চট্টগ্রামে ২ শ্রমিকের মৃত্যু
খননকাজের অনুমোদন ছিল না, নিরাপত্তাব্যবস্থা ছাড়াই গর্তে নামানো হয় শ্রমিকদের
নির্ধারিত সূচিতে ছিল না খননকাজ। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের অনুমোদনও নেওয়া হয়নি। তবু শ্রমিকদের নামিয়ে দেওয়া হয় গভীর গর্তে। প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থাও ছিল না। চট্টগ্রাম ওয়াসার পয়োনিষ্কাশন প্রকল্পে এমন অননুমোদিত ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে গিয়েই মাটিচাপা পড়ে দুই শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। সংস্থাটির গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের এই গাফিলতির তথ্য উঠে এসেছে।
২৩ এপ্রিল ভোর সাড়ে চারটার দিকে নগরের হালিশহরের আগ্রাবাদ বি-ফোর এক্সেস রোড এলাকায় মাটি খোঁড়ার কাজ শুরু করেন শ্রমিকেরা। মুহূর্তেই মাটির নিচে চাপা পড়েন চারজন। এর মধ্যে দুজনের মৃত্যু হয়। নিহত ব্যক্তিরা হলেন মো. রাকিব (৩০) ও মো. আইনুল ইসলাম (২২)। দুর্ঘটনার পর তাঁদের চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। এ সময় ক্ষুব্ধ শ্রমিকেরা হাসপাতালে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের এক প্রতিনিধিকে ধাওয়া দেন। ওই দিন আহত দুজনের এখনো চিকিৎসা চলছে।
দুই শ্রমিকের মৃত্যুর ঘটনায় ওই দিনই চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে চট্টগ্রাম ওয়াসা। চট্টগ্রাম মহানগরীর পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা স্থাপন প্রকল্পের (১ম পর্যায়) উপপ্রকল্প পরিচালক মো. আবদুর রউফকে কমিটির প্রধান করা হয়। ২৬ এপ্রিল কমিটি প্রতিবেদন দেয়। তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্ঘটনার দিন যে কাজটি করা হচ্ছিল, সেটি ছিল ‘ট্রায়াল পিট’। অর্থাৎ পাইপ বসানোর আগে মাটির অবস্থা যাচাইয়ের জন্য খননকাজ। কিন্তু এই কাজটি সেদিনের নির্ধারিত কর্মসূচির অংশ ছিল না। কাজটি করার কোনো অনুমোদিত পরিকল্পনা ছিল না। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না হাইড্রো পাইপ বসানোর এ কাজ করছে।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন ছাড়াই অননুমোদিত ও তদারকিবিহীনভাবে কাজ পরিচালনা করা হয়েছে। এর ফলে শ্রমিকদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত এই দুর্ঘটনা ঘটে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম, পরিচালক, পয়োনিষ্কাশন প্রকল্প।
পয়োনিষ্কাশন প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক ও তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী মোহাম্মদ আরিফুল ইসলাম প্রথম আলোকে বলেন, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত প্রক্রিয়া অনুসরণ না করেই কাজ শুরু করে। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন ছাড়াই অননুমোদিত ও তদারকিবিহীনভাবে কাজ পরিচালনা করা হয়েছে। এর ফলে শ্রমিকদের জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ে এবং শেষ পর্যন্ত এই দুর্ঘটনা ঘটে। ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তদন্ত কমিটি সূত্র জানায়, দুর্ঘটনার আগের দিন পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে ঠিকাদারকে একটি কোয়ালিটি নোটিশ দেয়। এতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছিল, প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত না করে কোনোভাবেই খননকাজ শুরু করা যাবে না। বিশেষ করে রাতের কাজের ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত আলোকসজ্জা, সুরক্ষা সরঞ্জাম এবং অন্যান্য প্রস্তুতি নিশ্চিত করার পর অনুমোদন নিতে হবে। কিন্তু এসব নির্দেশনা উপেক্ষা করেই কাজ শুরু করে ঠিকাদার। ফলে পুরো কাজটি ছিল কার্যত অনুমোদনবিহীন ও তদারকিহীন। খননকাজে গাফিলতির বিষয়ে জানতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না হাইড্রোর প্রতিনিধি ইউ টুওকে কয়েকবার ফোন করা হয়। তবে সাড়া পাওয়া যায়নি।
মাটি ধসে পড়া ঠেকানোর ব্যবস্থা ছিল না
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, শ্রমিকদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই) থাকলেও মূল ঝুঁকির জায়গা হলো—গর্তের দুই পাশে মাটি ধসে পড়া ঠেকানোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। খননকাজে সাধারণত ‘শোরিং’ বা সাইড প্রটেকশন ব্যবহার করা হয়, যা মাটির চাপ সামলে দেয়। কিন্তু এখানে সেই ব্যবস্থা ছিল না। ফলে গভীর গর্তে কাজ করার সময় হঠাৎ করেই মাটি ধসে পড়ে শ্রমিকেরা চাপা পড়েন।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, শ্রমিকদের ব্যক্তিগত সুরক্ষা সরঞ্জাম (পিপিই) থাকলেও মূল ঝুঁকির জায়গা হলো—গর্তের দুই পাশে মাটি ধসে পড়া ঠেকানোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। খননকাজে সাধারণত ‘শোরিং’ বা সাইড প্রটেকশন ব্যবহার করা হয়, যা মাটির চাপ সামলে দেয়। কিন্তু এখানে সেই ব্যবস্থা ছিল না। ফলে গভীর গর্তে কাজ করার সময় হঠাৎ করেই মাটি ধসে পড়ে শ্রমিকেরা চাপা পড়েন।
প্রকল্প পরিচালক জানান, এই গাফিলতির জন্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সুপারভিশন টিমের সাত সদস্যকে ইতিমধ্যে দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে আরও প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়াও চলছে। ক্ষতিপূরণ হিসেবে নিহত দুই শ্রমিকের পরিবারকে ঠিকাদারের পক্ষ থেকে ১০ লাখ টাকা করে দেওয়া হয়েছে। আহত শ্রমিকদের চিকিৎসার সমস্ত খরচও ঠিকাদার বহন করছে।
এই প্রকল্পে কী আছে
‘চট্টগ্রাম মহানগরের পয়োনিষ্কাশনব্যবস্থা স্থাপন’ শীর্ষক প্রকল্পটি ২০১৮ সালের ৭ নভেম্বর একনেক সভায় অনুমোদন পায়। শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩ হাজার ৮০৮ কোটি টাকা। এরপর প্রায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ব্যয় বেড়েছে। মেয়াদ বেড়েছে তিন দফা। ২০২৩ সালের মধ্যে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু হয়নি।
প্রকল্পের আওতায় দৈনিক ১০ কোটি লিটার পরিশোধন ক্ষমতার পয়ঃশোধনাগার, সেপটিক বর্জ্য শোধনাগার এবং প্রায় ২০০ কিলোমিটার পয়োনালা নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে নগরের ২২টি ওয়ার্ডের প্রায় ৩৬ বর্গকিলোমিটার এলাকা অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা, যার সুফল পাবে প্রায় ২০ লাখ মানুষ। এই প্রকল্পের মূল ঠিকাদার হলো, দক্ষিণ কোরিয়ার তাইয়ং ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন কোম্পানি লিমিটেড। তবে পাইপ স্থাপনের কাজটি করছে চায়না হাইড্রো।
এমন একটি বড় অবকাঠামো প্রকল্পে মৌলিক নিরাপত্তা বিধি উপেক্ষা করে কাজ চালানোর ঘটনা সামনে আসায় তদারকি ও জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, তদন্ত প্রতিবেদনের সুপারিশ অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা না নিলে ভবিষ্যতে একই ধরনের দুর্ঘটনার ঝুঁকি থেকেই যাবে।
জানতে চাইলে ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন বাংলাদেশের (আইইবি) চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক চেয়ারম্যান দেলোয়ার মজুমদার বলেন, যথাযথ নিরাপত্তা সরঞ্জাম ও সুরক্ষা বিধি না মানার ফলেই দুই শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। এ ধরনের ঘটনায় শুধু ঠিকাদারের গাফিলতি নয়, পরামর্শক প্রতিষ্ঠান এবং ওয়াসা কর্তৃপক্ষও দায় এড়াতে পারে না। কেননা কাজের প্রতিটি ধাপে তদারকি ও অনুমোদনের দায়িত্ব তাদের ওপরও বর্তায়। দেলোয়ার মজুমদার বলেন, নিহত শ্রমিকদের জীবনের ক্ষতি কোনোভাবেই পূরণ করা সম্ভব নয়। তবে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা ঠেকাতে দায়ী ঠিকাদারকে কালোতালিকাভুক্ত করা এবং কঠোর আর্থিক জরিমানা নিশ্চিত করা জরুরি।