পাটের আঁশে লাভের আশা

জলাবদ্ধ নিচু জমিতে পাট জাগ দেওয়ার উপযোগী পরিবেশ তৈরি হওয়ায় স্বস্তি ফিরেছে কৃষকদের মাঝে। সাতক্ষীরা-যশোর সড়কের পাশের বিলেছবি : ইমতিয়াজ উদ্দীন

কোথাও জমে থাকা পানিতে পাট জাগ দেওয়া হচ্ছে, কোথাও কোমরসমান পানিতে নেমে পাটের আঁশ ছাড়ানো হচ্ছে। আবার কোথাও গ্রামের পিচঢালা সড়কের ওপর সারি করে ভেজা পাটের সোনালি আঁশ শুকাতে দেওয়া হয়েছে। রোদের তাপে শুকিয়ে ওঠা আঁশগুলো উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। সাতক্ষীরা সদর, তালা ও কলারোয়া উপজেলার গ্রামে গেলে এমন দৃশ্য চোখে পড়বে।

পাট কাটার পর ১৫ থেকে ২০ দিন পানিতে জাগ দিয়ে রাখলে আঁশ ছাড়ানোর উপযোগী হয়। বেশির ভাগ কৃষক এখন পাটের আঁশ ছাড়ানোর কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন। কোথাও পাটকাঠি বড় বড় আঁটি করে খাড়াভাবে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। আবার কোথাও ভ্যানগাড়িতে পাটের বোঝা তুলে বাজারের দিকে যাচ্ছেন কৃষকেরা।

সাতক্ষীরা-যশোর সড়কের পাশে তুজলপুর এলাকায় গতকাল সোমবার দুপুরে পাটের আঁটি বাঁধছিলেন কৃষক মোহাম্মদ আবদুল করিম। তিনি বলেন, ১৮ দিন পানিতে জাগ দিয়ে রেখেছিলেন পাট। তিন-চার দিন হলো পাট থেকে আঁশ ছাড়িয়েছেন। এখন আঁটি বেঁধে শুকাচ্ছেন। ধান কাটার পর জমিতে পাট লাগিয়েছিলেন। খরচ বাদ দিয়ে এবার ভালো লাভ হবে বলে আশা করছেন তিনি।

এবার জেলায় পাটের আবাদ ও উৎপাদন সন্তোষজনক হয়েছে। এখনো কয়েকটি এলাকায় পাট কাটা চলছে।
মো. সাইফুল ইসলাম, উপপরিচালক, সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর

সাতক্ষীরা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, চলতি মৌসুমে জেলার সাতটি উপজেলায় মোট ১১ হাজার ৬৭৫ হেক্টর জমিতে পাটের আবাদ হয়েছে। গত বছর ১১ হাজার ৬০৭ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছিল। এক বছরের ব্যবধানে আবাদ বেড়েছে ৬৮ হেক্টর। এসব জমি থেকে প্রায় ১ লাখ ৪২ হাজার বেল (গাঁট বা বান্ডিল) পাট উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রতি বেলে প্রায় ১৮২ কেজি পাট থাকে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. সাইফুল ইসলাম প্রথম আলো বলেন, এবার জেলায় পাটের আবাদ ও উৎপাদন সন্তোষজনক হয়েছে। এখনো কয়েকটি এলাকায় পাট কাটা চলছে। কৃষকেরা প্রতি বিঘায় ১২ থেকে ১৫ মণ ফলনের কথা জানিয়েছেন। পাটের পাতা মাটির উর্বরতা শক্তি বাড়ায় এবং আঁশ ও পাটকাঠি বিভিন্ন কাজে ব্যবহার করা যায়। তবে জেলায় পাটভিত্তিক কোনো শিল্প না থাকায় উৎপাদিত পাট স্থানীয় বাজারের পাশাপাশি জেলার বাইরেও বিক্রি হয়।

গতকাল সকালে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার মাধবকাঠি এলাকায় এক নারীকে পাটের আঁশ শুকানোর জন্য সড়কের ওপর মেলে দিতে দেখা যায়। ২০ দিন পানিতে জাগ দেওয়ার পর আঁশ ছাড়িয়ে এখন তা শুকাচ্ছেন তিনি।

একই সড়কের পাশে বিলের পানিতে বসে পাটের আঁশ ছাড়াচ্ছিলেন তিনজন কৃষক। তাঁদের একজন আসাদুল সরদার। তিনি বলেন, ১১ শতক জমিতে পাট চাষ করতে বাজার থেকে ৩০০ গ্রাম বীজ কিনে বুনেছিলেন। প্রায় দুই মণ পাট হয়েছে। পাটকাঠিও পেয়েছেন। প্রতি আঁটি পাটকাঠি ৬০ থেকে ১০০ টাকায় বিক্রি করতে পারবেন।

সাতক্ষীরার সদর, তালা ও কলারোয়া উপজেলার সাতজন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার পাটখেতে রোগবালাইয়ের প্রকোপ কম ছিল। সাধারণত পাটে ছত্রাকজনিত গোড়া পচা, পাতা শুকিয়ে যাওয়া ও বিছা পোকার আক্রমণ দেখা দেয়। এবার এসব রোগবালাই তুলনামূলক কম হয়েছে।

আমি প্রতিবছর দুই বিঘা জমিতে পাট চাষ করি। গত বছর ২৫ মণ পাট পেয়েছিলাম। এবার ফলন ভালো হয়েছে। প্রায় ৩০ মণ পাট হবে বলে আশা করছি।
আবুল হোসেন, কৃষক

গত রোববার কলারোয়া উপজেলার ঝাপাঘাট গ্রামের সড়কের পাশে একটি ডোবার পাড়ে বসে পাটের আঁশ ছাড়াচ্ছিলেন কৃষক কিবরিয়া সরদার। তিনি বলেন, পাঁচ কাঠা জমিতে পাট চাষ করেন। ৩৪ আঁটি পাটকাঠি হয়েছে। আর পাট হবে আড়াই থেকে তিন মণ। সব মিলিয়ে চাষ ও পাট ধোয়া বাবদ প্রায় পাঁচ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। পাট ও পাটকাঠি বিক্রি করে এবার লাভ থাকবে।

গত বছর রোগবালাই বেশি ছিল, বারবার পাটখেতে কীটনাশক দিতে হয়েছে বলে জানান তালা উপজেলার ইসলামকাটি এলাকার কৃষক আকবার আলী। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, এবার আবহাওয়া ভালো থাকায় ফলন ভালো হয়েছে। বাজারে পাটের দামও ভালো।

পাট ছাড়ানোর পর পাটের আঁশ শুকাতে দেওয়ার পাশাপাশি জ্বালানি হিসেবে ব্যবহারের জন্য পাটকাঠিগুলো সুন্দর করে সাজিয়ে রেখেছেন কৃষকেরা। সাতক্ষীরা সদর উপজেলার মাধবকাঠি এলাকায়
ছবি: প্রথম আলো

একই কথা বলেছেন কলারোয়ার হেলাতলা এলাকার কৃষক আবুল হোসেন। তিনি বলেন, ‘আমি প্রতিবছর দুই বিঘা জমিতে পাট চাষ করি। গত বছর ২৫ মণ পাট পেয়েছিলাম। এবার ফলন ভালো হয়েছে। প্রায় ৩০ মণ পাট হবে বলে আশা করছি।’

কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বর্তমানে মানভেদে প্রতি মণ পাট ৩ হাজার ২০০ থেকে ৩ হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এ দাম নিয়ে কৃষকেরা মোটামুটি সন্তুষ্ট। গত বছরও পাটের দাম কাছাকাছি ছিল। মৌসুমের শুরুতে প্রতি মণ পাট ৩ হাজার ৪০০ থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা বিক্রি হয়েছিল। আর মৌসুমের শেষের দিকে ৪ হাজার থেকে ৪ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হয়েছিল।

সাতক্ষীরা জেলা কৃষি বিপণন কর্মকর্তা সালেহ্ মোহাম্মাদ আবদুল্লাহ বলেন, সাতক্ষীরার পাটকেলঘাটা এলাকায় পাটের বড় বাজার আছে। এ ছাড়া ব্যবসায়ীরা গ্রামে গ্রামে গিয়ে কৃষকদের কাছ থেকে পাট কিনছেন। এখন কৃষকেরা বিভিন্ন মাধ্যমে বাজারদর জানতে পারেন।