ঈদের ছুটিতে কক্সবাজারে কত পর্যটক আসেন, ব্যবসা কেমন হয়

কক্সবাজার সমুদ্রসৈকত এখন অনেকটা ফাঁকা। ঈদের দ্বিতীয় দিন থেকে পর্যটক সমাগম বাড়বে। গতকাল দুপুরে সুগন্ধা পয়ন্টেছবি: প্রথম আলো

বিশ্বের দীর্ঘতম সমুদ্রসৈকত কক্সবাজারে প্রতিবছর ৭০ থেকে ৮০ লাখ পর্যটক ভ্রমণ করেন বলে দাবি করেন হোটেলমালিকেরা। তবে পর্যটক গণনার নির্ভরযোগ্য কোনো পদ্ধতি বা তথ্যভান্ডার নেই। ঈদ বা টানা ছুটিতে সৈকতে পর্যটকের ঢল নামলেও এখন অনেকটাই ফাঁকা সময় যাচ্ছে।

গত দুই দিন সৈকত এবং আশপাশের কয়েকটি হোটেল, রিসোর্ট ও গেস্টহাউস ঘুরে দেখা গেছে, পাঁচ শতাধিক হোটেলের প্রায় ৯৮ শতাংশ কক্ষ খালি পড়ে আছে। সমুদ্রসৈকতেও পর্যটকের উপস্থিতি কম। তীব্র গরমে হাতে গোনা কিছু মানুষ লোনাজলে নেমে গোসল করছেন, কেউ বালুচরে বসে সমুদ্র দেখছেন, কেউবা ছবি তুলছেন।

গতকাল বুধবার বেলা ১১টার দিকে সুগন্ধা পয়েন্টে গিয়ে দেখা যায়, শতাধিক পর্যটক সমুদ্রে গোসল করছেন। বালুচরে বসানো চেয়ার-ছাতায় বসে অনেকে সমুদ্র উপভোগ করছেন। কেউ ঘোড়ার পিঠে চড়ে সৈকত ঘুরছেন।

ঢাকার বাসাবো থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা ব্যবসায়ী কাজল কান্তি দাশ বলেন, দেশের বিভিন্ন স্থানে বৃষ্টি হলেও কক্সবাজারে প্রচণ্ড গরম। তবে সমুদ্রের পানিতে নামলে স্বস্তি পাওয়া যায়। সৈকত ফাঁকা থাকায় গোসল করতেও ভালো লাগছে।

কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে আসা কামরুন্নেছা বলেন, লম্বা ছুটিতে পরিবারের সঙ্গে কক্সবাজারে এসেছেন। সকালে সমুদ্রে গোসল করেছেন, দুপুরে ঘোড়ার পিঠে বসে ছবি তুলছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়ার জন্য।

সৈকতে পর্যটকদের নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা বেসরকারি সি-সেফ লাইফগার্ডের সুপারভাইজার সিফাত সাইফুল্লাহ বলেন, এক সপ্তাহ আগেও সুগন্ধা সৈকতের এক কিলোমিটার এলাকায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার মানুষের সমাগম হয়েছিল। কয়েক দিন ধরে সৈকত ফাঁকা যাচ্ছে। বর্তমানে প্রতিদিন ৪০০ থেকে ৭০০ পর্যটক গোসলে নামছেন। তবে ঈদুল আজহার দ্বিতীয় দিন থেকে পর্যটকের চাপ বাড়বে।

কক্সবাজার শহর ও সৈকত এলাকায় পাঁচ শতাধিক হোটেল, রিসোর্ট ও গেস্টহাউস রয়েছে। এসব প্রতিষ্ঠানের দৈনিক ধারণক্ষমতা প্রায় ১ লাখ ৬৮ হাজার। কক্সবাজার হোটেল-গেস্টহাউস মালিক সমিতির সভাপতি আবুল কাশেম সিকদার প্রথম আলোকে বলেন, বর্তমানে শহরের হোটেলগুলোয় প্রায় চার হাজার পর্যটক অবস্থান করছেন। ঈদ উপলক্ষে এখনো অধিকাংশ হোটেল খালি।

সমুদ্রে গোসলে নেমেছেন কিছু পর্যটক। গতকাল দুপুরে
ছবি: প্রথম আলো

আবুল কাশেম সিকদার বলেন, ২৯ মে থেকে ৩ জুন পর্যন্ত পাঁচ দিনের জন্য হোটেলগুলোর ৭৫ শতাংশ কক্ষ আগাম বুকিং হয়েছে। আবার ৪ থেকে ৬ জুন পর্যন্ত বুকিং হয়েছে ৬১ শতাংশ কক্ষ। সব মিলিয়ে ঈদের ছুটিতে অন্তত সাত লাখ পর্যটক কক্সবাজারে আসতে পারেন।

আবুল কাশেম সিকদার বলেন, বর্তমানে পর্যটক টানতে হোটেলভাড়ায় সর্বোচ্চ ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড় দেওয়া হচ্ছে। দুই হাজার টাকার একটি শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কক্ষ ভাড়া পাওয়া যাচ্ছে ৬০০ টাকায়। তবে ২৮ মে রাতের পর থেকে এই বিশেষ ছাড় থাকবে না।

কক্সবাজার মেরিন ড্রাইভ হোটেল-রিসোর্ট মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মুকিম খান বলেন, গত দুই মাস ধরে হোটেল ব্যবসায়ীরা লোকসান গুনছেন। বর্তমানে অধিকাংশ হোটেলের কক্ষ খালি। অর্থনৈতিক পরিস্থিতি ও অস্থির পরিবেশের কারণে অনেকে ভ্রমণে আগ্রহ হারাচ্ছেন। ইতিমধ্যে কিছু পর্যটক আগাম বুকিং বাতিলও করেছেন।

হোটেলমালিকদের হিসাবে, ঈদের দ্বিতীয় দিন সৈকতে ৭০ হাজারের বেশি পর্যটক আসতে পারেন। পরবর্তী দুই দিনে এই সংখ্যা প্রায় ১ লাখ ৮০ হাজারে পৌঁছাতে পারে। আর ৪ থেকে ৬ জুন পর্যন্ত তিন দিনে আড়াই লাখের বেশি পর্যটকের সমাগম হতে পারে।

তবে সম্ভাব্য ভারী বৃষ্টি নিয়ে উদ্বেগ আছে পর্যটনসংশ্লিষ্টদের। আবুল কাশেম সিকদার বলেন, পাহাড় কেটে ফেলা মাটি নেমে এসে হোটেল-মোটেল জোনের অনেক নালা ভরাট হয়ে গেছে। ফলে অল্প বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতা তৈরি হয়। এতে পর্যটকদের ভোগান্তি বাড়ে।

কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি আবদুস শুক্কুর বলেন, গত ঈদুল ফিতরের আট দিনের ছুটিতে প্রায় ১২ লাখ পর্যটকের সমাগম হয়েছিল। তখন হোটেল, রেস্তোরাঁ ও বিভিন্ন ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে প্রায় এক হাজার কোটি টাকার ব্যবসা হয়েছিল। এবার ৭ লাখ পর্যটক এলে প্রায় ৭০০ কোটি টাকার ব্যবসা হতে পারে।

পর্যটকদের বিনোদনের জন্য শহরে এক হাজারের বেশি খোলা জিপগাড়ি, মাইক্রোবাস ও সিএনজিচালিত অটোরিকশা রয়েছে। আছে কয়েক হাজার ইজিবাইক ও টমটম। ট্যুর অপারেটর প্রতিষ্ঠানের কর্মীরা পর্যটকদের হোটেল বুকিং ও বিভিন্ন দর্শনীয় স্থানে ভ্রমণে সহায়তা করেন।

সৈকতে ভেজা বালু নিয়ে খেলছে এক শিশু। গতকাল দুপুরে
ছবি: প্রথম আলো

কক্সবাজার ট্যুর অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আনোয়ার কামাল বলেন, বেশির ভাগ পর্যটকের প্রধান আকর্ষণ সমুদ্রে গোসল ও সূর্যাস্ত উপভোগ। পাশাপাশি কক্সবাজার-টেকনাফ মেরিন ড্রাইভ, হিমছড়ি, ইনানি সৈকত, সাবরাং ট্যুরিজম পার্ক, মাথিন কূপ, নাফ নদী, মহেশখালী ও রামুর বৌদ্ধপল্লিতেও পর্যটকেরা ঘুরতে যান।

এদিকে কক্সবাজার রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ আলী বলেন, সাগরে মাছ ধরায় নিষেধাজ্ঞা থাকায় রেস্তোরাঁগুলোয় মাছের সংকট চলছে। সবজি ও খাদ্যপণ্যের দামও বেড়েছে। ফলে খাবারের দাম কিছুটা বেড়েছে।

জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান বলেন, অতিরিক্ত হোটেলভাড়া কিংবা খাবারের বাড়তি দাম আদায় ঠেকাতে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে। পর্যটকদের নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে।