অদম্য মেধাবী-২০২৬–৩
নানা প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে স্বপ্নের পথে ছুটছে তারা
এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া এমন কিছু শিক্ষার্থী আছে, যাদের জীবনের গল্প অন্যদের জন্য অনুপ্রেরণার। অদম্য মেধাবীদের নিয়ে প্রথম আলোর বিশেষ আয়োজনের তৃতীয় পর্বে আজ থাকছে চার শিক্ষার্থীর কথা।
হুইলচেয়ারে বসে পড়াশোনা করেছে একজন, কেউ বাবার সঙ্গে দিনমজুরি করেছে। কারও মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, আবার কারও পরিবারে একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিও নেই। নানা প্রতিকূলতার মধ্যেও পড়াশোনা থামায়নি তারা। সেই অদম্য চেষ্টার ফলও পেয়েছে—এবারের এসএসসি পরীক্ষায় চারজনই পেয়েছে জিপিএ-৫। এখন তাদের স্বপ্ন উচ্চশিক্ষার; কিন্তু সেই স্বপ্নের পথেও আছে নানা বাধা।
কোনো বাধাতেই থামেনি ইয়াসার
সংসারে অভাব তো ছিলই, সঙ্গে ছিল শারীরিক প্রতিবন্ধকতা। কিন্তু কোনো বাধাই থামাতে পারেনি ইয়াসার ইসলামের (নিরব) স্বপ্নযাত্রা। অদম্য ইচ্ছাশক্তিকে সম্বল করে সাফল্যের প্রথম বড় ধাপ পার করেছে সে। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে বাঁ হাতের মুঠি দিয়ে লিখে জিপিএ-৫ পেয়েছে সে। তার এই সাফল্যে আনন্দিত তার পরিবার, শিক্ষক ও গ্রামবাসী।
ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার রাধাকানাই ইউনিয়নের পলাশতলী গ্রামের দরিদ্র কৃষক সিরাজুল ইসলাম ও খাদিজা খাতুন দম্পতির বড় ছেলে ইয়াসার। তিন ভাই-বোনের মধ্যে সবার বড় সে।
পারিবারিক সূত্রে জানা যায়, ইয়াসারের ১০ মাস বয়সে পরিবারের সদস্যরা প্রথম তার শারীরিক প্রতিবন্ধকতার বিষয়টি বুঝতে পারেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাঁকতে শুরু করে দুই হাতের কবজি। দুটি পায়ে ভর দিয়ে নিজে থেকে কখনো হাঁটাও হয়নি তার। অন্যের সাহায্য ছাড়া চলাফেরা করার কোনো উপায় ছিল না।
স্বজনেরা জানান, প্রতিকূল পরিস্থিতির কাছে হাল ছাড়েননি দরিদ্র বাবা। ছেলেকে কোলে করে নিয়ে ভর্তি করিয়ে দেন বাড়ির পাশের পলাশতলী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। প্রাথমিকের গণ্ডি পেরিয়ে ভর্তি করা হয় পলাশতলী আমিরাবাদ উচ্চবিদ্যালয়ে। প্রতিদিন সকালে মা-বাবা তাকে হুইলচেয়ারে করে বিদ্যালয়ে পৌঁছে দিতেন।
ছুটি শেষে শিক্ষক ও সহপাঠীরা তাকে বাড়ি পৌঁছে দিতেন।
এত কষ্টের পরও ছেলের সাফল্যে গর্বিত বাবা সিরাজুল ইসলাম। তিনি বলেন, ‘ইয়াসারের বেশির ভাগ সময় হুইলচেয়ারে বসে কিংবা বিছানায় শুয়েই কেটেছে। কিন্তু কখনো হাল ছাড়েনি।’
অদম্য ইয়াসার ইসলাম বলে, ‘শারীরিক প্রতিবন্ধকতা আমাকে আটকাতে পারেনি। কষ্টের অনুভূতি আমি বুঝি, তাই ডাক্তার হয়ে দরিদ্র ও অসহায় মানুষের সেবা করতে চাই।’
ইয়াসারের স্কুলের প্রধান শিক্ষক এ কে এম সাইফুল ইসলাম বলেন, ইয়াসার কখনো নিজের সীমাবদ্ধতাকে অজুহাত হিসেবে ব্যবহার করেনি। নিয়মিত পড়াশোনা, শিক্ষকদের পরামর্শ মেনে চলা এবং নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাসই তাকে এই সাফল্য এনে দিয়েছে।
প্রতিকূলতার মধ্যেই লিমনের সাফল্য
ছোটবেলা থেকে লেখাপড়ায় ভালো লিমন মিয়া। কিন্তু প্রায়ই খাতা, কলম ও বই কেনার টাকা জুটত না। তখন স্কুল বন্ধ হলে বাবার সঙ্গে অন্যের জমিতে কাজ করতে যেত। যা আয় হতো, তা দিয়ে লেখাপড়ার খরচ চালাত। মাঝেমধ্যে না খেয়ে স্কুলে যেতে হতো। আর্থিক অবস্থা বিবেচনায় শিক্ষকেরা পরীক্ষা ফি, বেতন, ফরম পূরণের টাকা নিতেন না।
এমন প্রতিকূল পরিবেশেই লেখাপড়া করে এবারের এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ–৫ পেয়েছে লিমন মিয়া। সে রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার ছুট লক্ষ্মীপুর গ্রামের দিনমজুর আফজাল হোসেনের ছেলে। ইকরচালী উচ্চবিদ্যালয়ের বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী ছিল সে।
লিমনের বৃদ্ধ বাবা অন্যের জমিতে কামলা দিয়ে সংসার চালান। প্রতিদিন কাজও মেলে না। একটা একচালা ও একটা দোচালা ঘরে কোনোমতে মাথা গুঁজে থাকেন তাঁরা দুই ভাই ও মা–বাবা।
লিমন মিয়া বলে, ‘আমার জন্য মা–বাবা অনেক কষ্ট করেছেন। বই-খাতা কেনার সামর্থ্য ছিল না। কারও কাছে টাকা চাইলে কেউ দিতে চাইতেন না। তাই পড়ার খরচ জোগাতে আমাকে দিনমজুরির কাজ করতে হয়েছে। আমার ইচ্ছা পড়ালেখা করে ডাক্তার হব।’
লিমনের বাবা বলেন, ‘মোর ইচ্ছা ছেলেটা শহরের বড় কলেজোত পড়ুক। কিন্তুক সেই পয়সা জোগা করিবার তো মোর উপায় নাই।’
ইকরচালী উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মনোয়ারুল ইসলাম বলেন, এ রকম একটি পরিবার থেকে পরীক্ষায় পাস করাই যেখানে কঠিন, সেখানে জিপিএ-৫ পাওয়া সম্ভব হয়েছে লিমন ও তার বাবার কঠোর সংগ্রামের ফলে।
চেষ্টার ফল পেয়েছে ভিটেহারা জুলেখা
নিজেদের কোনো বাড়িঘর নেই, বাবা দিনমজুর। অভাবের সংসারে কখনো কখনো খাবারও জোটে না। তবু পড়াশোনার প্রতি জুলেখা খাতুনের আগ্রহে ভাটা পড়েনি। বৃত্তির টাকা জমিয়ে কেনা সাইকেলে চেপে প্রতিদিন পাঁচ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে নিয়মিত স্কুলে গেছে সে। সেই অদম্য চেষ্টার ফলও পেয়েছে। এবার এসএসসি পরীক্ষায় বিজ্ঞান বিভাগ থেকে জিপিএ-৫ পেয়েছে সে।
জুলেখা নীলফামারীর সৈয়দপুর উপজেলার লক্ষণপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থী ছিল। তাদের বসবাস পার্শ্ববর্তী রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলার গোপীনাথপুর ইউনিয়নের বালাডাঙ্গা গ্রামে। সেখানে এক আত্মীয়ের জমিতে ঘর তুলে বাবা মো. জাহির উদ্দীন ও মা শেফালি বেগমের সঙ্গে থাকে জুলেখা।
শেফালি বেগম বলেন, ‘অনেক কষ্ট করে জুলেখার বড় দুটি বোনের বিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন জুলেখার বৃদ্ধ বাবা মো. জাহির উদ্দীনকে নিয়ে কোনোরকমে বেঁচে আছি আমরা।’
জুলেখা বলে, ‘যেদিন বাবার কাজ থাকে না, সেদিন কখনো কখনো উপোস থাকতে হয়েছে আমাদের। লেখাপড়ার ব্যাপারে অধ্যক্ষ রেজাউল করিম স্যার আমাকে অনেকভাবে সহযোগিতা করেছেন। ক্লাস সিক্স থেকে ওই স্কুলে বিনা বেতনে পড়ছি। শ্রেণিশিক্ষক রেহেনা বেগম প্রতিদিন লেখাপড়া বুঝিয়ে দিতেন। এ ছাড়া আমি সব শিক্ষকের সহানুভূতি পেয়েছি।’
লক্ষণপুর স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘রাত জেগে খেয়ে না–খেয়ে পড়াশোনা করত মেয়েটি। জুলেখার ভালো ফলের পেছনে সব কৃতিত্ব তার নিজেরই।’
মায়ের পাশে দাঁড়াতে চায় সেজুতি
শহিদুল ইসলাম পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে লাইনম্যানের চাকরি করতেন। ২০১২ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় মারা যান তিনি। তাঁর স্ত্রী ফাতেমা খাতুন তখন দুই বছরের মেয়ে সেজুতি ইসলাম ও ছয় বছরের মেয়ে সুমাইয়া ইসলামকে নিয়ে ভাড়া বাড়ি ছেড়ে আশ্রয়হীন হয়ে পড়েন। অবশেষে আত্মীয়ের বাড়িতে আশ্রয় নেন।
স্বামী মারা যাওয়ার পর শূন্য হাতে মা ফাতেমা দুই মেয়েকে নিয়ে জীবনযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। সেই জীবনযুদ্ধে মায়ের সঙ্গে লড়ছেন মেয়েরাও। ছোট মেয়ে সেজুতি এবার এসএসসিতে জিপিএ-৫ পেয়ে উত্তীর্ণ হয়েছে। সে উচ্চমাধ্যমিক শেষ করে প্রকৌশলবিদ্যায় পড়তে চায়। কিন্তু এই লক্ষ্যে পৌঁছাতে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে পড়াশোনার খরচ।
সেজুতিরা থাকেন নাটোর পৌরসভার ঝাউতলা মোড় এলাকার উত্তর পটুয়াপাড়ায়। সে নাটোর সরকারি বালিকা উচ্চবিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ছিল। তার বড় বোন সুমাইয়া এখন ইংরেজি বিষয়ে স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী।
সেজুতির মা ফাতেমা খাতুন এরই মধ্যে দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত। প্রতি মাসে অন্তত এক ব্যাগ রক্ত নিতে হয়। তিনি বলেন, ‘পল্লী বিদ্যুৎ অফিস থেকে ২০২৭ সাল পর্যন্ত প্রতি মাসে ৪ হাজার টাকা করে দেবে। আর এক বছর পর আয়ের কোনো উৎসই থাকবে না। এ অবস্থায় দুই মেয়ের পড়ালেখা চালানো নিয়ে আমি খুবই দুশ্চিন্তায় আছি। ওরা ছাত্রী হিসেবে ভালো। তাই ওদের মুখের দিকে চেয়ে আছি, ভালো কিছু দেখার জন্য।’
সেজুতির ভাষ্য, তারা দুই বোন ছাড়া তাদের মায়ের আর কিছুই অবশিষ্ট নেই। এই বাস্তবতা সে প্রতিমুহূর্তে উপলব্ধি করে। তাই সে যত কষ্টই হোক উচ্চশিক্ষিত হয়ে মায়ের পাশে দাঁড়াবে।
সেজুতিরা থাকছেন তার মায়ের ফুফা সাজ্জাত হোসেনের বাড়িতে। তিনি বলেন, ভাসমান পরিবারটিকে তিনি আগলে রাখার চেষ্টা করছেন। মেয়েরা লেখাপড়া শিখে কর্মজীবী হলে তবেই তাদের সংসারে সুখ আসবে।
[প্রতিবেদন তৈরিতে তথ্য দিয়েছেন নিজস্ব প্রতিবেদক, ময়মনসিংহ, প্রতিনিধি, নাটোর, তারাগঞ্জ, রংপুর ও সৈয়দপুর, নীলফামারী]