বরেন্দ্র অঞ্চলে বড় দুশ্চিন্তা পানি, ‘সংকটাপন্ন’ ঘোষণার পরও মানা হচ্ছে না বিধিনিষেধ
রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের বরেন্দ্র অঞ্চলের অনেক গ্রামে এখন সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তার নাম পানি। একসময় যে পুকুরের পানি মানুষ ব্যবহার করতেন দৈনন্দিন কাজে, সেই পুকুর আজ পরিত্যক্ত। বাড়ির উঠানের নলকূপে পানি ওঠে না। যে গভীর নলকূপ দিয়ে বিঘার পর বিঘা জমিতে সেচ দেওয়া হয়েছে, সেই নলকূপে কখনো পানি পাওয়া যায়, কখনো যায় না। এতে অনেক এলাকায় খাওয়ার পানির তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে।
গবেষকেরা বলছেন, নির্বিচার ভূগর্ভস্থ পানি তোলায় মাটির নিচের পানিধারক স্তর বা ‘অ্যাকুইফার’ মারা যাচ্ছে। ফলে পর্যাপ্ত বৃষ্টি হলেও মাটির নিচে পানি জমছে না। পানিসংকটে সেচব্যবস্থা ভেঙে পড়ছে, বাড়ছে ধান চাষের খরচ, অনাবাদি হয়ে পড়ছে বিস্তীর্ণ জমি। এমনকি খাওয়ার পানি সংগ্রহেও মানুষকে সংগ্রাম করতে হচ্ছে।
এমন অবস্থায় রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁ জেলার ২৫ উপজেলার ৪৭টি ইউনিয়নের ১ হাজার ৪৬৯টি মৌজাকে গত বছরের ২৫ আগস্ট ‘অতি উচ্চ পানিসংকটাপন্ন’ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করেছে সরকার। এ ছাড়া ৮৮৪টি মৌজাকে ‘উচ্চ পানিসংকটাপন্ন এলাকা’ এবং ১ হাজার ২৪০টি মৌজাকে মধ্যম মাত্রার পানিসংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করা হয়। এ ঘোষণার পর ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারে কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করে গত জানুয়ারিতে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। প্রজ্ঞাপনে সংকটাপন্ন এলাকায় খাওয়ার পানি ছাড়া অন্য কোনো কারণে নতুন করে নলকূপ স্থাপন ও ভূগর্ভস্থ পানি তোলা বন্ধ রাখাসহ ১১টি বিধিনিষেধ দেওয়া হয়। তবে বাস্তবে বিধিনিষেধ মানা হচ্ছে না। ফলে ক্রমেই সংকট আরও বাড়ছে।
‘অতি উচ্চ পানিসংকটাপন্ন’ এলাকার একটি রাজশাহীর তানোর উপজেলার উচ্চাডাঙ্গা গ্রাম। গ্রামের প্রবীণ বাসিন্দা তাজমুল হক (৮৪) নিজের কষ্টের কথা তুলে ধরে বলেন, ‘আমরা আগে পুখইরের (পুকুর) পানিই খাতুক। পুখইর নষ্ট হয়ে গেল। সরকার টিউবওয়েল বসাইল। চলল না। ১ হাজার ৪০০ ফুট নিচেও নাকি পানি নাই। একটা সংস্থা মাটি খুঁইড়ে তিনটা জাগায় একটু পানি পাইল। সেই তিন জাগায় মোটর বসিয়ে দিয়েছে। তাতেই গাঁয়ের মানুষ পানি খাচ্ছে। এই পানি ফুরাইলে আবার পুখইরের পানি খাইতে হবে। না হলে এলাকা ছাইড়ে চলে যাইতে হবে।’
পরিস্থিতি মোকাবিলায় ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানোসহ বিকল্প উদ্যোগের কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক চৌধুরী সারওয়ার জাহান প্রথম আলোকে বলেন, অগ্রাধিকার ভিত্তিতে দ্রুত বিকল্প পানির উৎসের ব্যবস্থা করতে হবে। অন্যথায় পানির জন্য ভয়াবহ অবস্থার সৃষ্টি হবে।
১৫৩ ইউনিয়নে পানিসংকটাপন্ন এলাকা
পানিসংকটাপন্ন এলাকা হলো এমন অঞ্চল, যেখানে সুপেয় পানির চাহিদা মেটানোর জন্য পর্যাপ্ত পানির অভাব আছে। জলবায়ু পরিবর্তন ও ভূগর্ভস্থ পানির অপরিকল্পিত ব্যবহারের কারণে তা আরও বাড়ছে। বাংলাদেশ পানি আইন ২০১৩-এর অধীনে, এই ধরনের এলাকাগুলো সরকার চিহ্নিত করে এবং সেগুলোর ব্যবস্থাপনা, ব্যবহার ও সংরক্ষণে কঠোর নীতিমালা গ্রহণ করা হয়।
তিন জেলার পানিসংকটাপন্ন এলাকায় সেচকাজে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ ১১ হাজার ৪০০টি গভীর নলকূপ বসানোর নির্দেশনা ছিল। কিন্তু নির্দেশনা অমান্য করে ৬২ হাজার শ্যালো টিউবওয়েল ও ৪ হাজার গভীর নলকূপ বসানো হয়েছে।
পানিসম্পদ পরিকল্পনা সংস্থা (ওয়ারপো) রাজশাহী, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও নওগাঁর ২৫টি উপজেলার ৪৭টি ইউনিয়নের ১ হাজার ৪৬৯টি মৌজা ‘অতি উচ্চ পানিসংকটাপন্ন’, ৪০টি ইউনিয়নের ৮৮৪টি মৌজা ‘উচ্চ পানিসংকটাপন্ন’ এলাকা এবং ৬৬টি ইউনিয়নের ১ হাজার ২৪০টি মৌজা ‘মধ্যম মাত্রার পানিসংকটাপন্ন’ এলাকা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। গত ২২ জানুয়ারি এ বিষয়ে গেজেট প্রকাশিত হয়েছে। এর পর থেকে আগামী ১০ বছরের জন্য এ এলাকাকে ‘পানিসংকটাপন্ন’ এলাকা হিসেবে ঘোষণা করা হয়। খাওয়ার জন্য ছাড়া অন্য কোনো কাজে এসব এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানি তোলা আগামী দুই বছরের মধ্যে বন্ধ ঘোষণা করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য বলছে, পানিসংকটাপন্ন ঘোষিত এলাকার আয়তন ২ হাজার ৭৮৭ বর্গকিলোমিটার; যেখানে প্রায় ২১ লাখ ৫ হাজার মানুষ পানিসংকটে ভুগছেন।
দেশে ভূগর্ভস্থ পানির অবস্থা বেশ সঙিন। বিশেষত শিল্পপ্রধান এবং বরেন্দ্র অঞ্চলে যেখানে বছরের পর বছর কোনো গ্রহণযোগ্য সমীক্ষা ছাড়াই তোলা হচ্ছে মাটির নিচের পানি। এই মন্তব্য করে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান প্রথম আলোকে বলেন, ‘বরেন্দ্র এলাকাকে পানিসংকটাপন্ন এলাকা ঘোষণা করতে আমরা বাধ্য হয়েছি। আমরা একই সঙ্গে এ এলাকায় ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ নিশ্চিত করতে একটা প্রাথমিক কর্মপরিকল্পনাও তৈরি করেছি। আশা করি, সরকার দ্রুত সেই কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজ শুরু করবে।’ তিনি মনে করেন, এটি করা গেলে বরেন্দ্র এলাকায় কৃষিব্যবস্থায় পরিবর্তন আসবে এবং বেশি পানির প্রয়োজন হয়, এমন শস্য থেকে সরে এসে মানুষ কম পানিনির্ভর শস্য চাষাবাদ শুরু করবে।
রিজওয়ানা হাসান সতর্ক করে বলেন, বরেন্দ্রর মতো কঠিন অবস্থা শিল্পসমৃদ্ধ গাজীপুরেও। শিল্পে ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ অতি জরুরি। অন্তর্বর্তী সরকার সে–সংক্রান্ত যে নীতির খসড়া চূড়ান্ত করেছে, তা অনুমোদন দিয়ে দ্রুত কাজ শুরু না করলে সামনে বড় বিপর্যয় অপেক্ষা করছে।
সংকটাপন্ন এলাকায় ১১ বিধিনিষেধ
পানি আইন অনুযায়ী, সংকটাপন্ন এলাকায় খাওয়ার পানি ছাড়া অন্য কোনো কারণে নতুন করে নলকূপ স্থাপন ও ভূগর্ভস্থ পানি তোলা বন্ধ থাকবে। বিদ্যমান নলকূপের মাধ্যমে খাওয়ার পানি সরবরাহ অব্যাহত রেখে সেচকাজের ফসল বৈচিত্র্যকরণ করে পর্যায়ক্রমে দুই বছরের মধ্যে ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলন বন্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে পানি উত্তোলন কমাতে কৃষকদের উৎসাহিত করতে পদক্ষেপ নিতে হবে।
হাঁরঘে পানির খুবই কষ্ট জি বা। ম্যালা দূর থ্যাকা হ্যাঁটা আস্যা এক ঠিলি পানি পাইনু।
যেকোনো এলাকার ভূগর্ভস্থ পানিধারক স্তরের সর্বনিম্ন নিরাপদ আহরণসীমা নির্ধারণ করতে পারবে। ভূগর্ভস্থ পানিনির্ভর শিল্প বা প্রতিষ্ঠান স্থাপন করা যাবে না। খাল, বিল, পুকুর, নদী তথা কোনো জলাধারের শ্রেণি পরিবর্তন করা যাবে না এবং জলাশয়গুলো জনগণের ব্যবহারের জন্য উন্মুক্ত রাখতে হবে। জনগণের ব্যবহারযোগ্য খাস জলাশয় ও জলমহালগুলো ইজারা দেওয়া নিরুৎসাহিত করতে হবে; কোনো জলাধারের সব পানি আহরণ করা যাবে না। এ রকম ১১টি বিধিনিষেধ প্রতিপালন করা বাধ্যতামূলক। বিধিনিষেধের লঙ্ঘন দণ্ডনীয় অপরাধ বলে গণ্য হবে।
বিধিনিষেধ মানছেন না কেউ
নিয়মানুযায়ী পল্লী বিদ্যুতের সংযোগ নিয়ে কোনো গ্রাহক খাওয়ার পানি ছাড়া অন্য কাজ করতে পারবেন না। সম্প্রতি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, কেউ এই বিধিনিষেধ মানছেন না। আবাসিক সংযোগ নিয়ে অনেকেই সাবমারসিবল পাম্প বসিয়ে সেচকাজে ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহার করছেন। পল্লী বিদ্যুৎ শুধু জরিমানা করছে।
তানোরের নারায়ণপুর মৌজার উচ্চাডাঙ্গা গ্রামের পানির স্তর সবচেয়ে বেশি নিচে। সেখানে রীতিমতো আবাসিক সংযোগ থেকে ধানের জমিতে সেচ দেওয়া হচ্ছে। গত ১৪ এপ্রিল পাইপের পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে যেতে দেখা গেল, মাটির দেয়াল ছিদ্র করে পাইপ বাইরে বের করে কেউ কেউ জমিতে সেচ দিচ্ছেন। ডাকাডাকি করলে প্রথমে ভয়ে বাইরে বের হচ্ছিলেন না। একপর্যায়ে বেরিয়ে এসে একজন বললেন, জমি পড়ে আছে, খাবেন কী। তাই জীবন বাঁচাতে এ কাজ করছেন।
তানোরের মুণ্ডুমালা পৌর এলাকার আইড়ার মোড়ে একটি ব্যক্তিমালিকানাধীন গভীর নলকূপ থেকে প্রায় ১০০ বিঘা বোরো ধানের জমিতে সেচ দেওয়া হচ্ছে। স্থানীয় লোকজন জানান, চালকলের মিটার থেকে সংযোগ নিয়ে সেচকাজ চালানো হচ্ছে।
কথিত চালকলের বন্ধ দরজার ফাঁক দিয়ে দেখা গেল, ভেতরে চালকলের পরিত্যক্ত কিছু অংশ পড়ে আছে। ঘরের ভেতরে সেচের পাইপ ও অন্যান্য জিনিসপত্র। মালিক ব্যবসায়ী জহুরুল ইসলামের বাড়ি তানোরের বাধাইড় ইউনিয়নের চকবাধাইড় গ্রামে। জানতে চাইলে জহুরুল বলেন, ‘তিন বছর আগে ইউএনও অফিস থেকে আমাকে এই নলকূপ বসানোর অনুমতি দিয়েছে।’
ভূগর্ভস্থ পানি তোলায় বিরূপ প্রভাব
রাজশাহী, নওগাঁ ও চাঁপাইনবাবগঞ্জে ১৯৮৫-৮৬ সালে সেচকাজে প্রথম ভূগর্ভস্থ পানির ব্যবহার শুরু করে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি)। এরপর ১৯৯৩ সাল থেকে এ কাজ করছে বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (বিএমডিএ)। এই তিন জেলার পানিসংকটাপন্ন এলাকায় সেচকাজে সরকারের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ ১১ হাজার ৪০০টি গভীর নলকূপ বসানোর নির্দেশনা ছিল। কিন্তু নির্দেশনা অমান্য করে ৬২ হাজার শ্যালো টিউবওয়েল ও ৪ হাজার গভীর নলকূপ বসানো হয়েছে। বেসরকারি উদ্যোগে বসানো এই নলকূপগুলোর সক্ষমতা ২৮ হাজার গভীর নলকূপের সমান। নির্দেশনা মানলে প্রতিবছর বর্ষার পর পানির স্তর আগের অবস্থায় ফিরে আসত।
বিএমডিএ সূত্রে জানা গেছে, নির্বিচার ভূগর্ভস্থ পানি তোলায় পানির স্তর এতটাই নিচে নেমে গেছে যে কোনো কোনো এলাকায় মাটির নিচে পানিধারক স্তর মারা গেছে। এ স্তরে যে বালু পানি ধারণ করে, তা ধুলায় পরিণত হয়েছে। বালুর বদলে এখন সেখানে শুধু কাদা। এখন যতই বৃষ্টি হোক, সেখানে পানি জমছে না।
পরিসংখ্যান বলছে, তিন জেলায় অতি উচ্চ পানিসংকটাপন্ন এলাকায় বিএমডিএর ৩ হাজার ৭৭টি গভীর নলকূপ আছে। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি চাঁপাইনবাবগঞ্জের নাচোলে। এ উপজেলার বিএমডিএর নলকূপ আছে ৫০২টি। পানি উন্নয়ন বোর্ডের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নাচোলের কোথাও কোথাও ২০২৩ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৫ সালের জানুয়ারি পর্যন্ত পানির স্তর ২৯ দশমিক শূন্য ৯ মিটার থেকে ৩১ দশমিক শূন্য ৪ মিটারে নেমে গেছে। পরে তা আর পুনর্ভরণ হয়নি। অতি উচ্চ পানিসংকটাপন্ন এলাকার পানির স্তরের একই পরিণতি হয়েছে।
খাওয়ার পানিরও সংকট
‘অতি উচ্চ পানিসংকটাপন্ন’ এলাকায় ইতিমধ্যে খাওয়ার পানির হাহাকার শুরু হয়ে গেছে। নাচোল উপজেলার কসবা ইউনিয়নের কালোইর আদিবাসী পাড়ায় ১৪ ঘর ক্ষুদ্র জাতিসত্তা, ২০ ঘর সনাতন ও ৩০ ঘর মুসলিম ধর্মাবলম্বীর বসবাস। সেখানে খাওয়ার পানির সংস্থান নেই। বেসরকারি সংস্থা ডাসকো ফাউন্ডেশন তাঁদের জন্য সাবমারসিবল পাম্পের ব্যবস্থা করে দিয়েছে। এখানে দেখা হয় মালতী বালার (৬০) সঙ্গে। বললেন, ‘হাঁরঘে পানির খুবই কষ্ট জি বা। ম্যালা দূর থ্যাকা হ্যাঁটা আস্যা এক ঠিলি পানি পাইনু।’
নাচোলের বিয়াম মডেল স্কুল ও কলেজের সহকারী শিক্ষক মো. মজিদুল ইসলাম বলেন, ৩০ বছর আগে এ এলাকার মানুষ পুকুরের পানি পান করতেন। সরকারের ভুল নির্দেশনার কারণে পুকুর-বিল সব ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। এখন খাওয়ার পানির জন্য হাহাকার শুরু হয়ে গেছে।
তানোরের উচ্চাডাঙ্গা গ্রামের বাসিন্দারাও বিপদে আছেন। গ্রামে তিনটি গভীর নলকূপ ছিল। সবগুলো এখন অচল। পানি ওঠে না। ডাসকো ফাউন্ডেশন ১ হাজার ৪০০ ফুট বোরিং করে দেখেছে, শুধু কাদা; কোথাও পানি নেই। এখন পকেট অ্যাকুইফার (পানির স্তর) খুঁজে তারা তিনটি নলকূপ বসিয়ে দিয়েছে। সেগুলো থেকে পানি খাচ্ছেন গ্রামবাসী। মোট বিদ্যুৎ বিল জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করে পরিশোধ করা হয়। গ্রামের যুবল মারান্ডি বলেন, তাঁদের পাম্প থেকে এলাকার ৯০টি পরিবার পানি খায়। প্রতি মাসে জনপ্রতি ৩৫ থেকে ৪০ টাকা খরচ পড়ে। গত মার্চে তাঁর ১০৫ টাকা বিল দিতে হয়েছে।
সম্প্রতি নওগাঁর পোরশা উপজেলার ছাওড় ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর, শীতলডাঙ্গা ও হাড়ভাংগা; নিয়ামতপুর উপজেলার হাজিনগর ইউনিয়নের গণপুর, বলদাহার ও উকুনপুর গ্রামে ঘুরে জানা যায়, ছয় থেকে সাত বছর ধরে গ্রামগুলোতে হস্তচালিত নলকূপে কোনো পানি ওঠে না। বিএমডিএর বসানো গভীর নলকূপ দিয়ে খাওয়ার পানি সংগ্রহ করতে হয়। কোথাও কোথাও ৩০০ থেকে ৫০০ মিটার দূরে গিয়ে গভীর নলকূপ থেকে খাবার পানি সংগ্রহ করতে হয়।
ছাওড় ইউনিয়নের দক্ষিণ লক্ষ্মীপুর গ্রামের মেঠো রাস্তার পাশে সাবমারসিবল পাম্পের সাহায্যে তোলা পানি একটি ট্যাংকে সংরক্ষণ করা হয়েছে। সেখান থেকে পানি নিয়ে যাচ্ছিলেন সুমিতা রানী। পানি নিয়ে কোথায় যাচ্ছেন, জিজ্ঞেস করতেই সুমিতা প্রায় ২০০ মিটার দূরের একটি পাড়া দেখিয়ে বললেন, ‘ওই পাড়ায় যাব। হামাগের পাড়াত খাবার পানি পাওয়া যায় না। তাই প্রতিদিন এই ট্যাপ থেকে পানি লিয়ে য্যায়ে খাই। এত দূর থ্যাকে পানি লিয়ে য্যাতে কষ্ট হয়। কিন্তু করার কিছু নাই।’
হাড়ভাংগা গ্রামের স্কুলশিক্ষক রেজাউল ইসলাম বলেন, গ্রামের সচ্ছল প্রায় প্রতিটি পরিবারে খাওয়ার পানি, গোসল ও গৃহস্থালির কাজে ব্যবহারের জন্য বাড়িতে সাবমারসিবল পাম্প বসানো আছে। কিন্তু চৈত্র-বৈশাখ মাসে এসব পাম্পে পানি ওঠে না। মাঝেমধ্যে পাম্প নষ্ট হয়ে যায়। তখন সবাই মাঠে বসানো বিএমডিএর গভীর নলকূপ থেকে পানি আনেন। চৈত্র-বৈশাখ মাসে গ্রামের প্রায় সব পুকুরের পানি শুকিয়ে যায়। গোসল কিংবা থালাবাসন ধোয়ার মতো পানি থাকে না।
পানির স্তর নামছেই
অতি উচ্চ পানিসংকটাপন্ন এলাকা গোদাগাড়ীর সুন্দরপুর মৌজা। এখানে বিএমডিএর গভীর নলকূপের কাছে গিয়ে দেখা গেল, ৪ ইঞ্চি পাইপে চার ভাগের এক ভাগ পানি উঠছে। কখনো কখনো আরও কম উঠছে। নলকূপের অপারেটর সাত্তার আলী বললেন, ‘তিন বছর থেকে এই ডিপে (নলকূপে) পানি উঠছে, আবার বন্ধ হয়ে যাইচ্ছে। কোনো গ্যারান্টি নাই। এখন রিস্কের ওপর চালাইতে হচ্ছে। এই ডিপে ৪০ থেকে ৫০ বিঘা জমিতে বোরো ধান করা হয়েছে। এখন খাইতে হইবে প্যাটে, বুঝতেই তো পাইরছেন। লিয়ার (পানির স্তর) নিচে নাইমে যাচ্ছে দিন দিন। আল্লাহ তুইলছে বুইল্যা তুলাচ্ছি। দু-পাঁচ বছরের মধ্যে যত ডিপ টিউবওয়েল আছে, সব নষ্ট হয়ে যাবে।’
সুন্দরপুর গ্রামের কিষানি সাহানারা বেগম (৪৫) এই নলকূপের আওতায় বোরো চাষ করেছেন। তিনি তাঁর ধানখেত দেখাতে নিয়ে গেলেন। দেখা গেল, মাটি ফাটতে শুরু করেছে। এখন সেচ না দিলে মাটি শুকিয়ে যাবে। সাহানারা বেগম বললেন, ‘এক বিঘা জমি ভেজাতে চার ঘণ্টা সময় লাগবে। এক বিঘা বোরো চাষ করতে ৫ হাজার ২০০ টাকা পর্যন্ত শুধু পানির পেছনে খরচ হচ্ছে।’
নওগাঁর পোরশা উপজেলার শিয়ালডাঙ্গা গ্রামে দীর্ঘদিন ধরে গভীর নলকূপ চালান সাইদুল ইসলাম। তিনি বলেন, নলকূপটি থেকে ১৯৯২ সালে প্রথম ৯০ ফুট নিচে পানি পাওয়া যেত। ১০ থেকে ১২ বছর পর দেখা গেল আর পানি উঠছে না। তখন আবার বোরিং করে ১১০ ফুট নিচে পানি পাওয়া যায়। চার বছর পর আরেক দফা বোরিং করে ১২০ ফুট নিচে পানি পাওয়া যায়। তিনি বলেন, যেভাবে পানির স্তর নামছে, তাতে মনে হচ্ছে কয়েক দিন পর আর পানি উঠবে না।
পোরশার ছাওড় ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর গ্রামের আবদুল জব্বার মণ্ডল বলেন, ‘হামাগের গ্রামত তিনটা ডিপ টিউবওয়েল (গভীর নলকূপ) আছে। বছর দশেক আগেও এই ডিপগুলা দিয়ে ১৫০ থেকে ১৮০ বিঘা পর্যন্ত জমিত ধান আবাদ হতো। এখন ৯০ থেকে ১১০ বিঘা পর্যন্ত আবাদ হয়। খরার সময় আগের মতো পানির ফোর্স (চাপ) থাকে না। বিএমডিএ থ্যাকেও ইরি সিজনে ডিপ টিউবওয়েলে পানি তোলার ঘণ্টা ব্যাধে দিছে। এক সিজনে ৯৮০ ঘণ্টার বেশি নাকি ডিপ টিউবওয়েল চালানো যাবে না।’
যা বলছে বিএমডিএ
বিএমডিএর অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবুল কাশেম প্রথম আলোকে বলেন, সরকারের নির্দেশনা ছিল সর্বোচ্চ ১১ হাজার ৪০০ নলকূপ বসানোর। এর মধ্যে বিএমডিএর ৮ হাজার ৪০০। তবে ব্যক্তিমালিকানাধীন মিলে চলছে ২৮ হাজার। তিনি বলেন, বিএমডিএ পানি তোলে মাত্র ২৭ শতাংশ। বাকি পানি ব্যক্তিমালিকানাধীন পাম্প তুলছে। এগুলো কেউ নিয়ন্ত্রণ করছে না।
আবুল কাশেম বলেন, বিএমডিএ এখন সেচকাজে ২২ শতাংশ ভূ–উপরিস্থ পানি ব্যবহার করছে। ২০৩০ সালে তা বেড়ে ৩০ শতাংশ এবং ২০৫০ সালে ৫০ শতাংশ হবে। এ জন্য ৫৪৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের এক-তৃতীয়াংশ কাজ শেষ হয়েছে। আগামী দুই বছরের মধ্যে এ প্রকল্প থেকে ১০ হাজার ২৫০ হেক্টর জমিতে সেচ দেওয়া যাবে। এ ছাড়া আরও দুটি প্রকল্প অনুমোদনের অপেক্ষায়। তিনি বলেন, বরেন্দ্র এলাকায় ৫ হাজার ৫৫৩টি খাসপুকুর ও জলাশয় আছে। এগুলো উপজেলা প্রশাসন ইজারা দিচ্ছে। বিএমডিএকে দিলে তারা জনগণের জন্য উন্মুক্ত করে দিতে পারে।
পুকুরের ব্যাপারে রাজশাহী বিভাগীয় কমিশনার আ ন ম বজলুর রশীদ প্রথম আলোকে বলেন, সব খাসপুকুর ইজারা দেওয়া হয়নি। কিছু কিছু জলাধার হিসেবে ব্যবহারের জন্য পুনঃ খনন করা হচ্ছে। সবগুলো উন্মুক্ত করার জন্য পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় দরকার।
মাঠগুলো যেন মরুভূমি
গোদাগাড়ী উপজেলার পাকড়ী ও মোহনপুর; তানোর উপজেলার মন্ডুমালা পৌর এলাকা ও বাধাইড় ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকার জমিগুলো এখন মরুভূমির মাঠে পরিণত হয়েছে। মাঠে কোনো লোকজন নেই। খাঁ খাঁ করছে। পাকড়ী ইউনিয়নের নারায়ণপুর মৌজার একটা গভীর নলকূপে এবার কোনো বোরো ধান চাষ করা যায়নি। রোপণ করা চারা বীজতলাতেই আছে। দু-একজন চাষি পটোল চাষ করার চেষ্টা করছেন। খানিকটা দূরে একটা পেয়ারাবাগান। আর সব জমি পড়েই আছে।
পাকড়ী ইউনিয়নের বড়গাছি কানুপাড়ার রাস্তায় স্থানীয় বেঞ্জামিন কিসকুকে পাওয়া গেল। তিনি বলেন, তাঁর ভাই জুলিয়ান কিসকু গত বছর তিন বিঘা জমিতে ধান চাষ করেছিলেন। এবার পানির কারণে বোরো চাষ করতে পারেননি। চৈতালি করেছেন। এরপর আমন রোপণ পর্যন্ত তাঁদের জমি পড়ে থাকবে। বর্ষায় ভালো বৃষ্টি হলে আমনটা হবে।
গোদাগাড়ী উপজেলার মোহনপুর ইউনিয়নের চান্দলাই মাঠ একইভাবে পড়ে আছে। শুধু কয়েকটা ছাগল নিয়ে একজন রাখালকে দেখা গেল।