শরীয়তপুরের ডিসি–এসপিসহ জেলার ১৬ গুরুত্বপূর্ণ পদে নারী, কুড়াচ্ছেন প্রশংসা
শরীয়তপুর জেলার ১৫টি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে দায়িত্ব পালন করছেন নারী কর্মকর্তারা। নারী রয়েছেন জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের মতো গুরুত্বপূর্ণ পদেও। সফলতার সঙ্গে কাজ করছেন তাঁরা। তাঁদের বিভিন্ন উদ্যোগ শরীয়তপুরের মানুষের মধ্যে ইতিবাচক ধারণা তৈরি হচ্ছে, প্রশংসা কুড়াচ্ছে। নারী কর্মকর্তাদের নেতৃত্বে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলার তিনটি আসনেই শান্তিপূর্ণ ভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে।
জেলা প্রশাসন সূত্র জানায়, শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম, পুলিশ সুপার রওনক জাহান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসটি) সাদিয়া জেরিন, অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মৌসুমি মান্নান, গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী শারমিন আক্তার, জেলা রেজিস্ট্রার হেলেনা পারভিন, জেলা কারাগারের জেলার আসমা আক্তার, বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের উপপরিচালক সুপ্রিয়া বর, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক জান্নাতুল ফেরদৌস, জেলা ত্রাণ ও পুর্নবাসন কর্মকর্তা নাজনীন শামীমা, আঞ্চলিক পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক উম্মে কুলসুম, সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইলোরা ইয়াসমিন, গোসাইরহাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নুশরাত আরা খানম, নড়িয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) লাকী দাস, জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মেহের আফরোজ সুবর্ণা ও নুসরাত জাহান আরবী দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
শরীয়তপুরের জেলা প্রশাসক তাহসিনা বেগম গত বছরের জুলাই মাসে শরীয়তপুরে যোগ দেন। ২৫তম বিসিএসের এই কর্মকর্তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করার পর ২০০৬ সালে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। জেলা প্রশাসক হিসেবে যোগ দেওয়ার পরই ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের নেতৃত্ব দেন তিনি। জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন কাজের ফাঁকে সম্প্রতি শরীয়তপুর জেলা শহরের নাগরিকদের নিরাপদে বসবাস ও চলাচল নিরাপদ করার জন্য শহরের ১৪ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি সংযুক্ত সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন করেছেন। তাঁর এ উদ্যোগ নাগরিকদের মধ্যে ইতিবাচক ধারণা তৈরি করেছে।
জানতে চাইলে তাহসিনা বেগম প্রথম আলোকে বলেন, ‘জেলা প্রশাসক ও জেলা ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে কাজ করার সুযোগ আমার কর্মজীবনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ অভিজ্ঞতা। জেলা প্রশাসনের প্রধান হিসেবে রাষ্ট্রের সব উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন ও সমন্বয় করা একদিকে যেমন বিশাল দায়িত্বের ও চ্যালেঞ্জের, তেমনি অত্যন্ত গর্বের। সরকারি নীতি বাস্তবায়নের মাধ্যমে নারীর প্রতি বৈষম্য নিরোধ, বাল্যবিবাহ ও নারী নির্যাতন প্রতিরোধে মোবাইল কোর্ট পরিচালনা তদারকি, নারীশিক্ষার বিস্তার, নারীদের স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি, বিভিন্ন প্রশিক্ষণ প্রদান ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্তকরণের মাধ্যমে নারীকে স্বাবলম্বী করে গড়ে তোলার মাধ্যমে সমাজে নারীর মর্যাদা বৃদ্ধিতে জেলা প্রশাসক হিসেবে অবদান রাখতে পারা আমার বর্তমান কর্মজীবনের অন্যতম সার্থকতা বলে মনে করছি।’
গত বছরের ২৯ নভেম্বর পুলিশ সুপার হিসেবে শরীয়তপুরে যোগ দেন রওনক জাহান। ২৭তম বিসিএসের ওই কর্মকর্তা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ও অস্ট্রেলিয়ার একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করেছেন। তিনি শরীয়তপুরের প্রথম নারী পুলিশ সুপার। এর আগে যশোরের পুলিশ সুপার ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ডিসি (ক্রাইম) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন।
তিন মাসে জাজিরার আলোচিত বিলাশপুরে ককটেল তৈরির কারখানার সন্ধান, বিভিন্ন স্থান থেকে অস্ত্র-ককটেল উদ্ধার এবং পেট্রল দিয়ে পুড়িয়ে ব্যবসায়ী খোকন দাস হত্যা মামলার সব আসামিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে পুলিশ সুপার রওনক জাহানের নেতৃত্বে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও পুলিশ বাহিনীকে সঠিকভাবে নেতৃত্ব দিয়েছেন। এ কারণে নির্বাচনকালে বড় কোনো সহিংসতার শরীয়তপুরে ঘটেনি। রওনক জাহান প্রথম আলোকে বলেন, ‘পুলিশের চাকরি অনেক চ্যালেঞ্জিং পেশা। তারপরও দায়িত্ব পালনে সফল হওয়ার চেষ্টা করি। অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও মানুষকে নিরাপত্তা দিয়ে যাচ্ছি। বিশেষ করে নারীদের আইনি সুরক্ষার কথা বেশি মাথায় রাখি।’
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক সাদিয়া জেরিন ২০২৩ সালের নভেম্বরে শরীয়তপুরে যোগ দেন। ৩৩তম বিসিএসের ওই কর্মকর্তা বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে¯স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন। জেলা প্রশাসনের বিভিন্ন বিভাগের দায়িত্ব সফলতার সঙ্গে পালন করেছেন। ভারপ্রাপ্ত জেলা প্রশাসক হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেছেন। সাদিয়া জেরিন প্রথম আলোকে বলেন, ‘একজন গণকর্মচারী হিসেবে আমার কাছে আত্মতুষ্টির সবচেয়ে বড় জায়গা সেবাগ্রহীতার সন্তুষ্টি। কাজের মাধ্যমে প্রান্তিক পর্যায়ের মানুষের সন্তুষ্টি দেখার সৌভাগ্য হয়েছে, যা আমাকে সব সময় অনুপ্রাণিত করে। সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও পেশাদারত্ব নিয়ে সামনের দিনগুলোতেও দায়িত্ব পালনের প্রত্যাশা রাখি।’
আমার জীবনে সবচেয়ে বড় উপলব্ধি হচ্ছে, প্রত্যেক নারীকে পড়ালেখা করে স্বাবলম্বী হতে হবে। যেকোনো সময় যেকোনো পরিস্থিতিতে নারীদের জীবনে অনিশ্চয়তা আসতে পারে। তখন স্বাবলম্বী নারীকে কোনো বাধা আটকে রাখতে পারে না।জান্নাতুল ফেরদৌস, সহকারী পরিচালক, ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর, শরীয়তপুর
৩৪তম বিসিএসের কর্মকর্তা মৌসুমি মান্নান শরীয়তপুরের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা শেষ করে ২০১৬ সালে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। গত ডিসেম্বরে তিনি শরীয়তপুরে যোগ দেন। এরপরই জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
শরীয়তপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে ইলোরা ইয়াসমিন ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে যোগ দেন। ৩৫তম বিসিএসের ওই কর্মকর্তা রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ালেখা শেষ করে ২০১৭ সালে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। ইলোরার মতে, প্রত্যেক নারীরই অর্থনৈতিক মুক্তি থাকা প্রয়োজন। যার জন্য আত্মনির্ভরশীল হওয়ার বিকল্প নেই। কর্মক্ষেত্রে যোগ্যতা নারীর আত্মসম্মান বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। একজন নারীর কাছে কর্মজীবন ও পারিবারিক জীবন—দুটিই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নুশরাত আরা খানম গত বছরের ৯ ডিসেম্বর গোসাইরহাটের ইউএনও হিসেবে যোগ দিয়েছেন। ৩৫তম বিসিএসের ওই কর্মকর্তা ইডেন মহিলা কলেজ থেকে পড়ালেখা শেষ করে ২০১৭ সালে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন। দক্ষতার সঙ্গে উপজেলা প্রশাসনের কাজ সামলাচ্ছেন তিনি।
জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে শরীয়তপুরে আসেন হেলেনা পারভিন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা শেখ করে ওই কর্মকর্তা ২০০৪ সালে আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে সাবরেজিস্ট্রার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। বাংলাদেশ পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের শরীয়তপুর কার্যালয়ের উপপরিচালক সুপ্রিয়া বর জেলায় দায়িত্ব পালন করছেন ২০২৪ সালের জুলাই থেকে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে ২০০৭ সালে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন তিনি।
নড়িয়া উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) লাকী দাস গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে নড়িয়ায় যোগ দেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ালেখা শেষ করে ৩৮তম বিসিএসের মাধ্যমে ২০২০ সালে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন তিনি। জেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে ৪৪তম বিসিএসের মেহের আফরোজ ও নুসরাত জাহান ১০ ফেব্রুয়ারি শরীয়তপুরে যোগ দেন।
আঞ্চলিক পাসপোর্ট কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক উম্মে কুলসুম গত বছরের ফেব্রুয়ারিতে শরীয়তপুরে যোগ দেন। ময়মনসিংহ আনন্দ মোহন কলেজ থেকে শিক্ষাজীবন শেষ করে ২০২০ সালে কর্মজীবনে প্রবেশ করেন তিনি।
জেলা ত্রাণ ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্মকর্তা হিসেবে নাজনীন শামীমা গত বছরের এপ্রিলে শরীয়তপুরে আসেন। একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ালেখা শেষ করে ২০০২ সালে কর্মজীবন শুরু করেন।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক জান্নাতুল ফেরদৌস ২০২৪ সালের ডিসেম্বর থেকে শরীয়তপুরে দায়িত্ব পালন করছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয়ে স্নাতকোত্তর শেষ করে ৩৩তম বিসিএসের মাধ্যমে ২০২৫ সালে কর্মজীবন শুরু করেন তিনি। জান্নাতুল ফেরদৌস প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমার জীবনে সবচেয়ে বড় উপলব্ধি হচ্ছে, প্রত্যেক নারীকে পড়ালেখা করে স্বাবলম্বী হতে হবে। যেকোনো সময় যেকোনো পরিস্থিতিতে নারীদের জীবনে অনিশ্চয়তা আসতে পারে। তখন স্বাবলম্বী নারীকে কোনো বাধা আটকে রাখতে পারে না।’