ইরাকে হামলায় নিহত বাংলাদেশি যুবকের লাশ আড়াই মাস পর দাফন

নিহত শ্রাবণের লাশের পাশে তাঁর স্ত্রী ও সন্তানেরা। গতকাল দুপুরে মুন্সিগঞ্জের সদর উপজেলার আধারা ইউনিয়নের বকুলতলা গ্রামেছবি: প্রথম আলো

ইরাকে মিসাইল হামলায় নিহত বাংলাদেশি যুবক মো. শ্রাবণ ওরফে হবি মিয়ার (৩৫) লাশ প্রায় আড়াই মাস পর দাফন করা হয়েছে। আজ শুক্রবার বেলা তিনটার দিকে মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার আধারা ইউনিয়নের বকুলতলা হাজি আবদুল করিম উচ্চবিদ্যালয় মাঠে তাঁর জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে এলাকার সামাজিক কবরস্থানে তাঁকে দাফন করা হয়।

এর আগে শুক্রবার ভোর ৫টা ১৫ মিনিটে তার্কিশ এয়ারলাইনসের একটি ফ্লাইটে সরকারি ব্যবস্থাপনায় শ্রাবণের লাশ ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে পৌঁছায়। সব আইনি প্রক্রিয়া শেষে লাশ পরিবারের সদস্যদের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

নিহত শ্রাবণ মুন্সিগঞ্জ সদর উপজেলার বকুলতলা গ্রামের মো. নলি মিয়ার ছেলে। প্রায় ১৮ বছর আগে তিনি খাদিজা আক্তারের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁদের সংসারে হাবিবা আক্তার (১৬) ও নাফিজা আক্তার (১০) নামে দুই কন্যাসন্তান আছে।

২০১৬ সালে বাবা–মা, ভাই, স্ত্রী ও দুই মেয়েকে রেখে জীবিকার তাগিদে ইরাকে যান মো. শ্রাবণ। কয়েক বছর ধরে তিনি ইরাকের বাগদাদ শহরে কর্মরত ছিলেন। সেখানে তিনি অবৈধ অভিবাসী হিসেবে কাজ করতেন। গত ১৪ মার্চ বাগদাদে একটি মিসাইল হামলায় তিনি নিহত হন। গত ১৬ মার্চ মো. শ্রাবণের এক সহকর্মী প্রথমে তাঁর স্ত্রী খাদিজা আক্তারকে মৃত্যুর বিষয়টি জানান। সে সময় স্ত্রী, সন্তান, বাবা-মা ও ভাইদের একটাই চাওয়া ছিল—শেষবারের মতো শ্রাবণের মুখ দেখা এবং তাঁকে একবার স্পর্শ করতে পারা।

মুন্সিগঞ্জের স্থানীয় প্রশাসন ও বাংলাদেশ দূতাবাসের সহযোগিতায় মৃত্যুর প্রায় আড়াই মাস পর শুক্রবার দুপুরের আগে শ্রাবণের লাশ বকুলতলা গ্রামে পৌঁছায়। এদিন পরিবারের সদস্যদের পাশাপাশি স্থানীয় লোকজনও শেষবারের মতো তাঁকে দেখে ভিড় করেন। ছেলের লাশ কাছে পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন মা লাকি বেগম। তিনি বারবার ছেলের কফিন ধরে বিলাপ করছিলেন।

আহাজারি করে লাকি বেগম বলছিলেন, ‘১০ বছর আগে পোলারে দেখছি। বিদেশ যাওনের পর ফোনে কথা কইতাম। দেশে আসে না বইলা মারা যাওনের ছয় মাস আগে গালাগালি করছিলাম। এরপর থেইকা পোলা আমার লগে কথা কইত না। ভাবছিলাম, দেশে আইলে সব ঠিক হইয়া যাইব। আমি তো জানতাম না, আমার পোলা আর জীবিত দেশে আইব না, আমার লগে আর কথা কইব না।’

নিহত শ্রাবণের স্ত্রী খাদিজা আক্তার দুই মেয়েকে নিয়ে স্বামীর লাশ রাখা কফিনের পাশে বসে ছিলেন। অনেকটা বাক্‌রুদ্ধ ছিলেন তিনি। শ্রাবণ যখন ইরাকে যান, তখন বড় মেয়ে হাবিবা আক্তারের বয়স ছিল ছয় বছর। ছোট মেয়ে নাফিজা আক্তার তখন মায়ের গর্ভে ছিলেন।

খাদিজা আক্তার বলেন, গত ১৩ মার্চ তাঁর সঙ্গে শ্রাবণের শেষ কথা হয়েছিল। সেদিন তাঁর খুব মন খারাপ ছিল। ফোনে চারদিকে মিসাইল হামলার ভয়াবহ পরিস্থিতির কথা বলছিলেন। যুদ্ধ শেষ হলে দেশে ফিরে আসবেন, আর বিদেশে যাবেন না—বাচ্চাদের নিয়ে দেশেই থাকবেন বলেছিলেন।

খাদিজা আক্তার আরও বলেন, ‘আমাদের জীবিত একসঙ্গে থাকা হলো না। আমার স্বামী লাশ হয়ে এসেছে। আমি ও আমার মেয়েরা তাঁর কাছাকাছি থাকতে চাই। আমাদের সামর্থ্য নেই। সরকারিভাবে যদি আমার স্বামীর গ্রামের জমিতে একটি ঘরের ব্যবস্থা করা যেত, তাহলে মেয়েরা সেখানে থেকেই পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারত।’