকর্তারাও উপস্থিত ছিলেন।

শিক্ষক, অভিভাবক ও চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, করোনার পর অনেক শিশু স্বাভাবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত আচরণ করছে না। অনেকে বিদ্যালয়ে চুপচাপ থাকে। অভিভাবকদের সঙ্গেও ভালো করে মিশছে না। করোনার সময় অনেকে মুঠোফোনে গেম খেলায় আসক্ত হয়ে গেছে। খাবারেও অরুচি দেখা দিয়েছে তাদের। ১৪টি বিদ্যালয়ে ঘুরে চিকিৎসকেরা নানা সমস্যাগ্রস্ত শতাধিক শিশুশিক্ষার্থী পেয়েছেন।

মনোরোগ বিশেষজ্ঞ আবদুল্লাহ জিয়াদ প্রথম আলোকে বলেন, স্বাস্থ্য পরীক্ষায় বেশ কিছু শিশু পাওয়া গেছে, যাদের মধ্যে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধিতা আছে। তাদের ইনডেপথ চিকিৎসা দরকার। এ নিয়ে মানসিক স্বাস্থ্যবিষয়ক কর্মশালা দরকার। এ ছাড়া হঠাৎ কিছু বাচ্চার চঞ্চলতা কমে গেছে। পড়ালেখায় অনাগ্রহী, সামাজিক যোগাযোগেও তাদের অনিচ্ছা।

বাজার মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক প্রযুক্তি মোদক বলেন, তাঁর বাচ্চা একেবারে পড়তে চায় না। মর্জি হলে পড়ে, না হলে পড়ে না। আরেক অভিভাবক জবা দেব রায় বলেন, ‘কথা একেবারে কম বলে। যেকোনো কিছুর রক্ত দেখলে ভয় পায়। মাথা ঘুরে পড়ে যায়।’

বাজার মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রোহেনা আক্তার খানম প্রথম আলোকে বলেন, অনেক শিক্ষার্থী করোনার পর থেকে বিদ্যালয়ে আসতে চায় না। মা ছাড়া অনেকে ক্লাসে বসতে চায় না। আগে এমন ছিল না। আগে যারা ঠিকমতো পড়ত, তাদের অনেকে এখন অন্যমনস্ক। শিশুরা আগে যেমন স্বাভাবিকভাবে চলাফেরা করত, করোনার পর তাদের সেই স্বতঃস্ফূর্ততা নেই।

শহরের আলী আমজদ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক পূর্ণা রায় ভৌমিক জানালেন, তাঁর বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির এক শিক্ষার্থী আগে স্কুলে আসত না। রাতে ঘরের বাইরে চলে যেত। হাঁস-মুরগির বাচ্চা মেরে ফেলত। তবে বৃহস্পতিবার স্কুলে নিয়ে আসার পর সে ভালো আচরণ করছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের স্কুলে ১২ জনের মতো শিক্ষার্থী বাছাই করা হয়েছে, যাদের মানসিক সমস্যা প্রবল। আমি মনে করি, এ ক্ষেত্রে অভিভাবকদেরও মানসিক স্বাস্থ্য চিকিৎসা জরুরি।’

মৌলভীবাজার পৌরসভার মেয়র মো. ফজলুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, অনেক শিশুর চোখে সমস্যা। তাদের চোখ ফোলা। করোনার সময় তিন-চার ঘণ্টা মুঠোফোন ব্যবহারের কারণে এমন হয়েছে বলে মনে হচ্ছে। কিছু বাচ্চা একা একা হাসে। তাদের নার্সিং দরকার। করোনার সময়ে গরিব পরিবারের বাচ্চাদেরই বেশি সমস্যা হয়েছে। তিনি বলেন, চক্ষু হাসপাতালের সঙ্গে কথা বলে বিদ্যালয়ে ক্যাম্প করে মনোরোগ বিশেষজ্ঞ দিয়ে নার্সিং করানোর পরিকল্পনা আছে তাঁদের।