সিলেটের ৬টি আসন: তলেতলে ‘আওয়ামী ভোটে’ নজর বিএনপি ও জামায়াতের

সিলেট-৪ আসনে বিএনপি প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরীর নির্বাচনী জনসভায় বক্তব্য দেন কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির যুগ্মসম্পাদক বোরহান উদ্দিন খন্দকার। রোববার বেলা পৌনে তিনটার দিকে কোম্পানীগঞ্জ থানা সদর মডেল সরকারি উচ্চবিদ্যালয় মাঠেছবি: প্রথম আলো

সিলেট-৪ (গোয়াইনঘাট, কোম্পানীগঞ্জ ও জৈন্তাপুর) আসনে কোম্পানীগঞ্জ উপজেলায় বিএনপির প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরীর সর্বশেষ নির্বাচনী জনসভা ছিল রোববার। বেলা সাড়ে তিনটায় কোম্পানীগঞ্জ থানা সদর সরকারি মডেল উচ্চবিদ্যালয় মাঠে বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতিতে সভাটি হয়।

সভা শুরুর আগে বেলা পৌনে তিনটার দিকে এক বক্তাকে সভামঞ্চে দাঁড়িয়ে কথা বলতে দেখা যায়। তখনো অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি আরিফুল হকসহ নেতৃস্থানীয়রা মঞ্চে আসেননি। ওই বক্তা বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।’ কাছে গিয়ে জানা যায়, যিনি এ বক্তব্য দিচ্ছেন, তাঁর নাম বোরহান উদ্দিন খন্দকার। তিনি পেশায় আইনজীবী ও কোম্পানীগঞ্জ উপজেলা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক।

ধানের শীষের পক্ষে আওয়ামী লীগের ভোটারদের টানতে শেখ মুজিবুর রহমানের নাম টেনে বক্তব্য দিয়েছেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে বোরহান উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘না, না। ইতিহাসের সত্যটা বলেছি। বঙ্গবন্ধুকে অস্বীকার করেও লাভ নাই। আবার জিয়াউর রহমানকে বাড়িয়ে বলেও লাভ নাই।’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকা আওয়ামী লীগের সমর্থকদের ভোট টানতে প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে নানামুখী কৌশল করছেন প্রার্থীরা। কোনো কেনো প্রার্থী আওয়ামী লীগ-সমর্থিত ভোটারদের নির্বিঘ্নে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে ভোট দেওয়ার অনুরোধও করেছেন। সিলেটের ছয়টি আসনেই কমবেশি এমন তৎপরতা আছে বলে খোদ কয়েকজন প্রার্থীও নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোর কাছে স্বীকার করেছেন।

আত্মগোপনে থাকা সিলেট জেলা আওয়ামী লীগের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিএনপি ও জামায়াতের নির্দিষ্ট ভোটব্যাংক আছে। তবে তাদের প্রার্থীর জয়-পরাজয় নির্ধারণে আওয়ামী লীগ-সমর্থিত ভোটার ও সংখ্যালঘু সম্প্রদায় একটা গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। তাঁরা যদি ভোটকেন্দ্রে যান, তাহলে যে প্রার্থীকে ভোট দেবেন, স্বাভাবিকভাবেই ওই প্রার্থী অনেকটা এগিয়ে যাবেন। তাই বিএনপি-জামায়াত এসব ভোট পেতে তৎপর।

স্থানীয় একাধিক সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগ ঘরানার ভোট টানতে বিএনপির একাধিক প্রার্থী ভেতরে-ভেতরে চেষ্টা চালাচ্ছেন। কিছু প্রার্থী গোপনে আওয়ামী লীগের আত্মগোপনে থাকা নেতাদের সঙ্গেও মুঠোফোনে আলাপ করে তাঁদের মাধ্যমে স্থানীয় ভোটারদের প্রভাবিত করার চেষ্টা করছেন। একইভাবে তৎপর আছেন জামায়াতসহ ১১-দলীয় নির্বাচনী ঐক্যের কিছু প্রার্থীও। আওয়ামী লীগ নেতাদের কেউ কেউ আড়ালে-আবডালে বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীদের পক্ষে ভোটও চাইছেন। এর মধ্যে সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান, ইউনিয়ন চেয়ারম্যান থেকে শুরু করে দলটির বিভিন্ন পর্যায়ের গুরুত্বপূর্ণ নেতা ও জনপ্রতিনিধিরাও আছেন।

এদিকে সিলেট-৪ আসনের বিএনপির প্রার্থী ও সিলেট সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী সম্প্রতি তাঁর নির্বাচনী এলাকায় এক পথসভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে আওয়ামী লীগের প্রসঙ্গ উত্থাপন করেছেন। তিনি ওই বক্তব্যে বলেন, ‘যারা আওয়ামী লীগ করেছে, যদি সন্ত্রাসী কোনো কার্যক্রমের সাথে জড়িত না থাকে, তাদের সঙ্গে আমাদের কোনো বিরোধ নেই। তারা যদি নির্বাচনে ভোট দিতে যায়, কেউ যদি তাদের বিরোধিতা করেন, তাঁর বিরুদ্ধে আমরা ব্যবস্থা নেব।’

একাধিক রাজনৈতিক দলের নেতারা জানান, সিলেটের ছয়টি সংসদীয় আসনেই হিন্দু সম্প্রদায়ের ভোট আছে। এ ছাড়া সিলেট-১সহ কিছু আসনে খ্রিষ্টান ও বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ভোটারও আছেন। এর বাইরে বিপুলসংখ্যক চা-জনগোষ্ঠী, মণিপুরি সম্প্রদায়ের বাসিন্দা রয়েছেন। তাঁদের ভোট টানতে চেষ্টা করছেন বিএনপি, জামায়াতসহ প্রতিটি দলের প্রার্থীই।

স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু–অধ্যুষিত এলাকা ও গ্রামে প্রার্থীরা জনসভা, উঠান বৈঠক ও পথসভার পাশাপাশি গণসংযোগও করেছেন। সব প্রার্থীই এসব সম্প্রদায়ের মানুষদের নানা প্রতিশ্রুতির পাশাপাশি মন্দির, শ্মশানঘাট নির্মাণ ও সংস্কারে ভূমিকা রাখবেন বলে আশ্বাস দিচ্ছেন। এসব ভোট পেতে বিএনপি ও জামায়াত প্রার্থীদের মধ্যে বিশেষ তৎপরতাও রয়েছে।

সিলেট নগরের বাসিন্দা হিন্দু ও মণিপুরি সম্প্রদায়ের চারজন নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির সঙ্গে প্রথম আলোর এ প্রতিবেদকের কথা হয়। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এসব ব্যক্তি জানান, তফসিল ঘোষণার আগে-পরে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থী হিন্দু ও মণিপুরি সম্প্রদায়ের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছেন। তাঁরা সেখানে ভোট চেয়েছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে এসেও তাঁরা আশীবার্দ চেয়েছেন।

সিলেট জেলায় হিন্দু সম্প্রদায় কিংবা চা-জনগোষ্ঠীর ভোটার কত, এর কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য স্থানীয় প্রশাসন কিংবা অন্য কোথাও নথিভুক্ত নেই। তবে বাংলাদেশ পূজা উদ্‌যাপন পরিষদ সিলেট জেলার সহসভাপতি রজত কান্তি ভট্টাচার্যের অনুমান, জেলায় হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রায় সাড়ে তিন লাখ ভোটার আছেন। এর মধ্যে সিলেট-১ আসনে আছেন ৭৫ হাজার থেকে ৮০ হাজার।

অন্যদিকে জেলার সিলেট সদরে ১২টি, জৈন্তাপুরে ৭টি, ফেঞ্চুগঞ্জে ৩টি, গোয়াইনঘাটে ২টি এবং কানাইনঘাটে ২টি চা-বাগান রয়েছে। বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যকরী কমিটির সভাপতি রাজু গোয়ালা জানান, এসব চা-বাগানে অন্তত ৪০ হাজার থেকে ৫০ হাজার ভোটার আছেন। সব দলের প্রার্থীই এসব ভোট পেতে তৎপর।

এদিকে আজ সোমবার দুপুর ১২টার দিকে সিলেট নগরের ধোপাদিঘিরপার এলাকায় সিলেট জেলা ও মহানগর জামায়াত সংবাদ সম্মেলন করেন। এতে মহানগর জামায়াতের আমির মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বলেন, ‘৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানেরে পর আমরাই প্রথম সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় উদ্যোগ নিয়েছিলাম। ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের বাসাবাড়ি, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও মন্দির পাহারা দিয়েছিলাম। গণ-অভ্যুত্থানের পর সিলেটের সবচেয়ে বেশি বাসাবাড়ি ও মণ্ডপ-আশ্রমে পূজা অনুষ্ঠান উদ্‌যাপিত হয়েছে। আমাদের ভাইয়েরা নিরাপত্তা নিশ্চিতে মাঠে ছিলেন, যা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত।’

মহানগর জামায়াতের আমির মুহাম্মদ ফখরুল ইসলাম বিএনপির নাম উল্লেখ না করে এ সময় বলেন, ‘কিন্তু প্রতিপক্ষ বন্ধুগণ পতিত ফ্যাসিস্ট সরকারের ন্যায় ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের ভোট টানতে মিথ্যার আশ্রয় নিচ্ছেন। আমরা নাকি তাদেরকে ভোটকেন্দ্রে যেতে হুমকি-ধমকি দিচ্ছি। আমরা ক্ষমতায় গেলে নাকি অন্য ধর্মের মানুষ ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি পালন করতে পারবেন না। এসব অভিযোগ শুধু মিথ্যা, বানোয়াটই নয়, বরং হাস্যকর।’

এর আগে গতকাল সিলেট বিএনপি নগরের কাজীটুলা উঁচা সড়ক এলাকায় এক সংবাদ সম্মেলন করে সিলেটের বিভিন্ন এলাকায় ধর্মীয় ও জাতিগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের ভোটারদের ভয়ভীতি দেখিয়ে ভোটকেন্দ্রে না যাওয়ার হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করে। এ ছাড়া গত শুক্রবার রাতে জেলা বিএনপির সভাপতি আবদুল কাইয়ুম চৌধুরীর নেতৃত্বে বিএনপির একটি প্রতিনিধিদল রিটার্নিং কর্মকর্তার সঙ্গে দেখা করেও একই অভিযোগ করে।