মাদ্রাসার শিশু শিক্ষার্থীকে সংকটাপন্ন অবস্থায় হাসপাতালে ভর্তি, যৌন নির্যাতনের আলামত

শিশু নির্যাতনপ্রতীকী ছবি

মাদ্রাসার এক শিশুশিক্ষার্থীকে (১০) সংকটাপন্ন অবস্থায় রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। শিশুটিকে হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) রেখে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। প্রাথমিক গাইনি পরীক্ষায় শিশুটিকে যৌন নির্যাতনের আলামত পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকেরা।

এ ঘটনায় পুলিশ মাদ্রাসার পরিচালককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে। কুষ্টিয়ার ভেড়ামাড়া থানায় শিশুটির মা লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। সোমবার রাত সোয়া ১১টায় ভেড়ামারা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) রাকিবুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, শিশুটিকে নির্যাতনের ঘটনায় আইনি ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। জিজ্ঞাসাবাদের জন্যই ইতিমধ্যে একজনকে আটক করা হয়েছে।

হাসপাতালে শিশুটির সঙ্গে রয়েছেন তার মা। তাদের বাড়ি কুষ্টিয়ায়। তিনি জানান, তাঁর মেয়েশিশুকে সাত-আট মাস আগে কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার একটি কওমি মাদ্রাসায় ভর্তি করেছিলেন। ওই মাদ্রাসার নিচতলায় পরিচালক তাঁর পরিবার নিয়ে থাকেন। আর দোতলায় মাদ্রাসার শিশুশিক্ষার্থীদের রাখা হয়। খাওয়াদাওয়ার জন্য তাদের নিচে আনা হয়।

শিশুটির মায়ের ভাষ্য, মেয়েকে ভর্তির পরই তিনি খবর পেয়েছিলেন মাদ্রাসায় শিশুদের নির্যাতন করা হয়। তাই দুই–তিন মাস আগে মেয়ের ভর্তি বাতিল করতে গিয়েছিলেন। কিন্তু মাদ্রাসার পরিচালকের স্ত্রী তাঁকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে সেখানেই মেয়ে ভালো থাকবে আর কোনো ঝামেলা হবে না। আশ্বাস পেয়ে তিনি মেয়েকে রেখে আসেন। এর মধ্যে গত শুক্রবার সন্ধ্যায় মেয়ের সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়। মেয়ে জানিয়েছিল ঈদের ছুটিতে তাঁকে মাদ্রাসা থেকে নিয়ে যাওয়ার জন্য।

মা গতকাল রোববার মেয়েকে আনতে মাদ্রাসায় গিয়েছিলেন। গিয়ে দেখেন মেয়ের অবস্থা সংকটাপন্ন, পেট ফুলে গেছে। কোনো এক আঘাতের কারণে বাঁ পা ও ফুলে গেছে। মেয়েকে নিয়ে হাসপাতালে যেতে চাইলে মাদ্রাসার পরিচালকের স্ত্রী বলেন, ‘আপনার মেয়ের কিছুই হয়নি, বাড়িতে নিয়ে যান।’

পরে সেখান থেকে মেয়েকে নিয়ে কুষ্টিয়ায় একটি রোগনির্ণয় কেন্দ্রে আলট্রাসনোগ্রাম করেন মা। তখন জানতে পারেন মেয়ের অবস্থার অবনতি হচ্ছে। পরে সোমবার সকালে তিনি মেয়েকে নিয়ে এসে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ওয়ান–স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে ভর্তি করেন। সেখানে পরীক্ষা-নিরীক্ষা জন্য মেয়েকে হাসপাতালের গাইনি ওয়ার্ডে পাঠানো হয়।

সোমবার দুপুরে হাসপাতালে গিয়ে দেখা যায়, মেয়েটির মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগানো রয়েছে। শ্বাসকষ্টের কারণে সে কথা বলতে পারছে না। কর্তব্যরত চিকিৎসক জানান, মেয়েশিশুটির অক্সিজেন স্যাচুরেশন কমে যাচ্ছিল। অক্সিজেন দেওয়ার পর স্বাভাবিক অবস্থায় থাকছে।

পরে রাত সোয়া ১১টায় মেয়েটির বাবা জানান, অবস্থার অবনতি হওয়ায় চিকিৎসকরা মেয়েকে আইসিইউতে নিয়ে গেছেন।

শিশুটির শারীরিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মুখপাত্র শংকর কে বিশ্বাস বলেন, বাচ্চাটি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। নিজে থেকে কিছু বলছে না। তবে প্রাথমিক অবস্থায় যৌন নির্যাতনের আলামত পাওয়া গেছে। নিশ্চিতকরণের জন্য ইতিমধ্যে আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে এবং আরও নিশ্চিত পরীক্ষা–নিরীক্ষার জন্য বাচ্চাটিকে গাইনি বিভাগে স্থানান্তর করা হয়েছে।

গাইনি পরীক্ষার প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, শিশুটির সতীচ্ছদ পর্দা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। শংকর কে বিশ্বাস বলেন, যোনিপথ ছিঁড়ে যাওয়ার ঘটনা ধর্ষণের কারণে হতে পারে, আবার অন্যভাবেও হতে পারে। গাইনি বিভাগের ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে জানা যাবে, শিশুটি ধর্ষণ শিকার হয়েছে কি না।

সোমবার দুপুরের পর মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে মাদ্রাসার পরিচালক জানান, তিনি ছয় দিন ধরে ইতেকাফে রয়েছেন। ওই মেয়েটির পায়ে ফোড়া হয়েছে। সে জন্য অসুস্থ হতে পারে। পরিচালক নিজেকে ডায়াবেটিক রোগী দাবি করে তিনি বলেন, ‘কোনো কিছু করতে চাইলে আপনারা তদন্ত সাপেক্ষে করবেন। শিশুটিকে কোনো প্রকার নির্যাতন করা হয়নি।’

সোমবার সন্ধ্যায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ভেড়ামারা থানার পুলিশ ওই মাদ্রাসার পরিচালককে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করেছে। থানার এক উপপরিদর্শক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, মাদ্রাসার পরিচালককে তাঁর বাড়ি থেকে প্রায় সাত কিলোমিটার দূর থেকে আটক করা হয়। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। তবে এখনো তাঁর বিরুদ্ধে মামলা হয়নি।